ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে গতকাল রবিবার মালয়েশিয়ায় গেছেন। আজ সোমবার তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখান থেকে সরাসরি চীনে যাবেন। ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত তিনি চীন সফর করবেন। আগামী ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর দুটি সফরই অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। স্বাভাবিকভাবেই এই সফরে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। আজ দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, কর্মী প্রেরণ, সেমিকন্ডাক্টরশিল্প, কৃষি, শিক্ষা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। জানা যায়, বাংলাদেশকে আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগদানের বিষয়ে মালয়েশিয়ার সমর্থন কামনা করা হবে। সফরকালে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনার পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে টার্মস অব রেফারেন্স বিনিময় হতে পারে।
চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সফরকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে এই সফর। আর তার ভিত্তি মজবুত করার কাজ সফরের আগেই শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চীনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রথম বিদেশি কার্যালয় চালুর উদ্যোগ, বিশেষ ‘চায়না ডেস্ক’, বিনিয়োগ সম্মেলন, ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) আলোচনার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। আবার স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের পরিকল্পনা এবং নতুন বাজেটে ব্যাপক কর-শুল্ক সুবিধা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে চীনা বিনিয়োগের অন্যতম সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার কৌশলগত প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হবে ২৫ জুন বেইজিংয়ে আয়োজিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিডা যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করছে। এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ, অগ্রাধিকার খাত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিগুলো তুলে ধরা হবে। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, এই সফরে দুই দেশের মধ্যে দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং প্রায় ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। মোট ১৫ থেকে ১৭টি দলিল স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জানিয়েছে, চীন সরকার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) মিলিয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থায়ন প্রস্তাব বর্তমানে বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে চীন সরকারের অর্থায়নে অপেক্ষমাণ ৯টি প্রকল্পে ৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার, এআইআইবির অধীনে ১৭টি প্রকল্পে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার এবং এনডিবির আওতায় সাতটি প্রকল্পে ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব।
আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে। এশিয়ার এই দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উত্তরোত্তর আরো জোরদার হোক।

