
চোখ
দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার নয়
- প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকেন অনেকে। এর প্রভাবে চোখে বাড়তি চাপ পড়ে, দেখা দেয় কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম। এই রোগের উপসর্গ ও প্রতিকার নিয়ে লিখেছেন ডা. শাহেদ হায়দার চৌধুরী
খুশকি নিয়ন্ত্রণ

হাম
বড়দেরও হয় হাম

অনেকের ধারণা, হাম শুধু শিশুদের হয়। ফলে হামের উপসর্গ ও করণীয় নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে রয়েছে সচেতনতার অভাব। বাস্তবতা হলো, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলেই হাম ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে। শিশুদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় সাধারণত বড়দের মধ্যে হামের সংক্রমণের হার কম। কোনো কারণে যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের দেহে যেকোনো বয়সেই হাম বাসা বাঁধতে পারে।
বড়দের হাম হলে দ্রুত জটিল উপসর্গ তৈরি হতে পারে। উপসর্গ অবহেলা করলে স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকিতে কারা
যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে হাম হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে—
♦ হামের টিকা নেওয়া হয়নি যাঁদের
♦ শৈশবে হামে আক্রান্ত হননি যাঁরা
♦ কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাঁদের দুর্বল
♦ হাম কবলিত জনবহুল এলাকায় বসবাস করছেন যাঁরা।
উপসর্গ
বড়দের ক্ষেত্রে হামের লক্ষণগুলো অনেক সময় বেশি তীব্র হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে—
♦ উচ্চমাত্রার জ্বর (১০৪-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট)
♦ তীব্র মাথা ব্যথা
♦ চোখ লাল হওয়া ও আলো সহ্য করতে না পারা
♦ কাশি ও গলা ব্যথা
♦ পুরো শরীরের ত্বকে লাল ফুসকুড়ি ওঠা
♦ দেহে অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অবসাদ।
জটিলতা
বড়দের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক জটিলতার কারণ হতে পারে। ফুসফুসে পানি জমে দেখা দিতে পারে হামজনিত নিউমোনিয়া, লিভারের সমস্যা, তীব্র পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। গর্ভবতী নারী বা দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি।
করণীয়
♦ দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
♦ হামে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা ঘরে রাখুন (আইসোলেশন)
♦ পানি ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন
♦ নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন
♦ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
♦ প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ করুন।
হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা নেওয়া। যাঁরা নিশ্চিত নন, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা নিতে পারেন। হামকে অবহেলা না করে সচেতন হওয়া জরুরি।
লেখক : মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ
হেলথকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি.
লিভার
নীরব ঘাতক ফ্যাটি লিভার
ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট এপিডেমিক’। বিশ্বের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। নীরবে শরীরের ক্ষতি করে এই রোগ। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ডা. মুহাম্মদ সায়দুল আরেফিন

জুনের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হয় বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল লিভার ইনস্টিটিউট (GLI) দিবসটি পালন শুরু করে। ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা ‘চর্বিযুক্ত যকৃৎ’ রোগ বিষয়ে জনশিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্তের সংখ্যা। এ বিষয়ে এখনো সচেতন নন অনেকেই। ফলে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ বেড়ে যকৃতের জটিল রোগ দেখা দেওয়ার পরই রোগীরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তত দিনে আর রোগ পুরোপুরি নিরাময়ের সম্ভাবনা থাকে না।
ফ্যাটি লিভার কী
‘ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ নামের মধ্যেই রয়েছে এই রোগের পরিচয়। যকৃৎ বা লিভারের মধ্যে চর্বি জমলে এটি হয়ে থাকে। বর্তমানে যেসব রোগী বিভিন্ন কারণে পেটের (Abdomen) আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করছেন, তাঁদের অনেকের রিপোর্টেই এ রোগের নাম দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে অবহেলা করছেন, কেউ আতঙ্কিত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়ে দেখা দেয় এই রোগ। প্রাথমিক পর্যায়ে এটির তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না, ফলে অজান্তেই রোগীর লিভারের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে লিভারের কার্যক্ষমতা পুরোপুরিই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
রোগের পর্যায়
চর্বি জমার ফলে লিভার কয়েকটি ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে লিভারের কোনো বড় ক্ষতি না করেই চর্বি জমা হতে থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে অতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে লিভারে প্রদাহ তৈরি হয় এবং এরপর আরো অগ্রসর ধাপে লিভারে সৃষ্টি হয় ক্ষত। এ সময়ই মূলত রোগের লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে।
উপসর্গ
প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্যাটি লিভারের তেমন উপসর্গ না থাকলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পেটের ডান পাশে ওপরের দিকে হালকা ব্যথা থাকতে পারে। ফ্যাটি লিভার সিরোসিসে পরিণত হলে কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে আছে পেটে পানি আসা, জন্ডিস, রক্তবমি ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
করণীয়
পেটের আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় ‘ফ্যাটি লিভার’ মন্তব্য দেখে ঘাবড়ানো যাবে না। এ পরীক্ষায় অতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে লিভারের একটি গঠনগত পরিবর্তন শনাক্ত হয়, কার্যক্ষমতা বা রোগের প্রকোপ নয়। গঠনগত পরিবর্তনের ফলে লিভারের কার্যক্ষমতা বিঘ্নিত হচ্ছে কি না সেটি জানা আবশ্যক। লিভারের কার্যক্ষমতা বিঘ্নিত হলে রক্ত পরীক্ষায় কিছু এনজাইমের মাত্রা (SGPT, SGOT) বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া অ্যালবুমিন, প্রোথ্রম্বিন টাইম পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের কার্যক্ষমতা পরিমাপ করা হয়। এসব পরীক্ষার রিপোর্ট ভালো থাকলে দুশ্চিন্তার কারণ নেই, চিকিৎসকের ফলোআপে থাকলেই চলবে।
লিভারে চর্বি জমার কারণ জানতে ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা, হেপাটাইটিস সংক্রমণ পরীক্ষা করতে হবে। এই তিনটির অবস্থার সঙ্গে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কোনো একটি ধরা পড়লে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা করা অত্যন্ত জরুরি।
দীর্ঘদিন চর্বি জমলে লিভারে কোলাজেন নামক ফাইবার টিস্যু তৈরি হয়। এতে লিভার ধীরে ধীরে অমসৃণ ও শক্ত হয়ে যায় এবং লিভার ফাইব্রোসিস নামক জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। এটি নির্ণয়ের জন্য ‘ফাইব্রোস্ক্যান’ নামক পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। ফাইব্রোস্ক্যান সব রোগীর প্রয়োজন হয় না, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া না করাই শ্রেয়।
কেন হয় এ রোগ
ডায়াবেটিক রোগীদের ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আবার যাঁদের ফ্যাটি লিভার আছে তাঁদের ডায়াবেটিস হওয়ারও ঝুঁকি রয়েছে। স্থূলতা, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড ও তৈলাক্ত খাবার গ্রহণের ফলেও ফ্যাটি লিভার হয়ে থাকে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
ফ্যাটি লিভারের মাত্র একটি স্বীকৃত ওষুধ রয়েছে, সেটি সব রোগীর জন্য প্রযোজ্যও নয়। মূলত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে চিকিৎসা করা হয়। তৈলাক্ত খাবার ও ফাস্ট ফুড পরিহার করে নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করলে ফ্যাটি লিভার অনেকটা হ্রাস পায়। যাঁদের ফ্যাটি লিভার নেই, তাঁদেরও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। তেল-চর্বি কমিয়ে শাক-সবজি ও ফলমূল খেতে হবে বেশি বেশি। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা শারীরিক কার্যকলাপ করা জরুরি। অ্যালকোহল একেবারেই বাদ দিতে হবে। যাঁদের পরিবারে লিভার সমস্যার ইতিহাস রয়েছে তাঁদের অবশ্যই নিয়মিত ALT, AST, FibroScan ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক
জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

