• ই-পেপার

বৈশ্বিক ইসলামী অর্থনীতি সূচকে টানা ১২ বছর শীর্ষে মালয়েশিয়া

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৫৯

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

আমি তাদেরকে যে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলাম তোমাদেরকে তা দিইনি, আমি তাদেরকে দিয়েছিলাম কান, চোখ ও হৃদয়। কিন্তু তাদের কান, চোখ ও হৃদয় তাদের কোনো কাজে আসেনি। কেননা তারা আল্লাহর আয়াতগুলোকে অস্বীকার করেছিল, যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত, তাই তাদেরকে পরিবেষ্টন করল।...আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইলাহরূপে গ্রহণ করেছিল তারা তাদেরকে সাহায্য করল না কেন? বস্তুত তাদের ইলাহগুলো তাদের কাছ থেকে অন্তর্হিত হয়ে পড়ল। তাদের মিথ্যা ও অলীক উদ্ভাবনের পরিণাম এমনই। (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ২৬-২৮)

আয়াতগুলোতে কুরাইশ গোত্রের অহংকারের নিন্দা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

 

১. ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠা সব সময় কল্যাণের নিশ্চয়তা দেয় না, বরং কখনো কখনো তা ধ্বংসের কারণ হয়। কেননা ক্ষমতা মানুষকে অহংকারী করে তোলে।

২. আয়াতে প্রতিষ্ঠা দ্বারা ধন-সম্পদ, জনবল, জ্ঞানগত ও কারিগরি দক্ষতা উদ্দেশ্য। এসব বিষয়ে পূর্ববর্তী জাতিগুলো কুরাইশের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী ছিল।

৩. আয়াতে চিন্তা ও গবেষণা না করা এবং চিন্তার উপকরণগুলো উপেক্ষা করার নিন্দা করা হয়েছে।

৪. মক্কার চারপাশের জনপদ দ্বারা আরব উপদ্বীপের ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদগুলো উদ্দেশ্য। যেমনআদ, সামুদ ও কওমে লুতের জনপদ।

৫. দুনিয়াতে যারা মানুষকে সত্যচ্যুত করে পরকালে তারা কোনো দায় গ্রহণ করবে না।

  (জাদুল মাসির : ৭/৩৮৫)

হাদিসের আলো

সবল মুমিন আল্লাহর অধিক প্রিয়

সবল মুমিন আল্লাহর অধিক প্রিয়

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সবল মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিন অপেক্ষা অধিক প্রিয়। আর প্রত্যেকের মধ্যে কল্যাণ আছে। তুমি সেই জিনিসের প্রতি যত্নবান হও, যাতে তোমার উপকার আছে এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিরুৎসাহ হয়ো না। যদি তোমার কিছু ক্ষতি হয়, তাহলে এই কথা বলো না যে যদি আমি এ রকম করতাম, তাহলে এ রকম হতো, বরং বোলো, আল্লাহর নির্ধারণ এবং তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননা যদি শব্দটি শয়তানের কাজের দুয়ার খুলে দেয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৭৯)

 

শিক্ষা

হাদিস গবেষকরা বলেন,

১. দুর্বলতা ও হীনতা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়, মুমিন সবল ও বলিষ্ঠ হবে।

২. মুমিনের উচিত সব কল্যাণকর বিষয়ের প্রতি যত্নশীল হওয়া।

৩. মুমিন যত কল্যাণই লাভ করুক না কেন, সে সর্বদা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে।

৪. মুমিন কখনো আল্লাহর সাহায্য লাভের ব্যাপারে হতাশ হবে না।

৫. ভাগ্যে বিশ্বাসীরা যদি-কিন্তু-এর পেছনে পড়ে না; কেননা তা বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়। (মাউসুয়াতুল হাদিসিয়্যা)

আল্লাহ তাআলার গুণাবলির প্রকারভেদ

আহমাদ ইজাজ
আল্লাহ তাআলার গুণাবলির প্রকারভেদ

মহান আল্লাহর সত্তাগত নাম ছাড়াও অনেক সিফাতি বা গুণবাচক নাম আছে। যেমন আল-খালিক বা স্রষ্টা ইত্যাদি।

বিশেষজ্ঞ আলেমদের কারো কারো মতে, আল্লাহর গুণাবলি তিন প্রকার। ১. সিফাতে জামালি (সৌন্দর্য প্রকাশক গুণ), ২. সিফাতে জালালি (প্রভুত্ব ও পরাক্রম প্রকাশক গুণ), ৩. সিফাতে কামালি (ক্ষমতা ও পূর্ণতা প্রকাশক গুণ)।

সিফাতে জামালি : আল্লাহর ওই সব গুণবাচক নাম, যার মধ্যে তাঁর রহমত, মায়া, মমতা ইত্যাদি প্রকাশ পায়। যেমনআর রাহমান (পরম করুণাময়), আর রাহিম (অতি দয়ালু) ইত্যাদি।

সিফাতে জালালি : আল্লাহর ওই সব গুণবাচক নাম, যার মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, প্রভুত্ব, মহিমা, প্রতাপ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, কঠোরতা এবং পরাক্রম ইত্যাদি প্রকাশ পায়। যেমনআল-মালিক (রাজাধিরাজ), আল-আজিজ (অপরাজেয়, সম্মানিত ও অজেয়), আল-কাহ্হার (মহাপ্রতাপশালী, চির-দমনকারী) ইত্যাদি।

সিফাতে কামালি : আল্লাহর ওই সব গুণবাচক নাম, যার মধ্যে তাঁর সৌন্দর্য, মহত্ত্ব ইত্যাদি প্রকাশ পায়।

সিফাতে কামালি আবার পাঁচ প্রকার :

১. সিফাতে ওয়াহদানিয়্যাত : সিফাতে ওয়াহদানিয়্যাত ওই গুণাবলিকে বলা হয়, যার মধ্যে আল্লাহর একত্ব ও অদ্বিতীয়ত্ব প্রকাশ পায়। যেমনআল-ওয়াহিদ, আল-আহাদ ইত্যাদি।

২. সিফাতে ওয়াজুদি : সিফাতে ওয়াজুদি ওই গুণাবলিকে বলা হয়, যার মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব, স্থায়িত্ব ও অবিনশ্বরত্ব পরস্ফুিট হয়ে ওঠে। যেমনআল-হায়্যু, আল-কাইয়্যুম ইত্যাদি।

৩. সিফাতে ইলম : সিফাতে ইলম ওই গুণাবলিকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা সর্ববিষয়ে জ্ঞাত হওয়া বুঝায়। যেমনআল-খাবির, আল-আলিম ইত্যাদি।

৪. সিফাতে কুদরত : সিফাতে কুদরত ওই গুণাবলিকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর কুদরত ও ক্ষমতা প্রকাশ পায়। যেমনআল-ফাত্তাহ, আল-কাদির ইত্যাদি।

৫. সিফাতে কিরিয়ায়ি ও কুদ্দুসিয়াত : সিফাতে কিরিয়ায়ি ও কুদ্দুসিয়াত আল্লাহর ওই গুণাবলিকে বলা হয়, যার দ্বারা আল্লাহর মহত্ত্ব ও পবিত্রতা বোঝা যায়। যেমনআল-আলিয়্যু, আল-কুদ্দুস ইত্যাদি।

 

আজরা লং

কাপড়ের দোকান থেকে ইসলামের পথে

মো. আব্দুল মজিদ মোল্লা
কাপড়ের দোকান থেকে ইসলামের পথে

শৈশবে আজরা লং মাঝে মাঝে সান ফ্রান্সিসকোর সাটার পাওয়েলে অবস্থিত একটি লিনেন কাপড়ের দোকানে যেতেন। দোকানটি মূলত এক লেবানিজ দম্পতি চালাত। বহু বছর পর আজরা লং একটি স্থানীয় সংবাদপত্রকে বলেছিলেন, এই দোকান থেকেই মূলত তাঁর ইসলামের দিকে পথচলা শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি সত্যি তাদের ধর্মের ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলাম। তাদের দোকানে চলাচল করতে করতেই আমি মুসলিম হয়ে গিয়েছিলাম। এটা প্রমাণ করে, কোনো কোনো ধর্মীয় জীবনের সূচনা হয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে, যখন কৌতূহলগুলো প্রশ্রয় পায়।

আজরা লংয়ের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ১৯৫৮ সালে সান ফ্রান্সিসকো নিউজে প্রকাশিত হয়। তখন উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা এত ক্ষুদ্র ছিল যে তারা চোখ এড়িয়ে যেত এবং তাদের প্রায় উপেক্ষা করা হতো; যদিও তখন ক্যালিফোর্নিয়ায় মুসলিমদের কিছু স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পরিবেশ ও পারিবারিক জীবনযাপনের মতো অবস্থা গড়ে উঠেছিল। আজরার বাবা যুগোস্লাভিয়া এবং মা ইতালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে আজরা মুসলিমদের সামনে ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি মুসলমান হতে চান। পত্রিকার ভাষ্যমতে, সান ফ্রান্সিসকোর প্রথম বাসিন্দা হিসেবে আজরা লং এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন। পত্রিকার এই দাবির সত্যতা যাচাই করা এখন আর সম্ভব নয়, কিন্তু এটা থেকে যে সত্য প্রকাশিত হয়, তা হলোআমেরিকায় মুসলমানের সংখ্যা শুধু অভিবাসীদের কারণে বৃদ্ধি পায়নি, বরং এখানে জন্ম নেওয়া অনেকের ইসলাম গ্রহণে তা বৃদ্ধি পেয়েছে।

একই সংবাদপত্র আরেকটি চিত্র তুলে ধরেছে। সমুদ্রতীরবর্তী মুসলিমরা হাজিদের বিদায় জানাতে সমবেত হয়েছে। পুরুষরা সামনের একটি কক্ষে নামাজ আদায় করছে এবং পেছনে একটি কাঠের কক্ষে প্রায় ৫০ জন নারী হাত তুলে দোয়া করছে। তাদের  মধ্যে লংও ছিলেন। তিনি রেশমি কাপড়ের নীল রঙের একটি স্কার্ফ পরে ছিলেন। তাঁর পাশেই আমেরিকায় জন্ম নেওয়া ছোট্ট লায়লা ডিক্যাপ্রিও বসা। সে নারীদের দেখছে এবং তাদের অনুকরণ করছে। এটি আলোড়িত করার মতো একটি দৃশ্য। সান ফ্রান্সিসকোর প্রথম ধর্মান্তরিত আমেরিকান মুসলিম আজরার পাশে আমেরিকান আরেক শিশু ইসলামী জীবনধারায় বেড়ে উঠছে।

লায়লার বাবা ডা. জোসেফ ডিক্যাপ্রিও ছয় বছর আগে জাপানে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর সাইবেরিয়ান বংশোদ্ভূত মা মেনিরাকে বিয়ে করেন। ইমামের অনুসরণ করে আজরা সিজদা করছেন এবং তাঁর দেখাদেখি লায়লাও সিজদা করছেন। সান ফ্রান্সিসকোর এই কক্ষে শুধু ইসলামের চর্চায় হচ্ছিল না, বরং ইসলাম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল।

আজরা লং ১৯৫৯ সালে সান ফ্রান্সিসকো নিউজকে বলেছিলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশে যেতে চান। সেখানে তিনি কিছুদিন অবস্থান করবেন এবং সন্তানদের স্থানীয় একটি ইসলামী বিদ্যালয়ে এক বছর পড়াবেন। পত্রিকার বলা হয়েছিল, তাঁর এই স্বপ্ন শিগগিরই পূরণ হবে। তিনি নিউইয়র্কে যাবেন এবং সেখান থেকে জাহাজে আরোহণ করে মিসরের কায়রো যাবেন। তাঁর এই প্রস্থান পরিকল্পনায় দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন ইসলামিক সেন্টার অব সান ফ্রান্সিসকোর তৎকালীন সভাপতি মুহাম্মদ আলী মিরদাদ। তিনি বলেছিলেন, এতে সান ফ্রান্সিসকোর ক্ষতি ও কায়রোর লাভ।

আজরার পরবর্তী জীবন কেমন ছিল তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে তিনি ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের চেয়ে বড় কিছু মনে করতেন। এ জন্য ১৫ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণকারী এক কিশোরী ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন সান ফ্রান্সিসকোর মুসলিম সমাজের অন্যতম সংগঠক। তিনি ইসলামিক সেন্টারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন এবং দুই বছর সেন্টারের সেক্রেটারি পদে দায়িত্বও পালন করেছিলেন। মিরদাদের গভীর দুঃখবোধের তাৎপর্য এখানেই নিহিত ছিল।

আজরার ঘটনার আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো তিনি কোনো জাঁকজমকপূর্ণ প্রচারণা, প্রলোভন বা কারো প্ররোচনায় ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি লেবানিজ এক দম্পতির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়েছেন এবং তাদের জীবনধারা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। এরপর কৌতূহলী হয়েছিলেন তাদের ধর্ম সম্পর্কে। পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম প্রচারে মুসলমানের জীবনধারা ও সান্নিধ্য যে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে এটা তার একটি বড় দৃষ্টান্ত।

সূত্র : মুসলিম মেটার্স ডটঅর্গ