‘জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সুসংহত একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল সমাজ বিনির্মাণ এবং অব্যাহত সুশাসন, সেবা ও উন্নয়নের টেকসই ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য স্থানীয় সরকার ও শাসন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে দক্ষ ও একটি সেবামুখী গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার পথে আইন, কাঠামো এবং চর্চাগত নানা বাধা-বিপত্তি রয়েছে। এই ব্যবস্থা কিছুটা আমাদের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, আর বেশির ভাগই চর্চা ও সংস্কৃতিগত অমনোযোগিতা ও উদাসীনতা।’ এই পর্যবেক্ষণ চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের।
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব বাধা অপসারণ করে অন্যান্য বিষয়ের মতো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে নতুন বাংলাদেশের উপযোগী করে বিশ্বমানে উন্নীত করার অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অমনোযোগিতা ও উদাসীনতা’ সে সুযোগ নষ্ট করেছে। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সিটি করপোরশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদগুলো থেকে অপসারণ করা হয় বিনা ভোট বা ব্যাপক অনিয়মের একতরফা প্রহসনের ভোটে নির্বাচিত ‘জনপ্রতিনিধি’দের। ইউনিয়ন পরিষদগুলোর চেয়ারম্যানদের বেশির ভাগই গা ঢাকা দেয়। জনপ্রত্যাশা জাগে, এবার সব বাধা দূর করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কাঠামোর স্থানীয় সরকার গঠিত হবে।
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে প্রত্যাশিত সেই নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারপ্রধান তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, আগের মতো দলের প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের সহায়তায় এই নির্বাচনে জয়ী হওয়া যাবে না। নির্বাচন কমিশনও আসন্ন এই নির্বাচনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে বলে আশাবাদী; যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু নির্বাচন হচ্ছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সেই পুরনো এবং প্রায় অকার্যকর কাঠামো বহাল রেখেই।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে গত বছরের ৯ অক্টোবর এক শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার অন্যতম অগ্রদূত। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়নে গঠনমূলক ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।’ কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক ইউনূস ও রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত তাঁর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ওই প্রস্তাব প্রতিবেদন পড়েও দেখেনি।
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব পালনের সময় কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বর্তমানে স্থানীয় সরকার হচ্ছে এক ব্যক্তিসর্বস্ব, মেয়র বা চেয়ারম্যান নির্ভর। কাউন্সিলর বা সদস্যদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও জাতীয় সংসদের মতো সংসদীয় পদ্ধতিতে হওয়া দরকার। মেয়র বা চেয়ারম্যান পদে সরাসরি ভোট হবে না; ভোট হবে কাউন্সিলর বা সদস্য পদে। নির্বাচিত কাউন্সিলর বা সদস্যরা তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র বা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবেন। ভারতে এই ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার গঠিত হয়। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তা হয় প্রতি তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি নারী আসনের জন্য। একটি সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য বা কাউন্সিলরের তুলনায় অনেক বেশি ভোটারের কাছে পৌঁছতে হয় সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বা সদস্যদের যতটা গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের প্রতিনিধি ভাবে, সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর বা সদস্যরা ততটা গুরুত্ব পান না এবং তাঁরা সাধারণ ওয়ার্ডগুলোর সদস্যদের সঙ্গে এক ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে পড়েন। এ ক্ষেত্রে ওয়ার্ডগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারীদের জন্য ওয়ার্ড নির্ধারণ করা দরকার। ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডের সংখ্যাও জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। যেমন—একটি ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ড থাকলে তিনটি হবে নারীদের জন্য। পরের নির্বাচনে অন্য ছয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে তিনটি ওয়ার্ড হবে নারীদের জন্য।’
১৯৯৭ সালে অ্যাডভোকেট রহমত আলীর স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান করা হয়। ওই বছর স্থানীয় সরকার আইনের (ইউনিয়ন পরিষদ) দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে ১৯৯৭ সালে ৪৫ হাজার জন নারী চার হাজার ২৭৬টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিযোগিতা করে ১২ হাজার ৮২৮টি আসনে নির্বাচিত হন। কিন্তু সংরক্ষিত নারী আসনের সঙ্গে তিনটি সাধারণ আসন সাংঘর্ষিক হওয়ায় এই বিধানটি ২৯ বছর ধরে অকার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটি’ ২০০৭ সালে এই ব্যবস্থাটি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট বিধানটির পরিবর্তে মোট ওয়ার্ড সংখ্যার শতকরা ৪০ ভাগ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করার সুপারিশ করে। সেই সুপারিশ অনুসারে স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ, ২০০৭-এ শতকরা ৪০ ভাগ ওয়ার্ডে সরাসরি নির্বাচনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর ওয়ার্ডসংখ্যা ৯। আয়তন ও ভোটারসংখ্যার ভিত্তিতে বড় ইউনিয়ন পরিষদগুলোর ওয়ার্ডসংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে অনেকে মনে করেন। সাবেক স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান এ বিষয়ে আমাকে বলেন, ‘রাঙামাটির সাজেক ইউনিয়নের আয়তন এত বিশাল যে সেখানকার ওয়ার্ড সদস্যরা নিজ নিজ ওয়ার্ডের সব স্থানে সহজে পৌঁছতেও পারেন না। দেশের অন্যান্য ইউনিয়নের মধ্যে জনসংখ্যাগত ব্যাপক পার্থক্যও রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের জনসংখ্যা ও আয়তনের ভিত্তিতে ওয়ার্ডসংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর জনসংখ্যা সর্বোচ্চ চার লাখ ৭৫ হাজার থেকে সর্বনিম্ন প্রায় পাঁচ হাজার পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে ওয়ার্ডের সীমানা ও জনসংখ্যা পুনর্নির্ধারণ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ ধরে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর সর্বনিম্ন ৯টি থেকে সর্বোচ্চ ৩৯টি পর্যন্ত ওয়ার্ড হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাব ছিল, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন। এগুলোকে একটি সহজ, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমজাতীয় গণতান্ত্রিক সাংগঠনিক কাঠামোতে রূপান্তর করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি আইন রয়েছে। আছে শতাধিক অধস্তন আইন, অসংখ্য বিধি ও প্রজ্ঞাপন। এসব আইনের জঞ্জাল স্থানীয় সরকার কার্যকরের একটি প্রধান বাধা। সে কারণে এই পাঁচটি আইনকে একটি সমন্বিত আইনে একীভূত করতে হবে। আমরা এই একীভূত আইনের একটি খসড়াও প্রস্তুত করে অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়েছিলাম। এ ছাড়া আমাদের প্রস্তাব ছিল, একীভূত আইন প্রণয়ন করে একই তফসিলে একই সঙ্গে সব স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এতে এক-দেড় মাসের মধ্যেই এবং অনেক কম ব্যয়ে, কম জনবলের মাধ্যমে নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু যত দূর জানি, অন্তর্বর্তী সরকার বা ওই সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আমাদের প্রস্তাবগুলো পড়েও দেখেনি। এর ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর অবস্থায় ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই।’
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদও তাঁর মৃত্যুর আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘আলী রীয়াজের (জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি) সঙ্গে কয়েকবার দেখা করে অনুরোধ করেছি আমাদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার তালিকায় নিতে। সাড়া পাইনি।’
লেখক : কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক ও
নির্বাচন বিশ্লেষক





প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাজেটে উল্লিখিত ঘাটতি এবং প্রকৃত ঘাটতির মধ্যে একটি পার্থক্য সব সময়ই থাকে। শুধু তা-ই নয়, প্রকৃত ঘাটতি লিখিত ঘাটতির থেকে অনেক বেশি হয়ে থাকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে যে বাজেটে ঘোষিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কখনোই পূরণ করা সম্ভব হয়নি। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এক লাখ কোটি টাকার অধিক রাজস্ব কম আদায় হয়েছে। আগামী অর্থবছর যে খুব একটা ভালো হবে, তেমন আশা করা কঠিন। কেননা দেশের অর্থনীতিতে একটা মন্দাভাব বিরাজ করছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে আছে অনেক অনিশ্চয়তা। দেশের ব্যবসায়ীরা এখনো সেভাবে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাতে পারছেন না। আমদানি-রপ্তানি এখনো নিম্নমুখী। কর্মসংস্থান সেভাবে বৃদ্ধি তো পাচ্ছেই না, উল্টো নতুন করে মানুষ বেকার হতে শুরু করেছে। সর্বোপরি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সার্বিক নেতিবাচক প্রভাব যে সরকারের রাজস্ব আহরণের ওপর পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব কারণে প্রস্তাবিত বাজেটের এক লাখ কোটি টাকা বা তার অধিক রাজস্ব আদায় কম হতে পারে। যদি তেমনটা হয়, তাহলে এই বাজেটে প্রকৃত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে তিন লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি।