প্রবীণ গোয়েলও পুনেতে ব্যবসা করেন। তবে বিশাল আগরওয়ালের মত অত বড় ব্যবসায়ী নন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে গোয়েল ও আগরওয়াল পরিবারের মধ্যে জানাশোনা ছিল। সে জানাশোনাকে আত্মীয়তা বন্ধনে বাধার উদ্যোগ নেয় দুই পরিবার।
প্রবীণ গোয়েলের একমাত্র কন্যা সিয়া গোয়েলের সঙ্গে বিশাল আগরওয়ালের একমাত্র ছেলে কেতন আগরওয়ালের বাগদান হয় গত ফেব্রুয়ারিতে। বাগদানের পর থেকে দুই পরিবারে সুখের বন্যা। প্রস্তুতি চলছিল আগামী নভেম্বরে জমকালো বিয়ের। কিন্তু সিয়ার মনে ছিল অন্য কিছু। প্রেমিক চেতন চৌধুরীর সঙ্গে মিলে পরিকল্পনা করে গত ১৮ জুন লোহাগড় দূর্গ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করেন কেতন আগরওয়ালকে।
একটি মৃত্যু এলোমেলো করে দিয়েছে দুটি পরিবারকে। আগরওয়াল পরিবার তো সন্তান হারিয়ে শোকে কাতর, শোকে স্তব্ধ গোয়েল পরিবারও। কেতন যে তাদের কছেও সন্তানের মতই ছিল। কেতন হত্যায় সিয়া জড়িত, এটা শোনার পর বাবা প্রবীণ গোয়েলের হার্ট অ্যাটাক হয়। তিনি এখন হাসপাতালে। তাকে দেখাশোনা করতে স্ত্রী পুজা গোয়েল ও ছেলে সাহিল গোয়েলও দিনরাত হাসপাতালেই কাটাচ্ছেন।
সিয়া গোয়েলের মা পুজা গোয়েল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কেতনের মৃত্যু একটি নয়, দুটি পরিবারকে এলোমেলো করে দিয়েছে। কেতনের মৃত্যুতে তাদের (আগরওয়াল পরিবার) মতো আমরাও বেদনার্ত।’
কেতনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্বাসই হচ্ছে না প্রবীণ গোয়েলের। তিনি বলেন, ‘তারা (আগরওয়াল পরিবার) ছেলে হারিয়েছে। কিন্তু কেতন আমাদের কাছেও ছেলের মতোই ছিল। আমরা তাকে অনেক ভালোবাসতাম। অল্পদিনে তার সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, মনে হতো কেতন আমার আরেকটি ছেলে। এমন সম্ভাবনাময়, ভালোবাসার সন্তান হারিয়ে আমরাও শোকে কাতর।’
কেতনের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে প্রবীণ গোয়েল বলেন, ‘মেয়ের বিয়েকে সামনে রেখে বাড়ি সংস্কারের কাজ করছিলাম। কেতন এসে বলতো, পাপাজি প্লাম্বিং, মার্বেলের কাজ বা ফার্নিচারের কাজ; যেকোনো কাজে আমাকে বলবেন। আমি সব সামাল দেব। সে কখনো না বলতো না।’
কেতনকে যেমন গোয়েল পরিবার সন্তানের মতো আদর করতো, সিয়াকেও গভীর ভালোবাসায় বরণ করে নিয়েছিল আগরওয়াল পরিবার। বিয়েকে সামনে রেখে নানান অনুষ্ঠান চলছিল। সিয়ার জন্মদিন উদযাপনেও নানান পরিকল্পনা ছিল তাদের।
সিয়ার মা পুজা বলেন, ‘দুজনকে খুব সুখী মনে হচ্ছিল। এ জুটিকে ঘিড়ে আমাদের অনেক আশা ছিল, ভালোবাসা ছিল।’
সিয়ার পরিবার চেতনের সঙ্গে তার সম্পর্ক জেনেও গোপন করেছিল, আগরওয়াল পরিবারের এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে গোয়েল পরিবার। সিয়ার মা পুজা বলেছেন, ‘আমরা চেতনকে চিনতাম না। সে কখনো আমাদের বাসায় আসেনি। তাকে আমরা কখনো দেখিনি।’
সিয়া গোয়েলের ভাই সাহিল গোয়েলও চেতনের সঙ্গে বোনের সম্পর্কের কথা জানতেন না। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, সিয়া যদি তাদের কিছু জানাতো তাহলে প্রয়োজনে তারা বিয়ে ভেঙ্গে দিতো।
শুক্রবার পুলিশ সিয়ার ভাইকে ডেকে এনে ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সিয়া ও চেতন ৭ দিনের পুলিশ রিমান্ডে আছেন। পুলিশ সিয়ার ভাই ছাড়াও আরো ৭ জনকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তদন্তের প্রয়োজনে দুই পরিবারের সদস্য ও দুই অভিযুক্তের বন্ধুদেরও ডাকা হতে পারে।
একমাত্র ছেলের অভিযুক্ত হত্যাকারী সিয়া গোয়েলের প্রতি আগরওয়াল পরিবারের ক্ষোভ তো আছেই, সুখের আয়োজনে বেদনার কালি লেপে দেওয়ায় সিয়ার প্রতি গোয়েল পরিবারের ক্ষোভও কম নয়। প্রথমে দোষী হলে সিয়া গোয়েলের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চেয়েছিলেন তার বাবা-মা। এখন তাদের রাগ আরো বেশি।
প্রবীণ গোয়েল ও পুজা গোয়েল অভিন্ন কণ্ঠে বলেন, ‘কেতনকে যে বা যারা লোহাগড় দূর্গে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিল, তাদেরকেও যেন ঠিক সেখান থেকেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়, এমনকি সে যদি আমাদের মেয়েও হয়।’
সিয়াকে লোহাগড় দূর্গ থেকে ধাক্কা দিয়ে না ফেললেও পুলিশ মানুষের আকারের একটি বস্তু ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে। ঘটনাটি যেভাবে ঘটেছে, সেটি নতুন করে মঞ্চায়নের চেষ্টা করছে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে সবগুলো ঘটনা এক সুতায় গাঁথতে চাইছে। ঠিক যেখান থেকে কেতনকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল, পুলিশ ঠিক সেখান থেকেই কেতনের আকৃতির একটি বস্তু ধাক্কা দিয়ে ফেলে। পুলিশ আসলে বুঝতে চাইছে, কেতনকে ধাক্কাটা চেতন বা সিয়া একা দিয়েছিল নাকি দুজন মিলে দিয়েছিল।






