শিক্ষার্থীদের আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ প্রকল্প এবং শিক্ষকদের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ চালু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, একইসঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষকদের বকেয়া বেতন পরিশোধে অর্থমন্ত্রী দ্রুততম সময়ে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন এবং আগামী জুলাই মাসের মধ্যে বাকি সব টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
রবিবার (২৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পরিকল্পনার কথা জানান।
দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও বৈষম্য নিরসনে সরকারের নেওয়া নানামুখী মহাপরিকল্পনার কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন তিনি।
সংসদে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষায় এখন এক ব্যাপক পরিকল্পনা ও রূপান্তর চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায় যুক্ত করতে যাচ্ছে। এই ট্যাবের মাধ্যমে শিক্ষকরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্লাস লেসন প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার সব বিষয়ে সার্বক্ষণিক আপডেট ও অবগত থাকবেন। এই ট্যাবের সমন্বয়ে দেশে ২৫ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করা হবে। এর পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে আরও ২০ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
মন্ত্রী আরও জানান, দেশের ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যেই ১৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে ‘ইউনিক এডুকেশন আইডি’ চালু করার ব্যবস্থা হাতে নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের সনাতন জিপিএ-নির্ভর পড়াশোনার বাইরে নিয়ে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু খাতা কলম নিয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার সেই সোনার হরিণের পিছনে ছুটে বেড়াক, প্রধানমন্ত্রী তা চান না। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার আওতায় ৩০০ শিক্ষককে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া উন্নত বিশ্বের সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বারের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, দেশে যদি জন্ম নিবন্ধনের পর থেকেই ন্যাশনাল আইডি বা ভোটার আইডির মতো একটি স্থায়ী নম্বর দেওয়া যেত, তবে স্কুল সিস্টেমে নতুন করে এই আইডি চালু করার প্রয়োজন হতো না।
পরিবেশ সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ড. মিলন বলেন, দেশের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগাতে হবে এবং এই পরিকল্পনার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি স্টার্টআপ ইনোভেশন শোকেস অনুষ্ঠান আগামীকাল বিকেল ২টায় চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে সারাদেশে ২৪ হাজার করে বিএনসিসি ক্যাডেট তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বক্তব্যে বান্দরবানের এক দুর্গম এলাকার প্রধান শিক্ষকের সংগ্রামের গল্প তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, থানচির রেমাক্রি নদীপথের দুর্গম এলাকায় ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ টিকিয়ে রাখতে প্রধান শিক্ষক বাম খিয়াং মিলান এক ব্যতিক্রমী সংগ্রাম চালাচ্ছেন। ৬৫ জন শিক্ষার্থীর অধিকাংশ পরিবার দরিদ্র হওয়ায় তারা ঠিকমতো বেতন দিতে পারেন না। এই শিক্ষক ও কর্মচারী সংকট মোকাবিলায় প্রধান শিক্ষক নিজে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক আনা নেওয়া করেন। সেখান থেকে আয় হওয়া ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ৩০ হাজার টাকাই তিনি স্কুলের পেছনে খরচ করেছেন। এই স্কুলটি টিকিয়ে রাখার জন্য করা একটি আবেদন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তিন্দু এলাকার ওই স্কুলটিকে জাতীয়করণ করার জন্য এরইমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন।
মাদ্রাসা শিক্ষকদের বকেয়া বেতনের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে মাদ্রাসায় প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের বেতনের জন্য প্রতি মাসে ৫০১ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও বাজেট সংকটের কারণে এই মাসে বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ১০০ কোটি টাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এবং আগামী জুলাই মাসে বাকি সব টাকা পরিশোধের কথা দিয়েছেন।
সবশেষে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর ভাতার সমস্যার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ২০২০ সাল থেকে যেসব শিক্ষক অবসরে গেছেন, তারা কেউই এখন পর্যন্ত কোনো অবসরভাতা বা কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পাচ্ছেন না।






