উজানের ঢলে ফুলে-ফেঁপে উঠছে তিস্তা। পানির প্রবাহ বেশি থাকায় তিস্তা অববাহিকার পাঁচ জেলা যথাক্রমে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা বাড়ছে।
সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, রবিবার (২৮ জুন) সন্ধ্যা ৭টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ২২ মিটার, যা বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটারের চেয়ে ৯ সেন্টিমিটার বেশি ছিল। আজ সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে পানি কিছুটা কমলেও নদীর প্রবল স্রোত অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাটই খুলে রাখা হয়েছে।
পাউবো ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উজানে কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। সেই ঢলের প্রভাবেই বাংলাদেশ অংশে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মৌসুমে গত ২৩ জুন প্রথমবারের মতো তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছিল। পরদিন পানি কমলেও নতুন করে উজানের ঢলে আবারও নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে।ইতোমধ্যে তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু এলাকা,গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমি ও চারণভূমিতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। পানি আরও বাড়লে শত শত পরিবার পানিবন্দি হওয়ার পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদীতীরবর্তী প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার গোবর্ধন গ্রামের বাসিন্দা ফজলার রহমান বলেন, ‘বিকেল থেকেই তিস্তার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। চরাঞ্চলের কয়েকটি বাড়িতে ইতোমধ্যে পানি ঢুকেছে। পানির চাপ দেখে মনে হচ্ছে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। যদি পানি আরও বাড়ে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়া বাঁধগুলো ভেঙে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। বন্যার সময় আমরা রাত জেগে পাহারা দিই।’
একই উপজেলার গরিবুল্লাহরটারী গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে পানি ওঠানামা করছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই অনেক বেড়েছে। চরাঞ্চলের অনেক পরিবার ইতোমধ্যে পানিবন্দি হতে শুরু করেছে। শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়। গবাদিপশু নিরাপদে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো শুষ্ক মৌসুমে টেকসই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। স্থায়ী সমাধান না থাকায় সামান্য পানি বাড়লেই নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর বর্ষা এলেই তিস্তা তীরবর্তী মানুষের দুর্ভোগ নতুন করে সামনে আসে। তাই কেবল তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নিয়ে নদীশাসন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের টেকসই সংস্কার, ড্রেজিং এবং তিস্তা অববাহিকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় উজানের প্রতিটি ঢলই উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জন্য নতুন দুর্ভোগ বয়ে আনবে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, ‘উজানের পানি প্রবাহ অব্যাহত থাকায় তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।এর ফলে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে হালকা বন্যা দেখা দিতে পারে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব বলেন, ‘উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় তিস্তার পানি বেড়েছে। নদীর পানির প্রবাহ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নিয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।’