• ই-পেপার

বর্তমান সমাজের অবক্ষয় রোধে কোরআনের নির্দেশনা

যে চারটি গুণ পরিবারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনে

মুফতি ওমর বিন নাছির
যে চারটি গুণ পরিবারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয় সীমিত; তবুও তাদের সংসারে প্রশান্তি, তৃপ্তি ও সুখের কমতি নেই। আবার কেউ কেউ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও অশান্তি, উদ্বেগ ও অপূর্ণতায় ভোগেন। এই দুই অবস্থার পার্থক্যের নামই হলো ‘বরকত’। ইসলামের দৃষ্টিতে বরকত শুধু অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যা অল্পকে অনেক এবং সীমিতকে অর্থবহ করে তোলে। সময়, সম্পদ, জ্ঞান, পরিবার কিংবা স্বাস্থ্যে যখন বরকত আসে, তখন মানুষের জীবন হয়ে ওঠে শান্তিময় ও পরিপূর্ণ। তাই একজন মুমিনের জন্য বরকতের প্রকৃত অর্থ জানা এবং তা অর্জনের পথ অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বরকতের অর্থ- মুসলিম হিসেবে আমরা প্রতিদিনের কথাবার্তা, দোয়া এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ে ‘বরকত’ শব্দটি ব্যবহার করি। সালামের জবাবে বলি, ‘আপনার ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।’ ঈদের দিনে বলি ‘ঈদ মোবারক’। নতুন বিবাহিত দম্পতির জন্যও সুন্নত অনুযায়ী বরকতের দোয়া করা হয়। আরবি ভাষা ও ব্যাকরণবিদদের মতে, ‘বরকত’ শব্দের অর্থ স্থায়িত্ব, দৃঢ়তা, বৃদ্ধি, প্রাচুর্য এবং কল্যাণের ধারাবাহিকতা। সহজ ভাষায়, কোনো কাজে যখন আল্লাহর বরকত থাকে, তখন সামান্য প্রচেষ্টা থেকেও আশাতীত ফল লাভ করা যায়।

বরকতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হলো- কল্যাণের ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তি নয়, সেই প্রাপ্তির স্থায়িত্ব ও উপকারিতাও বরকতের অন্তর্ভুক্ত। সামগ্রিকভাবে বরকত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক বিশেষ অনুগ্রহ, যা মানুষের জীবনকে কল্যাণময়, অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী সুফলে পরিপূর্ণ করে।

পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে ‘বরকত’ শব্দ ও তার বিভিন্ন রূপ এসেছে। মহান আল্লাহ নিজেই কোরআনকে বরকতময় কিতাব হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটি এমন এক কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি; এটি অত্যন্ত বরকতময়।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৯২)

হাদিসে বরকতের প্রকৃত প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে। আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে...।’ (তিরমিজি , হাদিস নং : ২৯১০)

এই হাদিস প্রমাণ করে, আল্লাহর বরকত থাকলে সামান্য আমলও বহুগুণ ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। অনেক সময় মানুষ সম্পদ, সুযোগ-সুবিধা ও বাহ্যিক সফলতা অর্জন করেও অন্তরে শান্তি খুঁজে পায় না। আবার সীমিত আয় ও সাধারণ জীবনযাপন করেও কেউ সুখী ও তৃপ্ত থাকেন। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো বরকতের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। আর জীবনে বরকত ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায় হলো-

১. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া : বরকত লাভের প্রথম শর্ত হলো কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)
কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তার সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ। তাই তাঁর যে কোনো নেয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করা উচিত।

২. দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা : প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় আল্লাহর কাছে দোয়ার জন্য নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষভাবে তিনটি বিষয়ে বরকতের জন্য দোয়া করা প্রয়োজন— সময়ের বরকত, সম্পদের বরকত ও স্বাস্থ্যের বরকত। সময়ের বরকত কর্মদক্ষতা বাড়ায়, সম্পদের বরকত অভাব দূর করে এবং স্বাস্থ্যের বরকত মানুষকে কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী রাখে।

৩. নামাজকেন্দ্রিক জীবন গড়ে তোলা : পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করে দিনের পরিকল্পনা সাজালে জীবনে শৃঙ্খলা ও আত্মিক প্রশান্তি আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

৪. আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা : পরিবার ও সমাজের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বরকতের অন্যতম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি এবং আয়ুতে বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৯৮৬)

এভাবে সুসম্পর্ক, সততা এবং উত্তম আচরণ মানুষের জীবনে আল্লাহর রহমত, বরকত ও নুসরত বয়ে আনে।

অতএব, বরকত এমন একটি নেয়ামত, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে লাভ করতে হয়। জীবনে বরকত থাকলে অল্প সম্পদেও সুখ থাকে, সীমিত সময়েও কাজ সম্পন্ন হয় এবং সাধারণ জীবনও হয়ে ওঠে প্রশান্তিময়। তাই আমাদের উচিত কৃতজ্ঞতা, নামাজ, দোয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বরকত লাভের চেষ্টা করা। কারণ প্রকৃত সফলতা শুধু বেশি পাওয়া নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া সামান্য নিয়ামতের মধ্যেও অসীম কল্যাণ খুঁজে পাওয়ার নামই বরকত।

দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠার দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠার দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষ জন্মগতভাবেই দুর্বল। কখনো শারীরিক দুর্বলতা, কখনো মানসিক ভঙ্গুরতা, কখনো রাগ-অহংকার, আবার কখনো কৃপণতা ও সংকীর্ণতা তার চরিত্রকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এসব দুর্বলতা শুধু ব্যক্তির আত্মিক উন্নতির পথেই বাধা সৃষ্টি করে না, বরং পরিবার, সমাজ ও মানবসম্পর্কেও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ একজন প্রকৃত মুমিনের কামনা হলো—তিনি যেন শক্ত ঈমানের অধিকারী, কোমল হৃদয়ের মানুষ এবং উদার চরিত্রের অধিকারী হতে পারেন। আর এ জন্য হাদিসে বর্ণিত একটি দোয়া হলো-

 اَللّٰهُمَّ إنّيْ ضَعِيْفٌ فَقَوِّنِيْ وَإِنِّيْ شَدِيْدٌ فَلَيِّنِيْ وَإِنِّيْ بَخِيْلٌ فَسَخِّنِيْ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি দ্বায়িফুন ফা ক্বাওওয়িনি, ওয়া ইন্নি শাদিদুন ফা লায়্যিনি, ওয়া ইন্নি বাখিলুন ফা সাখখিনি। 

অর্থ : ‘হে আল্লাহ আমি দুর্বল, অতএব আমাকে শক্তিশালী করুন। আমি রূঢ়, আমাকে নম্রতা দান করুন। আমি কৃপণ, আপনি আমাকে বদান্যতা দান করুন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস নম্বর : ৫১৭৯)

প্রকৃতির নানা রং ও জাতের ফলফলাদি আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
প্রকৃতির নানা রং ও জাতের ফলফলাদি আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত
সংগৃহীত ছবি

দুনিয়ার অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে ফলমূল এমন নিয়ামত, যা মানুষের জীবনকে আনন্দময়, স্নিগ্ধ ও সুন্দর করে তোলে। এসব ফলমূল দুনিয়ার সুখভোগ, আখিরাতের নিয়ামত। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আমি আকাশ থেকে পরিমিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তা পৃথিবীতে সংরক্ষণ করি। আর আমি চাইলে তা অপসারণ করতেও অবশ্যই সক্ষম। তারপর সেই পানির মাধ্যমে আমি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করি খেজুর ও আঙুরের বাগান। সেখানে তোমাদের জন্য আছে প্রচুর ফল-ফলাদি, যা থেকে তোমরা আহার করো। আর সৃষ্টি করি সিনাই পর্বত থেকে উৎপন্ন এক বৃক্ষ, যা তেল ও ভোজনকারীদের জন্য তরকারিস্বরূপ উপাদান উৎপন্ন করে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১৮-২০)

দুনিয়ায় নানা স্বাদ, রং ও আকৃতির ফল দেখা যায়। শুধু এগুলোর দিকে তাকালেই মন মুগ্ধ হয়ে যায়। লাল, গোলাপি, সবুজ, গাঢ় লাল, হলুদ কিংবা হালকা গোলাপি! কত বিচিত্র রঙের সমাহার! অথচ আকাশের বৃষ্টি একই, মাটি একই, পানিও একই; কিন্তু সেই একই উপাদান থেকে উৎপন্ন ফলের রূপ, রং ও স্বাদ কতই না বৈচিত্র্যময়!

অনেক সময় গাছের পাতা ও বাহ্যিক আকৃতি এক রকম হলেও তাদের ফলের আকৃতি, স্বাদ, প্রকৃতি, রং ও সুগন্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়।

আবার কখনো ফলের আকৃতি প্রায় একই হলেও কারো স্বাদ মিষ্টি, কারো টক, আবার কারো তিক্ত। কিছু ফল কাঁটায় ঘেরা থাকে, অথচ তার ভেতরের স্বাদ হয় অপূর্ব মধুর। প্রতিটি ফলেরই একটি আবরণ রয়েছে, যা তার রস, সতেজতা ও কোমলতা রক্ষা করে। একই নামের ফলও কখনো ডিম্বাকার, কখনো গোলাকার হয়। আবার একই ফলের রংও ভিন্ন হতে পারে।

কিছু ফল গাছের অনেক উঁচুতে ধরে, যা সংগ্রহ করতে কষ্ট হয়; আবার কিছু ফল এত নিচুতে থাকে যে সহজেই তুলে নেওয়া যায়।
কিছু ফল গাছে ধরে, কিছু লতায়, কিছু মাটির ওপর জন্মায়, আবার কিছু মাটির নিচে। কোথাও ফল গুচ্ছাকারে জন্মায়, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কিছু ফল ভারী, কিছু হালকা। কিছু ফল তাজা খাওয়া হয়, আবার শুকিয়েও খাওয়া হয়।

কিছু ফল শুধু মরুভূমিতে জন্মায়, কিছু শুধু শীতপ্রধান দেশে, আবার কিছু শুধুই উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে। বছরের প্রতিটি ঋতুতেই নির্দিষ্ট কিছু ফল জন্মায়, যা অন্য সময় পাওয়া যায় না। কিছু ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়, আবার কিছু খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের ও আমাদের গবাদি পশুর জন্য ভোগের উপকরণ। যেমন—মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের ও তোমাদের গবাদি পশুর উপভোগের জন্য।’ (সুরা : আন-নাজিআত, আয়াত : ৩৩)

আল্লাহর এই অপার নিয়ামতের গভীরতা উপলব্ধি করতে তাঁর এই বাণী নিয়ে চিন্তা করুন : ‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। অতঃপর তার মাধ্যমে আমি সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি। সেখান থেকে সবুজ অঙ্কুর বের করেছি, যার থেকে স্তরে স্তরে শস্যদানা উৎপন্ন হয়। আর খেজুরগাছের মোচা থেকে ঝুলে থাকে নিকটবর্তী গুচ্ছ। আরো আছে আঙুরের বাগান, জলপাই ও ডালিম—যাদের কিছু একে অপরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, আবার কিছু ভিন্ন। তোমরা লক্ষ করো তাদের ফলের দিকে, যখন তা ধরে এবং যখন তা পরিপক্ব হয়। নিশ্চয়ই এতে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৯৯)

আরো এক জায়গায় আল্লাহ বলেন : ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন মাচায় ওঠানো বাগান এবং মাচাবিহীন বাগান, খেজুরগাছ, বিভিন্ন স্বাদের শস্য, জলপাই ও ডালিম, যাদের কিছু একে অপরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, আবার কিছু ভিন্ন। যখন এগুলো ফল দেয় তখন তা থেকে খাও এবং ফসল কাটার দিন তার হক আদায় করো। আর অপচয় করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ১৪১)

দুনিয়ার ফলের সঙ্গে জান্নাতের ফলের তুলনা
জান্নাতের ফল কখনো মৌসুমের অপেক্ষায় থাকবে না। যখনই কেউ চাইবে, তখনই তা উপস্থিত হবে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তারা নিজেদের পছন্দমতো ফল বেছে নেবে।’ (সুরা : আল-ওয়াকিয়াহ, আয়াত : ২০)

জান্নাতের ফল চিরস্থায়ী, অবিরাম এবং অফুরন্ত। কখনো ফুরিয়ে যাবে না, কখনো নিষিদ্ধও হবে না। জান্নাতবাসীরা কখনো ফলের অভাব, শেষ হয়ে যাওয়া কিংবা তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করবে না। তারা যখনই যা ইচ্ছা করবে, সেই ফল তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জান্নাতের সেই চিরস্থায়ী নিয়ামত ও অফুরন্ত ফলের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।

সবরের সময় একজন মুমিন যেসব পন্থা অবলম্বন করবেন

জাওয়াদ তাহের
সবরের সময় একজন মুমিন যেসব পন্থা অবলম্বন করবেন
সংগৃহীত ছবি

ইসলামী জীবনদর্শনে ‘সবর’ বা ধৈর্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিভাষা। কোরআন মাজিদে নব্বইয়েরও বেশি স্থানে সবর বা ধৈর্যের কথা বলা হয়েছে। তবে আমাদের সমাজে সবরের যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে, তা প্রায়ই অসম্পূর্ণ। অনেকে মনে করেন, সবর মানে হলো হাত গুটিয়ে বসে থাকা, পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করা কিংবা শুধু কষ্টের সময় চুপ থাকা। অথচ সবরের প্রকৃত হাকিকত বা মর্ম অত্যন্ত বৈপ্লবিক ও সক্রিয়।

১. উপকরণ গ্রহণ ও কার্যকর প্রচেষ্টার সঙ্গে ধৈর্য : ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, সবরের প্রথম শর্ত হলো সাধ্যমতো চেষ্টা করা এবং ফলাফল অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম বা ‘আসবাব’ গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা এই মহাবিশ্বকে কার্যকারণ সম্পর্কের অধীনে সৃষ্টি করেছেন। তাই কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হাত গুটিয়ে বসে থেকে বলা যে আমি ধৈর্য ধরছি, তা মূলত ধৈর্যের নামে অলসতা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা এর সর্বোত্তম উদাহরণ পাই। হিজরতের সময় তিনি শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে থাকেননি, বরং তিনি যথাযথ পরিকল্পনা করেছেন, সাহাবি হজরত আলী (রা.)-কে নিজের বিছানায় শুইয়েছেন, গুহায় আত্মগোপন করেছেন এবং একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেছেন।

অর্থাৎ তিনি সম্ভাব্য সব উপায় বা ‘আসবাব’ গ্রহণ করার পর ধৈর্য ধরেছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি তার উট না বেঁধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি উটটি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করব? রাসুলুল্লাহ (সা.) জবাব দিলেন, আগে উটটি বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
অতএব, উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহারের পর ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করাই হলো প্রকৃত সবর।

২. দোয়ার সঙ্গে ধৈর্য : ধৈর্যের সঙ্গে দোয়ার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মুমিনের অস্ত্র হলো দোয়া। যখন মানুষ কোনো সংকটে পড়ে, তখন তার ধৈর্য হারানো বা হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকতে দোয়া এক অসীম শক্তি হিসেবে কাজ করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের (নামাজ ও দোয়া) মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ১৫৩)


দোয়া মুমিনকে এই আশ্বাস দেয় যে সে একা নয়; বরং মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা তার সঙ্গে আছেন। দোয়ার মাধ্যমে যে ধৈর্য অর্জিত হয়, তা মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৩. সক্রিয়তা ও কর্মতৎপরতার সঙ্গে ধৈর্য : ধৈর্যের অর্থ কখনোই স্থবিরতা বা জড়তা নয়। সবর মানে হলো প্রতিকূল স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানো। সক্রিয়তা ও কর্ম শব্দ দুটি ব্যবহারের মাধ্যমে এটিই বোঝানো হয়েছে যে সংকটকালে আমাদের কর্মতৎপরতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিতে হবে। নবী-রাসুলদের জীবনে আমরা দেখি, কাফিরদের চরম অত্যাচার ও বাধার মুখেও তারা তাঁদের দাওয়াতের কাজ বা কর্মতৎপরতা এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দেননি। তাঁরা ধৈর্যের সঙ্গে তাঁদের সক্রিয়তা অব্যাহত রেখেছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর মানুষের জন্য তা-ই থাকে, যার জন্য সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : আন-নাজম, আয়াত : ৩৯)

এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে সক্রিয় চেষ্টা ছাড়া শুধু মৌখিক ধৈর্যের কোনো মূল্য নেই। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বা বাধা এলে সেই বাধা অতিক্রম করার মানসিক শক্তির নামই হলো সবর।

৪. বীজ বপনের সঙ্গে ধৈর্য : কৃষকের উপমাটি ধৈর্যের হাকিকত বোঝার জন্য অত্যন্ত জুতসই। একজন কৃষক জমিতে লাঙল দেয়, কঠোর পরিশ্রম করে বীজ বপন করে, আগাছা পরিষ্কার করে এবং রোদ-বৃষ্টি সহ্য করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই সবর। সে যদি বীজ বপন না করে শুধু ফসল কাটার আশায় ধৈর্য ধরে বসে থাকত, তবে তা হতো চরম বোকামি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য বর্তমানে পরিশ্রমের ‘বীজ’ বপন করতে হয়। ছাত্রের জন্য পড়ালেখা, ব্যবসায়ীর জন্য সততার সঙ্গে শ্রম, এগুলোই হলো তার ‘বীজ’। এই পরিশ্রমের প্রক্রিয়া চলাকালীন যে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা, তাকেই প্রকৃত সবর বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং (সৎকাজে) সুদৃঢ় থাকো।’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত : ২০০)

৫. আল্লাহর প্রতি সুধারণা : ধৈর্য ধারণকারী ব্যক্তির মনে যদি আল্লাহর প্রতি সন্দেহ থাকে, তবে সেই ধৈর্য তাকে শান্তি দিতে পারে না। ‘হুসনে জান’ বা আল্লাহর প্রতি সুধারণা হলো ধৈর্যের জ্বালানি। মুমিন বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তাকে যে পরীক্ষায় ফেলেছেন, তার পেছনে অবশ্যই কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সঙ্গে তেমন আচরণই করি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪০৫)

যদি বান্দা বিশ্বাস করে যে এই কঠিন সময়ের পর অবশ্যই সুখের দিন আসবে, তবে আল্লাহ তার জন্য পথ সহজ করে দেন। কোরআন ঘোষণা দিয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে।’ (সুরা : আলাম নাশরাহ, আয়াত : ৫-৬)

৬. তাওয়াক্কুল ও ‘কুন ফায়াকুন’-এর ওপর বিশ্বাস : সবরের চূড়ান্ত পর্যায় হলো ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা। যখন বান্দা তার সামর্থ্য অনুযায়ী সব চেষ্টা শেষ করে, তখন সে তার ফলাফল আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়। তখন তার হৃদয়ে এই প্রশান্তি বিরাজ করে যে আমার মালিক ‘কুন ফায়াকুন’ (হও, আর তা হয়ে যায়)-এর ক্ষমতার অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি যখন কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন শুধু বলেন, ‘হও’, আর তা হয়ে যায়।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৮২)

এই বিশ্বাসের কারণে মুমিন কখনো নিরাশ হয় না। সে জানে, দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর দরজা সব সময় খোলা থাকে। এই অটল বিশ্বাসের নামই হলো সবর।

৭. ধৈর্যের আনন্দদায়ক ও ফলপ্রসূ ফলাফল : যখন কোনো ব্যক্তি পরিশ্রম, দোয়া, সক্রিয়তা এবং তাওয়াক্কুলের সমন্বয়ে ধৈর্য ধারণ করে তখন তার জীবনের ফলাফল হয় অত্যন্ত চমৎকার। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের কোনো হিসাব ছাড়াই প্রতিদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ধৈর্যশীলদের তো তাদের সওয়াব বা প্রতিদান পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।’ (সুরা : আল-জুমার, আয়াত : ১০)

দুনিয়াতে সাফল্যের মুকুট আর আখিরাতে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম, উভয়ই ধৈর্যের ফসল। ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, কুয়া থেকে দাসত্ব, জেলখানা থেকে মিসরের সিংহাসন, এই পুরো দীর্ঘ সফরে তিনি সক্রিয় ধৈর্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ফলাফল হিসেবে আল্লাহ তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্মান দান করেছিলেন।

তাই সবর বা ধৈর্য হলো জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক নিরন্তর ও সক্রিয় লড়াই। এটি শুধু চোখের জল ফেলা বা অসহায়ত্ব প্রকাশ নয়, বরং এটি হলো, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নাম।

আমাদের মনে রাখা উচিত, যে সবরের সঙ্গে শ্রম নেই তা অলসতা; যে সবরের সঙ্গে দোয়া নেই তা অহংকার; আর যে সবরের সঙ্গে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস নেই তা শুধু হতাশা। তাই একজন মুমিনের ধৈর্য হতে হবে প্রবাদে বর্ণিত ওই গুণের সমষ্টির মতো, যেখানে পরিশ্রম থাকবে, দোয়া থাকবে, সক্রিয়তা থাকবে এবং সর্বোপরি থাকবে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার ওপর অটল বিশ্বাস। তবেই আমাদের জীবন হবে সফল, ফলপ্রসূ ও আনন্দদায়ক। ইনশাআল্লাহ।