সুরেলা কণ্ঠের অলকা ইয়াগনিককে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। তেজাব সিনেমায় ‘এক দো তিন’ গানে মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে নেচেছিল গোটা ভারত। পেছনের কণ্ঠটি ছিল অলকা ইয়াগনিকের। চার দশকের ক্যারিয়ারে ‘তালে সে তাল মিলা’, ‘টিপ টিপ বারসা পানি’, ‘দিলবার দিলবার’, ‘সুরাজ হুয়া মাধ্যম’, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন তিনি।
কুমার শানুর সঙ্গে ‘চুরা কে দিল মেরা’ গেয়ে তিনি চুরি করেছেন কোটি ভক্তের হৃদয়। ক্যারিয়ারে ২৫টি ভাষায় ২২ হাজার গান রেকর্ড করা অলকার কণ্ঠ থেমে যায় ২০২৪ সালে, ‘অমর সিং চিমকিলা’ ছবির পর আর কোনো গানে কণ্ঠ দেননি তিনি। দুই বছর একদম চোখের আড়ালে ছিলেন অলকা।
দুই বছর পর গত মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে দেখা মিললে অলকা ইয়াগনিকের। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘পদ্মভূষণ’ গ্রহণ করেছেন তিনি। অলকা ইয়াগনিকের ’পদ্মভূষণ’ পাওয়া কোনো বিস্ময় নয়, তবে পুরস্কার নিতে তাকে হুইল চেয়ারে আসতে দেখে উদ্বিগ্ন হয়েছেন অনেকে। সুরের রাণী প্রাণবন্ত অলকাকে ম্লান মুখে হুইল চেয়ারে দেখে কষ্ট পেয়েছেন অনেকেই।
কিংবদন্তি গায়িকা অলকা ইয়াগনিক ‘সেন্সোরিনিউরাল হিয়ারিং লস’ নামে একটি বিরল শ্রবণজনিত জটিলতায় ভুগছেন। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি বিমানভ্রমণ শেষে নামার পরপরই হঠাৎ আবিষ্কার করেন, তিনি আর কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। আকস্মিক বধিরতা থমকে দেয় তার ক্যারিয়ার। হঠাৎ কোনো ভাইরাল অ্যাটাকের কারণে তার এ অবস্থা হয়েছে বলে ডাক্তারদের মত। কারো কারো মতে চার দশকের ক্যারিয়ারে বিরামহীনভাবে উচ্চশব্দের সঙ্গে থাকার কারণেও এমনটি হতে পারে।
আড়ালে থাকলেও শ্রোতারা অলকাকে ভুলে যাননি। তিনি ইউটিউবে সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী, যার ২০২০ সালে ১৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন এবং ২০২১ সালে ১৭ বিলিয়ন স্ট্রিমের জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম রয়েছে। ২০২৬ সালেও তিনি ইউটিউবে প্রতি সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি স্ট্রিম হওয়া সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, দুটি বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার এবং সেরা প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে সাতটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন সুরের এই জাদুকর।
হুইল চেয়ারে অলকাকে দেখে তার ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন অলকা নিজেই ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে নিজের বর্তমান অবস্থার বর্ণনা করে আবেগঘন এক পোস্ট দিয়েছেন। পোস্টটি তিনি শুরু করেছেন এভাবে, ‘গত দুই বছর ধরে আমি লাইমলাইট, গণমাধ্যমের সামনে আসা এবং আপনাদের সঙ্গে নিজের পথচলার গল্প ভাগ করে নেওয়া থেকে দূরে আছি। আপনাদের মধ্যে অনেকেই জানতেন যে, আমি এক কঠিন স্বাস্থ্যগত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আর এই পুরোটা সময় আপনাদের ভালোবাসা, প্রার্থনা, বার্তা এবং অবিচল সমর্থন প্রতিটা পদক্ষেপে আমার পাশে ছিল।’
এরপর তিনি যোগ করেন, ‘আজ যখন আমি দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা—মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মভূষণ’ গ্রহণ করতে বাইরে পা রাখলাম, তখন আমার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরপুর ছিল। এই সম্মাননা আমাকে গভীরভাবে বিনম্র করেছে। যদিও এতে আমার নাম লেখা আছে, কিন্তু এটি ঠিক ততটাই সেই প্রতিটি শ্রোতার, যারা আমার কণ্ঠকে তাদের জীবনে স্বাগত জানিয়েছেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমার গানগুলোকে বহন করে নিয়ে গেছেন এবং আমার ভালো ও খারাপ উভয় সময়েই আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন।’
ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছেন জানিয়ে অলকা লিখেছেন, ‘এই মুহূর্তটি বিশেষভাবে অর্থপূর্ণ মনে হচ্ছে কারণ এটি কেবল আমার কাজের স্বীকৃতি নয়, বরং ভালোবাসা, আশা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি থেকে যে শক্তি আসে, তার এক অনন্য স্মারক। আমি ধীরে ধীরে নিজের চেনা ছন্দে ফিরে আসছি এবং আজ এখানে উপস্থিত হতে চেয়েছি—শুধু নিজের জন্য নয়, বরং আপনাদের প্রত্যেকের জন্য যারা আমার এই পথচলার অংশ হয়েছেন।’
অলকা ইয়াগনিক তাকে এই সম্মাননা দেওয়ার জন্য দেশের নেতৃত্ব এবং কর্তৃপক্ষের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি শেষ করেছেন ভক্তদের প্রতি ভালোবাসা জিনিয়ে, ‘বছরের পর বছর ধরে আমার প্রতি আপনাদের এই স্নেহ, দয়া, প্রার্থনা এবং বিশ্বাসের জন্য ধন্যবাদ। আমি এর সবকিছুই নিজের সঙ্গে বহন করি। আজ আমি কেবল একটি পুরস্কারই গ্রহণ করিনি—আমি সেই কোটি মানুষের ভালোবাসা অনুভব করেছি, যারা আমার এই যাত্রার অংশ ছিলেন। ধন্যবাদ। ভালোবাসাসহ, অলকা।’
মুহূর্তেই ভাইরাল অলকা ইয়াগনিকের পোস্ট। হাজারো ভক্তের ভালোবাসা, শুভকামনায় উপচে পড়ছে কমেন্ট বক্স। সে তালিকায় সাধারণ মানুষ যেমন আছেন; আছেন কুমার শানু, ইলা অরুণ, অদিতি সিং শর্মা, সুদেশ ভোসলে, অকৃতি কাক্কার, ভূমি পেদনেকার, বীর পাহারিয়ার মতো তারকারাও। অনেকে তাকে পদ্মভূষণ পাওয়ায় অভিনন্দন জানিছেন। অনেকে তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে লিখেছেন, ‘ফিরে এসো অলকা ইয়াগনিক।’










