• ই-পেপার

বেলফাস্টে পুরনো ইতিহাসের ‘নতুন রূপ’, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সংখ্যালঘুরা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথে

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেন আক্রমণ করেন, তখন তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যাবেন আর কয়েকদিনের মধ্যে কিয়েভ দখল করে নেবেন। কিন্তু ইউক্রেনের পাল্টা প্রতিরোধ চমকে দেয় সবাইকে। কয়েকদিন বা কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল যে যুদ্ধের, সে যুদ্ধ এখন নতুন নতুন মাইলফলক গড়ছে। যুদ্ধ আসলে কোনো হিসাব মেনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল মিলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন কি তারা ভেবেছিলেন, ইরান তাদের এমন নাকানি চুবানি খাওয়াবে!

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে একটু আড়ালে ফেলে দিয়েছে। তবে তাতে যুদ্ধ থামেনি। বরং এই যুদ্ধ গত ১১ জুন এক নতুন মাইলফলক গড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মোট স্থায়িত্বকালকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই শুরু হয়ে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত চলেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মোট ১ হাজার ৫৬৭ দিন স্থায়ী হয়েছিল। গত ১১ জুন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ড গড়েছে। আজকের হিসাব পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ১ হাজার ৫৭০ দিন ধরে চলছে। কিছু কিছু রেকর্ড আমাদের বেদনার্ত করে, সভ্যতাকেই চোখ রাঙায়। আধুনিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সভ্যতার জন্য এক গ্লানির রেকর্ড।

দীঘস্থায়ী যে কোনো যুদ্ধের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল। নিজ নিজ সুবিধার জন্য অনেক সময় ক্ষয়ক্ষতি আড়াল করা হয়, অনেক সময় বাড়িয়ে বলা হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আর্থিক ক্ষতিও কোনো নির্দিষ্ট একটি সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এই যুদ্ধ সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকেই বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে।

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধের মোট আর্থিক ক্ষতি ও ব্যয়ের পরিমাণ ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় হলো মানুষের প্রাণ। বিভিন্ন হিসেবে এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ মানুষ মারা গেছে। এছাড়া আহত, নিখোঁজ ধরলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও এই যুদ্ধে অন্তত ৪০ জন বাংলাদেশি তরুণ প্রাণ দিয়েছে। উন্নত জীবনের আশায় দালালদের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণরা রাশিয়ায় যান। প্রতিশ্রুতি ভেঙে তাদের অনেককে জোর করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে কোনো কারণ ছাড়াই বাংলাদেশের তরুণরা প্রাণ দেয় ইউক্রেন ফ্রন্টে।

যুদ্ধের পাশাপাশি আড়ালে যুদ্ধ থামানোর নানা কূটনৈতিক তৎপরতাও চলে। কিন্তু এখন পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কোনো পদক্ষেপই কার্যকর হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আশায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করেছিলেন। ট্রাম্পও নোবেল পাননি, যুদ্ধও বন্ধ হয়নি। ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ তো করতে পারেনইনি, বরং নিজেই বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছেন আরো বৃহত্তর পরিসরের এক যুদ্ধে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের নানামুখী চেষ্টার মধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির একটি খোলা চিঠি নাটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। গত ৪ জুন জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে পাঠানো খোলা চিঠিতে সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো কোনো নিরপেক্ষ দেশে পুতিনের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররাও এই প্রস্তাব সমর্থন করেছে। পাশাপাশি জুড়ে দিয়েছেন কিছু শর্ত। তবে পুতিন শর্তযুক্ত এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ করেই তিনি লক্ষ্য অর্জন করবেন।

তেমনটি হলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরো নতুন নতুন গ্লানির রেকর্ড গড়তে পারে। এক জরিপে দেখা গেছে, ইউক্রেনের অধিকাংশ নাগরিক মনে করেন, আগামী বছরের আগে এই যুদ্ধ থামবে না। তার মানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে তো ছাড়িয়েছেই, এগিয়ে যেতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার দিকে।

ইরানের জব্দ তহবিল ছাড়তে পারে ইউএই : রয়টার্স

অনলাইন ডেস্ক
ইরানের জব্দ তহবিল ছাড়তে পারে ইউএই : রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের  আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলার অর্থ ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বড় পরিসরের আলোচনাও চলছে। সেই আলোচনার শেষ পর্যায়ে এসে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের তেল বিক্রির অর্থ ছাড়ের বিষয়টি সামনে এসেছে।

কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে ইরানের কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলার আটকে রয়েছে। সেই অর্থ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনার অংশ হতে পারে।

রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে দুইটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত মোট ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ হস্তান্তর করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরো দুটি সূত্র বলেছে, মোট অর্থের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্তও হতে পারে। তাদের দাবি, ইরান সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর হামলা বন্ধ করার বিনিময়ে এই আর্থিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একটি পৃথক সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ধাপে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যেই ছাড় করা হয়েছে।

রয়টার্স জানায়, এই অর্থ কোন উৎস থেকে এসেছে তা যাচাই করা যায়নি। অর্থটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব তহবিল, দেশটির ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ইরানের অর্থ, নাকি অন্য কোনো উৎস থেকে এসেছে- সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে এসব প্রতিবেদনের জবাবে শনিবার ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে তারা অর্থ মুক্ত করার সব ধরনের দাবি সরাসরি অস্বীকার করে। মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানের কোনো জব্দকৃত অর্থ মুক্ত করা হয়নি এবং কোনো অর্থ স্থানান্তরও করা হয়নি। তারা স্পষ্টভাবে আরো বলে, এ ধরনের কোনো আর্থিক লেনদেন বা প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত জড়িত নয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ ধরনের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।’ তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আর কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি তারা।

এর আগে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, দেশটি সব সময় আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নীতিতে কাজ করে। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতি এমনভাবে পরিচালিত হয়, যাতে অঞ্চলে সংঘাত কমে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। 

তিনি আরো বলেন, ওই অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত সেগুলোকে সমর্থন করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত।


 

ইরানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাঠানোর খবর ভিত্তিহীন : আমিরাত

অনলাইন ডেস্ক
ইরানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাঠানোর খবর ভিত্তিহীন : আমিরাত
ছবি : সংগৃহীত।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগসংবলিত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষ করে ইরানে ৩০০ কোটি ডলার পাঠানোর যে দাবি করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে দেশটি।

এর আগে চারটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক সপ্তাহ ধরে ইরানের হামলার পর দেশটি তাদের নীতিতে পরিবর্তন এনে ইরানের জন্য শত শত কোটি ডলারের আর্থিক সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। আরো বলা হয়, কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনার অংশ হিসেবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানের তেল বিক্রির শত শত কোটি ডলার ছাড় বা মুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে এসব প্রতিবেদন সংযুক্ত আরব আমিরাত অস্বীকার করেছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলেছে, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে ইরানের কোনো জব্দকৃত তহবিল মুক্ত, স্থানান্তর বা এ ধরনের কোনো লেনদেন করা হয়নি।’ 

এ ছাড়া, মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমকে সঠিক তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করার এবং ভিত্তিহীন বা যাচাইবিহীন খবর প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি চূড়ান্তের পথে, খুলতে পারে হরমুজ

অনলাইন ডেস্ক
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি চূড়ান্তের পথে,  খুলতে পারে হরমুজ
ছবি: রয়টার্স

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেছেন, চুক্তি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও নৌ অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হবে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, চুক্তির মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী উত্তেজনা কমানো। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী ধাপে শুরু হবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও চুক্তি নিয়ে আলোচনার অগ্রগতির কথা স্বীকার করেছেন। তারা জানিয়েছেন, ইরান চুক্তির শর্ত বাস্তবে কার্যকর করলেই শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপই হবে সুবিধা পাওয়ার ভিত্তি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে ঘিরে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। একই সময় কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয় হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ।

এপ্রিল মাসে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও পুরোপুরি উত্তেজনা কমেনি। গত কয়েক মাসে একাধিকবার হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। চলতি সপ্তাহেও দুই দফা সামরিক সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত একটি সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন। তার ভাষ্য, আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা একটি  সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছেন এবং খুব শিগগিরই চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। শুক্রবার ইরানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম কথিত ১৪ দফা চুক্তির কিছু তথ্য প্রকাশ করে। তবে ট্রাম্প এসব তথ্যকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, প্রকাশিত শর্তগুলোর সঙ্গে প্রকৃত আলোচনার কোনো সম্পর্ক নেই।

একই দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। তার মতে, দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউর বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। এখন শুধু চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ভেতরে চুক্তির শর্ত নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ সমর্থন করছেন, আবার কেউ আপত্তি তুলছেন। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, অনুমোদন পাওয়া গেলে দূর থেকেই চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। তার আশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।

বর্তমান আলোচনায় ইসরায়েল সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। আলোচনার প্রধান লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, উত্তেজনা কমানো এবং পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা শুরু করা। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে ইরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মত শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি আবার আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তাদের মতে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর এসব পদক্ষেপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তবায়ন শুরু হবে। এরপর শুরু হবে ৬০ দিনের একটি নতুন আলোচনা পর্ব। সেখানে মূল আলোচ্য বিষয় হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। কারণ এই উপাদান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এসব উপাদান ইরানের ভেতরেই ধ্বংস করা হবে এবং পরে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে কী পদ্ধতিতে তা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে বলেছে, চুক্তির শুরুতেই ইরানকে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। বরং ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ পর্যায়ক্রমে মুক্ত করা হতে পারে। এর মাধ্যমে তারা কিছু ইরানি গণমাধ্যমের খবর কার্যত নাকচ করে দেন। ওই সব খবরে বলা হয়েছিল, বড় ধরনের আলোচনা শুরুর আগেই ইরানের কিছু আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা হবে।

চুক্তির খসড়ায় ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর প্রতি আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার আহ্বানও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিষয়টি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা কোনো বিশ্বাস বা মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করছে না। বরং ইরান বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই সব ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ভর করবে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান এবং মধ্যস্থতায় সহায়তাকারী কাতারের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হলেও চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি রয়েছে। গত কয়েক মাসে একাধিকবার এমন সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে গেছে। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মতে, এবারের আলোচনার অগ্রগতি এবং আশাবাদ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। উভয় পক্ষ এখন চুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে অনেক বেশি খোলামেলা আলোচনা করছে।

আরাগচি বলেছেন, আলোচনা এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে খুব দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষর ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।

হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা আগের মতো থাকবে না। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। তাই এ পথের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রণালি বন্ধ করার পর থেকে ইরান সেখানে চলাচল করতে চাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি দাবি করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, সব জাহাজের জন্য এই পথ উন্মুক্ত ও বাধাহীন থাকা উচিত।

আরাগচি আরো জানান, সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত কমানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও আগে কিছু মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লেবাননের বিষয়টি হয়তো আলোচনার অংশ হবে না।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, উত্তর ইসরায়েলে হামলা অব্যাহত থাকলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হবে। ফলে চুক্তি চূড়ান্ত হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।