• ই-পেপার

কোরআন থেকে শিক্ষা

  • পর্ব ১১৫৭

প্রশ্ন-উত্তর

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রশ্ন-উত্তর

লেবার চার্জ আলাদা নেওয়ার বিধান

প্রশ্ন : আমাদের এলাকায় কিছু টাইলসের দোকান আছে, যেখানে দোকানদাররা কাস্টমার থেকে প্রতি টাইলসের কার্টনে লেবার চার্জ হিসাবে পাঁচ টাকা গ্রহণ করে; কিন্তু তারা লেবারকে সব সময় ওই পরিমাণ টাকা দেয় না, কখনো লেবার খরচ পাঁচ টাকার কম হয়, আবার কখনো পাঁচ টাকার বেশি হয়। এখন জানার বিষয় হলো, বিক্রেতা ক্রেতা থেকে লেবার চার্জ গড় হিসাবে প্রতি কার্টনে পাঁচ টাকা নিতে পারবে কি না?

আসিফ চৌধুরী, মিরপুর

 

উত্তর : হ্যাঁ, প্রশ্নে বর্ণিত বিক্রেতা তার ক্রেতা থেকে লেবার চার্জ গড় হিসাবে প্রতি কার্টনে পাঁচ টাকা নিতে পারবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ১৮/৬, আলফিকহুল হানফি : ৩৬২/৪)

 

ইসলামী অর্থনীতির সুফল

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ইসলামী অর্থনীতির সুফল

মানুষ যখন প্রথম নদীতীরবর্তী জনপদে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছিল, তখন থেকেই তার জীবন জড়িয়ে যায় উৎপাদন, বিনিময় এবং জীবিকার সঙ্গে। মাঠে বীজ বপন, ফসল সংগ্রহ, পশুপালন, কারিগরি দক্ষতা কিংবা দূরপথের বাণিজ্য—এসবের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মানবসভ্যতার অর্থনৈতিক ভিত্তি। ইতিহাসের গতিধারায় সেই ভিত্তি ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে; কাফেলার পথ রূপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের মুদ্রা জায়গা করে দিয়েছে কাগুজে নোটকে, আর আজকের পৃথিবীতে অর্থের লেনদেন মুহূর্তের মধ্যে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু সভ্যতার এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় একটি বিষয় কখনো পরিবর্তিত হয়নি—সম্পদকে ঘিরে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব।

অর্থনীতির ইতিহাস মূলত সম্পদের ইতিহাস নয়; বরং সম্পদকে কেন্দ্র করে মানুষের সম্পর্ক, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও ন্যায়বোধের ইতিহাস। তাই অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—অর্থনীতির উদ্দেশ্য কী? শুধু সম্পদ সৃষ্টি, নাকি মানবকল্যাণও?

অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের মতে, মানুষের স্বাভাবিক স্বার্থসংশ্লিষ্টতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। আধুনিক বাজার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি নির্মিত হয়েছে এই ধারণার ওপর।

কিন্তু শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী ইউরোপে যখন উৎপাদন ও সম্পদের বিস্তার ঘটছিল, তখন একই সঙ্গে বাড়ছিল বৈষম্যও। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাঁদের যৌথ গ্রন্থ ‘The Communist Manifesto’ (1848)-এ লিখেছিলেন,  ‘The history of all hitherto existing society is the history of class struggles.’ মার্ক্সের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু সম্পদ উৎপাদনের বিষয় নয়; বরং তা ক্ষমতা, আধিপত্য এবং বৈষম্যেরও উৎস।

মানবসভ্যতার এই দীর্ঘ বৌদ্ধিক অভিযাত্রায় ইসলামী অর্থনীতি একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ধারণ করে। এটি সম্পদ সৃষ্টির গুরুত্ব অস্বীকার করে না, বৈষম্যের প্রশ্নকে উপেক্ষা করে না এবং মানবকল্যাণের আলোচনাকেও এড়িয়ে যায় না; বরং এসব আলোচনার সঙ্গে আরো একটি মৌলিক বিষয় যুক্ত করে নৈতিক জবাবদিহি।

ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি এমন এক বিশ্বদৃষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সম্পদকে শুধু অর্থনৈতিক উপাদান হিসেবে দেখা হয় না; বরং একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষ সম্পদের চূড়ান্ত মালিক নয়; বরং তার তত্ত্বাবধায়ক। মুসলিম ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদ ইবনে খালদুন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমাহ’য় লিখেছেন, ‘জেনে রাখো, উপার্জন মূলত মানুষের শ্রমের মূল্য।’

শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে উচ্চারিত এই বক্তব্যে শ্রম, উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীর উপলব্ধি ফুটে ওঠে। একই গ্রন্থে তিনি আরেকটি ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন, ‘জুলুম সভ্যতার ধ্বংসের পূর্বঘোষণা।’

ইবনে খালদুনের এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং সভ্যতার ইতিহাসের এক গভীর সত্যকে ধারণ করে। যখন অন্যায় বৃদ্ধি পায়, সম্পদের সুষম প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তখন শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।

ইসলামী অর্থনীতির আলোচনায় এই ন্যায়বোধ কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করে আছে। কোরআন মাজিদ সম্পদ অর্জনকে বৈধতা দিয়েছে, ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করেছে এবং মানুষের অর্থনৈতিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সম্পদের সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা হাশরে ঘোষণা করেন, ‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’

এই আয়াত ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। ইসলাম সম্পদের বিরোধিতা করে না; বরং সম্পদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা করে। ব্যক্তি উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু সেই উদ্যোগ যেন সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট না করে, সে বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করে। এ কারণেই ইসলামে জাকাত শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি সম্পদের পুনর্বণ্টনের একটি সামাজিক ব্যবস্থা। সদকা শুধু ব্যক্তিগত উদারতা নয়, এটি সামাজিক সংহতির মাধ্যম। উত্তরাধিকার আইন শুধু পারিবারিক বিধান নয়, এটি সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন রোধের একটি কার্যকর নীতি।

ইসলামী অর্থনীতি কোনো ব্যাংকিং পদ্ধতির নাম নয়, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প কাঠামোর নামও নয়। এটি সম্পদ, শ্রম, উৎপাদন, ভোগ, বণ্টন এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি। এর লক্ষ্য এমন একটি সমাজ নির্মাণ, যেখানে সমৃদ্ধি থাকবে কিন্তু শোষণ থাকবে না; প্রবৃদ্ধি থাকবে কিন্তু বৈষম্য নয়; সম্পদ থাকবে; কিন্তু মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে নয়।

 

মালয়েশিয়ায় ‘ইসলামিক ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত হলেন ড. আহমেদ আল-রায়সুনি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মালয়েশিয়ায় ‘ইসলামিক ইয়ার’ পুরস্কারে ভূষিত হলেন ড. আহমেদ আল-রায়সুনি

ইসলামী জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরক্কোর প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ ড. আহমেদ আল-রায়সুনিকে ১৪৪৮ হিজরি ইসলামিক ইয়ার পুরস্কারে সম্মানিত করেছে মালয়েশিয়া। ইসলামী নববর্ষ উপলক্ষে প্রদত্ত এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা ড. আল-রায়সুনির বর্ণাঢ্য পাণ্ডিত্যপূর্ণ জীবনের এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইসলামী আইনশাস্ত্র, মাকাসিদুশ শরিয়াহ (ইসলামী আইনের উদ্দেশ্য), ইসলামী চিন্তার নবায়ন এবং সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গবেষণা, লেখালেখি ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

খ্যাতিমান এই আলেম তাঁর অসংখ্য গ্রন্থ, গবেষণাপত্র, বক্তৃতা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমকালীন ইসলামী চিন্তাধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন, বিশেষ করে মাকাসিদভিত্তিক ইসলামী আইনচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

মালয়েশিয়ার ইসলামিক ইয়ার পুরস্কার দেশটির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। প্রতিবছর ইসলামী নববর্ষ উপলক্ষে এমন ব্যক্তিত্বদের এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, যাঁরা ইসলাম, মুসলিম সমাজ এবং মানবকল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন; একই সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর হিজরতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা, ত্যাগ, নেতৃত্ব ও সভ্যতার মূল্যবোধকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এই সম্মাননা উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মুসলিম স্কলার ইউনিয়ন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ড. আল-রায়সুনির এই স্বীকৃতি জ্ঞান, গবেষণা এবং মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আলেমদের অপরিহার্য ভূমিকারও স্বীকৃতি। সম্মাননা অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মুসলিম আলেম ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি আলি মহিউদ্দিন আল-কারাদাঘি ড. আল-রায়সুনির হাতে একটি বিশেষ অভিনন্দনপত্র তুলে দেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে ড. আল-রায়সুনির দীর্ঘ জ্ঞানগর্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ইসলামী আইন, মাকাসিদুশ শরিয়াহ ও মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর অবদানকে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করেন।

ড. আহমেদ আল-রায়সুনিকে প্রদত্ত এই সম্মাননা প্রমাণ করে যে ইসলামী বিশ্বের উন্নয়ন ও পুনর্জাগরণে জ্ঞান, গবেষণা এবং প্রজ্ঞার মূল্য আজও অপরিসীম। মালয়েশিয়ার এই উদ্যোগ শুধু একজন প্রখ্যাত আলেমকে সম্মানিত করেনি; বরং বিশ্বব্যাপী জ্ঞানচর্চা ও ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের গুরুত্বকেও নতুনভাবে তুলে ধরেছে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোয় আলোকিত এই সম্মাননা নিঃসন্দেহে মুসলিম বিশ্বের গবেষক, আলেম এবং চিন্তাবিদদের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা হয়ে থাকবে।

মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ

মুফতি দিদার হোসাইন
মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ

মহান আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। তবে শর্ত হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে শতভাগ সততা ও আমানতদারিতা বজায় রাখতে হবে। যেসব সূক্ষ্ম কারণে ব্যবসার হালাল মুনাফা হারাম হয়ে যেতে পারে, তন্মধ্যে একটি হলো মাপে কম দেওয়া। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা ওজনে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদেরকে মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়।’

(সুরা : আল-মুতাফি্ফফিন, আয়াত : ১-৩)

মাপে কম দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে কোরআনে বর্ণিত আরবি ‘ওয়াইল’ শব্দটি কঠিন শাস্তি, ধ্বংস অথবা জাহান্নামের একটি উপত্যকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ওজনে কম দেওয়া কোনো সাধারণ পাপ নয়; বরং এটি মারাত্মক একটি কবিরা গুনাহ। মুমিন বান্দাদের এই গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ন্যায়ের সঙ্গে মাপ ও ওজন পূর্ণ করো।’

(সুরা : আন‘আম, আয়াত : ১৫২)

তিনি আরো বলেন, ‘যখন পরিমাপ পাত্র দ্বারা কাউকে কিছু মেপে দাও, তখন পরিপূর্ণ মাপে দিয়ো আর ওজন করার জন্য সঠিক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করো। এ পন্থাই সঠিক এবং এরই পরিণাম উত্কৃষ্ট।’

(সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৫)

মানুষকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার সময় মাপে কম দেওয়াও এক ধরনের জুলুম, বলা যায় পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিকারী অন্যতম অপরাধ। এই অপরাধের ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহান আল্লাহর নবী শুআইব (আ.) তাঁর জাতিকে বারবার সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা পরিমাণ ও ওজন ন্যায়সংগতভাবে পূর্ণ করবে। মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দেবে না এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে বেড়াবে না।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৫)

কিন্তু তারা সে নির্দেশ অমান্য করায় ভয়াবহ আজাবে ধ্বংস হয়েছিল।

(সুরা : হুদ, আয়াত : ৯৪-৯৫)

এই আয়াতগুলো দ্বারা বোঝা যায়, ওজনে কম দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় মারাত্মক পর্যায়ের অপরাধ। যখন একটি সমাজে প্রতারণা, মাপে-ওজনে কারচুপি এবং মানুষের হক নষ্ট করার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে বরকত উঠিয়ে নেন। ফলে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘কোনো জাতি যখন মাপ ও ওজনে কম দিতে শুরু করে, তখন তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট এবং শাসকদের জুলুম চাপিয়ে দেওয়া হয়।’

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

অন্যদিকে সততা ও আমানতদারি ব্যবসার প্রাণ। যে ব্যবসায়ী লেনদেনে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত থাকে, সে শুধু মানুষের আস্থা অর্জন করে না; বরং আখিরাতে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গ লাভের সুসংবাদ পায়।

(তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)

আধুনিক যুগের তাতফিফ

প্রকৃতপক্ষে ‘তাতফিফ’ শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং যেকোনো ব্যাপারে যেকোনো উপায়ে প্রাপককে প্রাপ্য থেকে কম দেওয়াও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, গণনার মাধ্যমে কম দেওয়া, কর্মচারীর দায়িত্বে অবহেলা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি করা, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে প্রচার করা, পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অন্যের পণ্যকে নিজের পণ্য বলে প্রচার করা, অন্যের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে গাফিলতি করা, চুক্তি অনুযায়ী কাজ বা সেবা প্রদান না করা, অনলাইনে পণ্যের ছবি ও বাস্তব পণ্যের মধ্যে ইচ্ছাকৃত অমিল রাখা, সরকারি বা বেসরকারি দায়িত্বে থেকে জনগণের অধিকার খর্ব করা—এগুলোও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। (মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) কৃত, ৮/৬৯৪)

অনেকের মনে হতে পারে, আজকাল যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত আছে, তারাই তো ভালো আছে। তাদের সম্পদ দিন দিন বাড়ছে। এর উত্তর হলো বাহ্যিক চোখে যেটাকে সাফল্য মনে হচ্ছে, আদতে সেটা মোটেও সাফল্য নয়। দুনিয়ার এই যিকঞ্চিৎ লাভ (!) তো আখিরাতের বিপুল প্রাপ্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সঙ্গে এটা দুনিয়াতেও বরবাদির এক বড় কারণ হচ্ছে।

এই পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকবে না, থাকতে পারবেও না। মৃত্যুর পর দাঁড়াতে হবে আল্লাহর সামনে। ইচ্ছাকৃতভাবে ওজনে অণু পরিমাণ কম দিলেও তার হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের প্রতারণা, জুলুম, মানুষের হক নষ্ট করা এবং ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।