তর্কপ্রিয় মানুষ মহান আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হলো কঠিন ঝগড়াটে ব্যক্তি।’
(বুখারি, হাদিস : ২৪৫৭)
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তর্ক করে না, তার জন্য পরকালীন জীবনে আছে জান্নাত। আবু উমামাহ বাহেলি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের শেষ সীমায় একটি ঘর দেওয়ার জামিন হচ্ছি, যে হক হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া বর্জন করে। ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের মধ্যস্থলে একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যে উপহাসছলেও মিথ্যা বলা বর্জন করে। আর ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় একটি ঘরের জামিন হচ্ছি, যার চরিত্র উত্তম।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮০০)
শত্রুতা সৃষ্টি হয় : মন্দ বিতর্কের ফলে কখনো কখনো প্রাচীন বন্ধুত্ব ও সুদৃঢ় বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়। কখনো বিপক্ষ দলের ওপর চড়াও হওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। ফলে উভয়ের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়।
কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়া : আল্লাহ তাআলা শবেকদরের মতো মহান রাতের সুনির্দিষ্ট সময়ের বিষয়টি শুধু বিতর্ক বা ঝগড়ার কারণে তুলে নেন। (বুখারি, হাদিস : ৪৯)
শয়তানের সুযোগ সৃষ্টি : বিতর্কের সময় ব্যক্তি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করে। হোক সেটা বৈধ বা অবৈধ উপায়। সেই সুযোগে শয়তান যেকোনো ব্যক্তিকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। এ বিষয়ে মুসলিম ইবনু ইয়াসার বলতেন, ‘তোমরা অবশ্যই ঝগড়া-বিবাদ থেকে সাবধান থাকবে। কেননা এটি একজন আলেমের অজ্ঞতার মুহূর্ত। আর এই মুহূর্তে শয়তান এর দ্বারা তার ত্রুটি বা বিভ্রান্তি কামনা করে।’
(সুনানে দারেমি, হাদিস : ৪১৯)
হেদায়েতপ্রাপ্তিতে অন্তরায় : রাসুলুল্লাহ (সা.) বিতর্ক বা ঝগড়াকে হেদায়েতপ্রাপ্তদের বিভ্রান্ত হওয়ার মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। আবু উমামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের সুপথপ্রাপ্ত হওয়ার পরে বিভ্রান্ত হওয়ার একটিই কারণ যে তারা ঝগড়া বা বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়ে।’ অতঃপর রাসুল (সা.) এই আয়াত পাঠ করলেন—‘তারা কেবল তোমার সঙ্গে ঝগড়ার জন্যই এ কথা বলে; বরং তারা হলো ঝগড়াকারী সম্প্রদায়।’ (সুরা : ঝুখরুফ, আয়াত : ৫৮), (তিরমিজি, হাদিস : ৩২৫৩)
আল্লাহর নিকট ঘৃণিত হওয়া : ঝগড়া বা বিতর্ককারী আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে ঘৃণিত, যে অতি ঝগড়াটে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৫৭)
আল্লাহর রোষানলে পতিত হওয়া : কোনো অবস্থায়ই অন্যায় বিষয়ে তর্কবিতর্ক করা উচিত নয়। আর যে ব্যক্তি এই কাজ করবে সে আল্লাহর রোষানলে পড়বে। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে কোনো বাতিল (অন্যায়) বিষয়ে তর্কবিতর্ক করে, সে ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রোষানলে থাকে, যতক্ষণ না সে তা বর্জন করে।’
(আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫৯৭)
আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত : যারা অন্যায়ভাবে বিতর্ক বা ঝগড়া করবে তারা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার আমল পেশ করা হয়, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, যারা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে না, তবে ঝগড়াকারী দুই ব্যক্তি ছাড়া। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বলেন, এদের অবকাশ দাও, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে নেয়।’
(মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ৭৬২৭)
জাহান্নামে প্রবেশ : তর্কবিতর্কের মতো গর্হিত কাজ যে ব্যক্তির কাছে প্রিয় হয়ে যাবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এ সম্পর্কে একটি হাদিসে এসেছে, জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, তোমরা আলেমদের মাঝে গর্ব করা, অজ্ঞদের সঙ্গে বিতর্ক করা এবং (প্রসিদ্ধ) মজলিস লাভ করার উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা কোরো না। যে ব্যক্তি তা করে (তার জন্য) জাহান্নাম, জাহান্নাম।
(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৪)
পরিশেষে কথা বলা বা বিতর্ক হতে হবে উত্তম পন্থায়। যেন এতে কারো ক্ষতি না হয়। মানসিকভাবে কেউ যেন আঘাত না পায়। কাউকে খাটো করা না হয় বা তাদের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রুপ প্রকাশ না পায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহবান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো উত্তম পন্থায়। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক ভালোভাবেই জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তিনি ভালোভাবেই জানেন কে সুপথপ্রাপ্ত হয়েছে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)