বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং এটি জ্ঞান প্রচার, দাওয়াহ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিশেষত ফেসবুকের শর্ট ভিডিও বা রিলস ফিচারের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট তৈরি করে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এবং মনিটাইজেশনের মাধ্যমে আয় করছেন।
প্রশ্ন হলো—ফেসবুক রিলস মনিটাইজ করে ইসলামিক বা শিক্ষামূলক ভিডিও আপলোড করে যে অর্থ উপার্জন করা হয়, তার শরয়ী বিধান কী? এ ধরনের আয় কি হালাল, নাকি এতে কোনো নিষিদ্ধ উপাদান বিদ্যমান রয়েছে? বর্তমানে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলাম মানুষের জীবিকার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। শুধু উপার্জন করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই উপার্জন বৈধ ও পবিত্র হওয়াও অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি, তা থেকে আহার করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭২)
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
এই আয়াত দুটি থেকে বোঝা যায় যে, উপার্জনের মাধ্যম যেমন বৈধ হতে হবে, তেমনি তা কোনো হারাম কাজের সহযোগীও হওয়া যাবে না।
ফেসবুক রিলস মনিটাইজেশন কী?
ফেসবুক রিলস মনিটাইজেশনে মূলত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয় করা হয়। একজন কনটেন্ট নির্মাতা ভিডিও তৈরি করেন, দর্শক সেই ভিডিও দেখেন, আর প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের বিনিময়ে আয়ের একটি অংশ কনটেন্ট নির্মাতাকে প্রদান করে। এখানে শরয়ী প্রশ্নটি মূলত বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু ও তার প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বৈধ কনটেন্ট ও বৈধ বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে করণীয়
যদি কোনো ব্যক্তি—
১. ইসলামিক শিক্ষা প্রচার করেন,
২. কেরআন-হাদিসের আলোচনা উপস্থাপন করেন,
৩. নৈতিক ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি করেন,
৪. এবং প্রদর্শিত বিজ্ঞাপনও শরিয়তসম্মত হয়,
তাহলে মূলত এ ধরনের কাজ বৈধ উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কারণ এখানে জ্ঞান প্রচার, দাওয়াহ এবং বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিদ্যমান থাকে।
মূল সমস্যা হলো বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণহীনতা
বাস্তবে অধিকাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতার হাতে বিজ্ঞাপনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে অনেক সময়— বেগানা নারীর ছবি, অশালীন দৃশ্য, সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন, গান-বাজনা নির্ভর প্রচারণা এবং অনৈতিক পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন- স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দেয়—এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কতটুকু শরয়ীভাবে নিরাপদ?
সমকালীন অধিকাংশ আলেমের মতে, যদি আয়ের প্রধান উৎসই এমন বিজ্ঞাপন হয় যা হারাম বিষয়বস্তুকে প্রচার করে, তাহলে সে আয়ের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এবং একজন মুসলমানের তা পরিহার করা জরুরি। কারণ মুসলমানকে গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস মুসলমানকে শুধু হারাম নয়, সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকেও দূরে থাকার শিক্ষা দেয়। তাই অনেক আলেমের মতে, যদি মনিটাইজেশন ব্যবস্থায় বারবার হারাম বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে এমন আয় থেকে বিরত থাকা অধিক সতর্কতা ও তাকওয়ার পরিচয়।
পূর্বে অর্জিত সন্দেহপূর্ণ অর্থের ব্যাপারে করণীয়
কোনো ব্যক্তি যদি অতীতে এমন আয় গ্রহণ করে থাকেন এবং পরবর্তীতে বুঝতে পারেন যে এতে শরয়ী সমস্যা ছিল, তাহলে প্রথমে আন্তরিক তাওবা করা উচিত। ফিকহের বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে তা দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের মাঝে দান করে দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দানকারী সওয়াবের নিয়তে নয়; বরং নিজ সম্পদকে অপবিত্র অর্থ থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে তা ব্যয় করবেন।
একজন মুসলিম কনটেন্ট নির্মাতার করণীয়
১. ইসলামিক, শিক্ষামূলক ও কল্যাণকর কনটেন্ট তৈরি করা।
২. অশ্লীলতা ও হারাম বিষয়বস্তু থেকে দূরে থাকা।
৩. সম্ভব হলে বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের সুযোগগুলো ব্যবহার করা।
৪. বিকল্প হালাল আয়ের পথ খুঁজে নেওয়া।
৫. আয়ের ক্ষেত্রে তাকওয়া ও আল্লাহভীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
৬. সন্দেহজনক উপার্জনের চেয়ে কম হলেও নিশ্চিত হালাল উপার্জনকে প্রাধান্য দেওয়া।
সুতরাং ফেসবুক রিলস মনিটাইজেশন নিজে কোনো স্বতন্ত্র হারাম বা হালাল বিষয় নয়; বরং এর বিধান নির্ভর করে কনটেন্টের প্রকৃতি, প্রদর্শিত বিজ্ঞাপনের ধরন এবং হারাম কাজে সহযোগিতার মাত্রার ওপর। ইসলামিক ও উপকারী কনটেন্ট তৈরি করা নিঃসন্দেহে একটি কল্যাণকর কাজ। তবে যদি সেই আয়ের সঙ্গে নিয়মিতভাবে অশ্লীলতা, বেগানা নারীর প্রদর্শন বা অন্যান্য হারাম বিজ্ঞাপন জড়িত থাকে, তাহলে বিষয়টি শরয়ীভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
আর একজন মুমিনের লক্ষ্য শুধুমাত্র অধিক অর্থ উপার্জন নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং হালাল রিজিকের অনুসন্ধান। তাই যেখানে সন্দেহ ও মতভেদের অবকাশ রয়েছে, সেখানে তাকওয়ার পথ অবলম্বন করাই অধিক নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন, হারাম ও সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের জীবিকা ও কর্মকে বরকতময় করে দিন। আমিন।




