প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে মোংলা বন্দর, তিস্তা প্রকল্প, বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডর এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নয়াদিল্লির কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ চীনের দিকে ক্রমে ঝুঁকছে বলে মনে করছেন ভারতীয় বিশ্লেষকরা। আর এভাবে ঢাকা-বেইজিংয়ের সম্পর্কের আরো উন্নতি হলে ভারতের ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলেও অভিমত তাদের।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে তোলার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ও চীন। জমিটি আগে ভারতের জন্য বরাদ্দ থাকলেও ২০২৫ সালে সেটি বাতিল করে দেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
ভারতীয় এই সংবাদমাধ্যমটির মতে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে চীনের এই বিনিয়োগ বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের কৌশলগত উপস্থিতি আরো শক্তিশালী করতে পারে। পাকিস্তানের গোয়াদর থেকে আফ্রিকার জিবুতি পর্যন্ত চীনের বন্দর বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় মোংলাও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে বলে জানেয়েছেন তারা।
এ বিষয়টি নিয়ে আরো সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে দেশটির আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত? এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতছাড়া হওয়ার ঘটনা নয়; বরং ভারতের পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির পথ খুলে দেওয়া।
চীনের বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সামরিক উপস্থিতিতে রূপ নেবে—এমন প্রমাণ না থাকলেও অতীতে বিদেশি বন্দরে বিনিয়োগকে গোয়েন্দা ও নজরদারি কার্যক্রমে ব্যবহার করার নজির রয়েছে বলেও জানায় ইন্ডিয়া টুডে।
চীন সফরে তারেক রহমান তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চেয়েছেন। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রায় সব ভারতীয় গণমাধ্যমই তুলে ধরেছে। দেশটির অন্যতম প্রভাশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু বলছে, তিস্তা নদী নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বিরোধ দীর্ঘদিনের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকার ভারতের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজলেও বর্তমান সরকার অপেক্ষা না করে উন্নয়নকাজ এগিয়ে নিতে চায়। তিস্তা মহাপরিকল্পনায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি নদী খনন, জলাধার নির্মাণ, ভাঙনরোধ এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট লিখেছে, তিস্তা প্রকল্প ভারতের কাছে সংবেদনশীল, কারণ নদীটি পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং এর অবস্থান শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছাকাছি। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ এই করিডর। ফলে সেখানে চীনের যেকোনো ধরনের উপস্থিতি নয়াদিল্লির উদ্বেগের কারণ।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তিস্তা প্রকল্প কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতাকে বাইরের প্রভাবমুক্ত রাখা উচিত।
- ১৩ সমঝোতা স্মারক
চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীন ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নদী ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন। আর এ সমঝোতার বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে এনডিটিভি এবং ইন্ডিয়া টুডে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর উভয় দেশ চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর নিয়েও হয়েছে আলোচনা। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, এটি মূল বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মায়ানমার (বিসিআইএম) করিডরের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, যেটি আগে বাস্তবায়িত হয়নি।
- বেইজিং-ঢাকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪টি চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। আর এটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পর এই মডেলের দ্বিতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী হবে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের আওতায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত আলোচনার বিষয়ে নীতিগত সমঝোতার কথাও উঠে এসেছে দেশটির গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলেছেন, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থন দেয় এবং ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ প্রত্যাখ্যান করে। এই বক্তব্যকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে ভারতের গণমাধ্যমগুলো।
ভারতের আউটলুক ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির উদ্বেগের মূল কারণ অর্থনীতি নয়, বরং ভূগোল ও নিরাপত্তা। এতে বলা হয়েছে, মোংলা বন্দর, তিস্তা অববাহিকা এবং লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে ঘিরে সম্ভাব্য চীনা সম্পৃক্ততা ভারতের নিরাপত্তা কৌশলের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।






