বর্তমান যুগে ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। শিক্ষা, ব্যবসা, যোগাযোগ, চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। অনেকেই নিজেদের ইন্টারনেট সংযোগ অন্যদের কাছে ভাড়া দেন বা শেয়ার করেন। এ অবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যদি কোনো ব্যক্তি সেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে গোনাহের কাজ করে, তাহলে কি ইন্টারনেটের মালিকও সেই গোনাহের অংশীদার হবেন?
ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি হলো—মানুষ তার নিজের কাজের জন্য দায়ী। কোনো বৈধ জিনিসের অপব্যবহার করলে তার দায় সাধারণত অপব্যবহারকারীর ওপরই বর্তায়। তবে যদি কেউ জেনে-শুনে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গোনাহের কাজে সহযোগিতা করে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো বহনকারী অন্য কারো বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬৪)
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জিত সৎকর্মের সুফল পাবে এবং তার কৃত অসৎকর্মের দায়ভারও তারই ওপর বর্তাবে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, প্রত্যেক মানুষ নিজের কর্মের জন্যই জবাবদিহি করবে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিজে ক্ষতি করবে না এবং অন্যেরও ক্ষতি করবে না।’ (ইবন মাজাহ, হাদিস : ২৩৪০)
হাদিসে আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১)
অতএব, যদি ইন্টারনেটের মালিকের উদ্দেশ্য বৈধভাবে সেবা প্রদান করা হয়, আর ব্যবহারকারী নিজের ইচ্ছায় সেটিকে হারাম কাজে ব্যবহার করে, তাহলে সেই গোনাহ ব্যবহারকারীর ওপর বর্তাবে।
ইসলামী ফিকহে মালিকানার একটি মৌলিক নীতি হলো—মালিক তার সম্পত্তি বৈধ উপায়ে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার ও অন্যকে ব্যবহারের অধিকার দিতে পারেন। ফোকাহায়ে কেরাম বলেন, ‘তাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অংশ নিজের ইচ্ছামতো নিষ্পত্তি করার অধিকার আছে।’ (শারহুল মাজাল্লা, ১/৬৪৩)
আরো বলা হয়েছে যে, ‘মালিক তিনিই, যিনি নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি নিজের ইচ্ছামতো নিষ্পত্তি করেন।’ (তাফসিরে বায়জাবি, ১/৭)
এছাড়া—‘মালিকানা হলো এমন অধিকার, যার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের সম্পদের ওপর একচ্ছত্রভাবে বৈধ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৭/১০, ২৩৫), আল-মাওসুআতুল-ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ১৪/২৯)
বৈধ জিনিসের অপব্যবহারের দায় কার?
ইন্টারনেট একটি বৈধ সেবা। কেউ যদি সেটিকে বৈধ কাজে ব্যবহার করে, সওয়াব পেতে পারে; আবার কেউ যদি হারাম কাজে ব্যবহার করে, তাহলে গোনাহও তার নিজের হবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। তা হলো, যদি ইন্টারনেটের মালিক নিশ্চিতভাবে জানেন যে, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এটিকে শুধু হারাম কাজেই ব্যবহার করবে এবং তিনি সেই উদ্দেশ্যেই ইন্টারনেট সরবরাহ করেন বা উৎসাহ দেন, তাহলে তা গোনাহের কাজে সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হবে। আর আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ইন্টারনেট একটি বৈধ সেবা। তাই বৈধভাবে ইন্টারনেট ভাড়া দেওয়া বা অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়া জায়েজ। ব্যবহারকারী যদি নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় সেটিকে হারাম কাজে ব্যবহার করে, তবে সেই গোনাহ তার নিজের ওপর বর্তাবে; সাধারণ অবস্থায় ইন্টারনেটের মালিক তার জন্য দায়ী হবেন না। তবে মালিক যদি জেনে-শুনে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বা নিশ্চিতভাবে হারাম কাজে সহযোগিতা করেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন। (তাহতাবি আলাদ-দুররুল মুখতার, ৪/১৯৬, তাহতাবি, ৪/১৯৭, আদ-দুররুল মুখতার, ৪/১৯৬, আল-মাওসুআতুল-ফিকহিয়্যাহ, ৯/২১৫)।




