২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) জন্য মোট ১২,৩০০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২,০০১.৮২ কোটি টাকা। উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বাজেটের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেশের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—স্বাস্থ্যশিক্ষা ও চিকিৎসা গবেষণার বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন কি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে?
প্রকাশিত বাজেট অনুযায়ী, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ১৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, খুলনা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ৬৩ লাখ টাকা। সংখ্যাগুলো স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি করে।
অবশ্যই এ কথা স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘদিনের চিকিৎসা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর অধীনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, রেসিডেন্ট চিকিৎসক, গবেষক এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। উন্নত গবেষণাগার, উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার কারণে এ প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বড় বরাদ্দ পাওয়ার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।
তবে এখানেই আলোচনার শেষ নয়। কারণ একটি আধুনিক রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভবিষ্যতের চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ তৈরিতে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধীনে একাধিক মেডিক্যাল কলেজ, নার্সিং ও স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করা মানে দেশের স্বাস্থ্যশিক্ষার ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।
বাজেট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নির্ধারণে শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষকসংখ্যা, অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা, গবেষণা কার্যক্রম, অবকাঠামোগত প্রয়োজন, নিজস্ব ক্যাম্পাস ও হাসপাতালের উপস্থিতি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বিবেচনায় নিতে হয়। এসব সূচকের আলোকে বরাদ্দ নির্ধারিত হলে তা অধিকতর যৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর প্রশাসন, একাডেমিক কার্যক্রম, গবেষণা, তথ্য-প্রযুক্তি উন্নয়ন, গ্রন্থাগার পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীসেবা নিশ্চিত করতে একটি ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা প্রয়োজন। সে বিবেচনায় খুব কম বরাদ্দ পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী শিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে যেতে পারে। বিশেষত নতুন ও বিকাশমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ অপরিহার্য।
বাংলাদেশ বর্তমানে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি, গবেষণার সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা ও উদ্ভাবনের অভাব, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবলের সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার আঞ্চলিক বৈষম্য এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য শুধু হাসপাতাল নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্র।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের মূল ভিত্তি হচ্ছে চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো চিকিৎসা গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ তারা জানে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিনিয়োগ মানে মানুষের জীবনমান, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।
বাংলাদেশেও মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি স্বচ্ছ ও প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ননীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি। বরাদ্দ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীসংখ্যা, গবেষণার পরিমাণ, অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, আঞ্চলিক চাহিদা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে স্পষ্ট সূচক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে নবীন ও আঞ্চলিক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি ন্যূনতম উন্নয়ন তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যাতে তারা প্রাথমিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়ে আমরা প্রায়ই কথা বলি। কিন্তু উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি নির্মিত হয় শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রে। আজকের মেডিক্যাল শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যনীতিনির্ধারক। তাই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটকে শুধু ব্যয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাজেটের অঙ্ক শুধু অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করে না; এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারও নির্দেশ করে। তাই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে একটি গভীর ও তথ্যভিত্তিক জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন। লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানো নয়; বরং এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দেশের প্রতিটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হয়। তাহলেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরো শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তি লাভ করবে।





এখন দেশে শিক্ষার ব্যাপারে আগের আগ্রহ নেই। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের শিক্ষায়। এর কারণটাও ওই দারিদ্র্যই। মানুষ দেখতে পাচ্ছে লেখাপড়া শিখে লাভ হচ্ছে না। চাকরি হচ্ছে না। উপার্জনের আশা নেই। এই পরিস্থিতিতে ছাত্রসমাজের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার ব্যাপারে অনীহা এবং ঠিক বিপরীতে সন্ত্রাসের ব্যাপারে আগ্রহ ওই হতাশারই দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ বটে।
