দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন, খালের প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও জলবায়ু সহনশীল নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
‘কল্যাণপুর ক্যানাল প্রজেক্ট’ নামে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের জন্য ১৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় এক হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নেদারল্যান্ডস সরকার এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কল্যাণপুর অববাহিকার নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা, জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং খালকেন্দ্রিক টেকসই নগর পরিবেশ গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে খাল নেটওয়ার্ক ও জলাধারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পাম্পিং ব্যবস্থা উন্নয়ন, কঠিন বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, মল-কাদা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জনসুবিধা, সবুজ এলাকা ও জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থাকে সমন্বিত করে খালকে একটি সামাজিক সম্পদে পরিণত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় খাল থেকে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ, পানিপ্রবাহের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, পাম্প স্টেশনে আধুনিক বর্জ্য প্রতিরোধক স্থাপন, প্রয়োজনীয় কালভার্ট ও সেতুর নকশা উন্নয়ন, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাইলট কর্মসূচি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু এবং খালের আশপাশে পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মতো কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ বৃহত্তর কর্মসূচির জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতে একটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিটও গঠন করা হবে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্পের নাম, মেয়াদ, ব্যয় নির্ধারণ এবং কার্যক্রমের বর্ণনা নিয়ে বেশ কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ১৪৫ মিলিয়ন ডলারের ব্যয়ের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়। এসব গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় বাদ দিয়ে কিভাবে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এ ছাড়া পানি ধারণ এলাকা সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণ লাগবে কি না এবং প্রয়োজন হলে তার ব্যয় কত হবে, সেটিও স্পষ্ট করা হয়নি।
এদিকে রাজধানীর খাল পুনরুদ্ধার নিয়ে রাজউকের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ২০২২-২০৩৫-এর সমীক্ষা বলছে, ঢাকার বিদ্যমান খালগুলো পুনরুদ্ধার একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ। ড্যাপের প্রাক্কলন অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্যসহ একটি খাল পূর্ণাঙ্গভাবে পুনরুদ্ধারে এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। কল্যাণপুর খাল পুনরুদ্ধারেও প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খনন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে ঢাকার খালগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। সীমানা পুনর্নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ ও খালকেন্দ্রিক সমন্বিত নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাঁরা বলছেন, রাজধানীর প্রায় ৫৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ পুনরুদ্ধার করতে হলে কয়েক দশকব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে। এমন বাস্তবতায় কল্যাণপুর খাল প্রকল্পকে বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ঢাকার খাল পুনরুদ্ধার শুধু একটি অবকাঠামোগত বা পরিবেশগত উদ্যোগ নয়; এটি সুশাসন, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।