• ই-পেপার

সাক্ষাৎকার

কর্মসংস্থানের বড় অংশই সৃষ্টি হচ্ছে সিএমএসএমই খাতে

  • শহরের ছোট কারখানা, বাজারভিত্তিক ব্যবসা, গ্রামীণ উৎপাদনমুখী উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প—সব মিলিয়ে সিএমএসএমই খাত লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে। একই সঙ্গে এটি নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করছে বলে জানিয়েছেন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লা খান। সাক্ষাৎকারে তিনি এই খাতের বিস্তারিত তুলে ধরেন

টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরে ইসলামী ব্যাংকের এসএমই অর্থায়ন

টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরে ইসলামী ব্যাংকের এসএমই অর্থায়ন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত। দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতের বিকাশে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে এসএমই খাতে এ ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা দেশের মোট এসএমই বিনিয়োগের প্রায় ১০.৫ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকিং খাতের এসএমই বিনিয়োগের প্রায় ৪৩ শতাংশ। এ পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ উদ্যোক্তা ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নের সুবিধা পেয়েছেন এবং প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই বিনিয়োগ ভূমিকা রেখেছে।

উৎপাদনমুখী শিল্পায়নকে উৎসাহিত করাই ইসলামী ব্যাংকের এসএমই অর্থায়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্যাংকের মোট এসএমই বিনিয়োগের ৫১ শতাংশেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা ও প্রি-ফিন্যান্স  কর্মসূচি বাস্তবায়নেও ব্যাংকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই অর্থায়ন শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণেই নয়; বরং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সম্পদের সুষম বণ্টন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন। এ কারণে ব্যাংকটি কৃষি, কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তা এবং পল্লী উন্নয়ন খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৩৫ হাজারেরও বেশি গ্রামে প্রায় ছয় হাজার ৮০০ কোটি টাকা কুটির শিল্প, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের প্রায় ৯২ শতাংশই নারী। পাশাপাশি প্রায় ১৭ লাখ প্রান্তিক পরিবারকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে ব্যাংকটি গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

এসএমই খাত দেশের রপ্তানি আয়ের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের তাঁতশিল্প, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এখন বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন, মান সনদ অর্জন, রপ্তানি প্রশিক্ষণ এবং বাজার সংযোগ আরো জোরদার করা প্রয়োজন। রপ্তানিমুখী এসএমই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ অর্থায়ন সুবিধাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিজ্ঞপ্তি

রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিশেষ অবদান রাখছে এমএসএমই

শরীফ মোহাম্মদ মহসীন এসএমই প্রধান এনসিসি ব্যাংক পিএলসি

রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিশেষ অবদান রাখছে এমএসএমই

প্রতিবছর আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস বিশেষ মর্যাদায় পালিত হয়ে থাকে। এবারও পালিত হচ্ছে বিশেষ লক্ষ্য নিয়েক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগসমূহের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়াই এবারের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এমএসএমই খাত বর্তমানে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের জিডিপি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে এই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২৫ শতাংশের বেশি এবং মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশের বেশি এই খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এমএসএমই খাতের গুরুত্ব দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে এই খাত এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, বাজার সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা, ব্যাবসায়িক সক্ষমতার ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ সেবার অভাব উদ্যোক্তাদের অগ্রযাত্রাকে অনেক সময় বাধাগ্রস্ত করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে এমএসএমই খাতের জন্য বিভিন্ন রিফাইন্যান্স, প্রিফাইন্যান্স ও ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম চালু করেছে, যা উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন প্রাপ্তি সহজতর করেছে এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই খাতে আরো বেশি মনোযোগী হতে উৎসাহিত করছে। এসব উদ্যোগ দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে এনসিসি ব্যাংক পিএলসি এমএসএমই অর্থায়নকে ব্যাবসায়িক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে। বর্তমানে এনসিসি ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ২৪ শতাংশই এমএসএমই খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং অদূরভবিষ্যতে এই হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। এটি জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির প্রতি ব্যাংকের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

এনসিসি ব্যাংকের এমএসএমই কার্যক্রমের সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দৃঢ় অঙ্গীকার। তাদের বিশ্বাস, উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ব্যাংক একটি নিবেদিতপ্রাণ এসএমই টিম গড়ে তুলেছে, যা দেশব্যাপী শাখা, উপশাখা ও বিকল্প বিতরণ চ্যানেলের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের বহুমাত্রিক চাহিদা পূরণে ব্যাংক আটটি স্পেশাল এসএমই লোন প্রোডাক্ট চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কার্যকর মূলধণ ঋণ, মেয়াদি ঋণ, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, নারী উদ্যোক্তা ঋণ, স্টার্টআপ ফাইন্যান্স, ট্রেড ফাইন্যান্সসহ খাতভিত্তিক অর্থায়ন সুবিধা। পাশাপাশি আছে উদ্যোক্তাদের সঞ্চয় সংস্কৃতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুটি বিশেষ এসএমই ডিপোজিট প্রোডাক্ট। তা ছাড়া রেগুলার ঋণ ও আমানত সেবামূলক প্রোডাক্টগুলো তো রয়েছেই গ্রাহকের সব ধরনের চাহিদা পূরণের জন্য।

প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার, সহজ ডকুমেন্টেশন এবং দ্রুত ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এনসিসি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের জন্য সময়োপযোগী আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করে আসছে। ফলে সারা দেশের হাজারো উদ্যোক্তার সঙ্গে ব্যাংকের একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

অর্থায়নের পাশাপাশি এনসিসি ব্যাংক উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিভিন্ন অ-আর্থিক সেবাও প্রদান করছে। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আর্থিক সাক্ষরতা এবং ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা তাঁদের ব্যবসা আরো সুসংগঠিত ও টেকসইভাবে পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ডিভিশন ও শাখাগুলোর মাধ্যমে এরই মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংকিং বিষয়ে সচেতনামূলক প্রচারণার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যার ফলে নারীরা ব্যাংকিংয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

এনসিসি ব্যাংক সর্বদাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি এডিবি অর্থায়নের আওতায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্তাবধানে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির (ইডিপি) সিসিপ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে (কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ইত্যাদি) মাসব্যাপী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সফলভাবে আয়োজন করেছে এনসিসি ব্যাংক। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিলেন নারী উদ্যোক্তা। প্রশিক্ষণ শেষে আয়োজিত পণ্য মেলায় অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ পান, যা তাঁদের বাজার সংযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ইডিপি সংযুক্ত অর্থায়ন কার্যক্রমে এনসিসি ব্যাংক দেশের অন্যতম শীর্ষ পারফরমার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং সর্বাধিক ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্থান অর্জন করছে। এই সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশংসাও অর্জন করেছে এনসিসি ব্যাংক।

 

সাক্ষাৎকার

এমএসএমই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রাইম ব্যাংক

প্রাইম ব্যাংক পিএলসি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ, দ্রুত ও গ্রাহকবান্ধব ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে জামানতবিহীন ঋণ পণ্য চালুর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান। কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই খাতের বিস্তারিত তুলে ধরেন

এমএসএমই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রাইম ব্যাংক

প্রশ্ন : দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে এমএসএমই খাতের ভূমিকা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?

উত্তর : স্বল্প মূলধন ও সহজ প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় এমএসএমই খাত দ্রুত ব্যবসা শুরু করার সুযোগ তৈরি করে, যা নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এ খাতের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য। ফলে বেকারত্ব হ্রাসে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং নারী উদ্যোক্তা বিকাশে এমএসএমই একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

এমএসএমই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রাইম ব্যাংকপ্রশ্ন : আপনার প্রতিষ্ঠান এসএমই খাতের উন্নয়নে কি ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?

উত্তর : প্রাইম ব্যাংক পিএলসি দেশের এসএমই খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকটি কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ, দ্রুত ও গ্রাহকবান্ধব ঋণসুবিধা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে জামানতবিহীন ঋণ পণ্য চালুর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রাইম ব্যাংক বিশেষায়িত নারী উদ্যোক্তা ঋণ কর্মসূচি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা প্রদান করছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি ডিজিটাল ব্যাংকিং ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর মাধ্যমে ঋণ প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রশ্ন : অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকের আরো কী ধরনের ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন?

উত্তর : বর্তমান অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসায়কে এগিয়ে নেওয়া কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোর উচিত ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে আরো সহজ, দ্রুত এবং সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা, যাতে উদ্যোক্তারা সময়মতো অর্থায়ন পেতে পারেন এবং ব্যবসার গতি বজায় রাখতে পারেন। জামানতনির্ভরতা কমিয়ে ব্যবসার প্রকৃত সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।

প্রশ্ন : নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো কর্মসূচি রয়েছে কি?

উত্তর : প্রাইম ব্যাংক একটি সুপরিকল্পিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিএমএসএমই অর্থায়ন কৌশল গ্রহণ করেছে, যা বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের চাহিদা পূরণ করছে। প্রাইম ব্যাংক বিশ্বাস করে এই দুটি খাত বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাইম ব্যাংক জামানতবিহীন ও অগ্রাধিকারভিত্তিক বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদান করছে, যা ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে বিদ্যমান বাধা কমাতে সহায়তা করে।

প্রশ্ন : আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরো কিভাবে কাজে লাগানো যায়?

উত্তর : ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঋণ আবেদন, মূল্যায়ন এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা গেলে উদ্যোক্তাদের সময় ও খরচ উভয়ই কমে যাবে এবং অর্থায়ন প্রাপ্তি আরো দ্রুত সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবার বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যেকোনো স্থান থেকে সহজেই আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারবেন, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরো শক্তিশালী করবে। ডেটা অ্যানালিটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ক্রেডিট  স্কোরিং ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে জামানত ছাড়াই সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন করা সহজ হবে এবং ঋণ ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনরর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

উত্তর : বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঘোষিত সিএমএসএমই খাতের পুনরর্থায়ন ও প্রণোদনা তহবিল প্যাকেজ বাস্তবায়নে প্রাইম ব্যাংক সক্রিয় ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এরই মধ্যে প্রাইম ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্যাকেজে অংশগ্রহণ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্টে আবেদন করেছে। এই উদ্যোগের আওতায় ব্যাংকটি সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুত ও সহজ ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করতে প্রক্রিয়াগত সরলীকরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে পুনরর্থায়নের সুবিধা সময়মতো উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়।

১০ বছরে এসএমই বিপ্লব

মো. জয়নাল আবেদীন
১০ বছরে এসএমই বিপ্লব

অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত। গত এক দশকে এ খাতে যেভাবে বেড়েছে বিনিয়োগ, এইকভাবে বেড়েছে কর্মসংস্থানও। সেই সঙ্গে দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এসএমই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে এ খাতে ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪৮ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সাল শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরে এসএমই ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১১১.২১ শতাংশ। এই সময়ে খাতটির আর্থিক প্রবাহে এক ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন এনে দিয়েছে ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরে, নীরব অথচ প্রবল স্রোতের মতো বহমান এক শক্তির নাম এসএমই খাত। বড় শিল্পের ঝলমলে আলোয় আড়ালে থাকলেও, দেশের প্রতিটি গলি, প্রতিটি হাট-বাজার, প্রতিটি ক্ষুদ্র কারখানায় এ খাতই বুনে চলেছে উৎপাদন, কর্মসংস্থান আর স্বপ্নের জাল। গত এক দশকে সেই নীরব স্রোত যেন রূপ নিয়েছে এক বিস্তৃত নদীতে, যার ঢেউয়ে ভর করে এগিয়ে চলেছে দেশের অর্থনীতি।

এই ঋণের প্রবাহ কেবল ব্যাংকের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রতিটি টাকাই ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার হাতে। কেউ নতুন দোকান খুলেছে, কেউ ছোট কারখানা দাঁড় করিয়েছে, কেউ বা গ্রাম থেকে শহরে পণ্য পাঠিয়ে নিজের ভাগ্য বদলেছে। ফলে আজ দেশে এক কোটিরও বেশি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান সক্রিয়, যারা মিলে গড়ে তুলেছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূলভিত্তি।

এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের কর্মসংস্থান তৈরির ইঞ্জিন বলা হয় এসএমই খাতকে। তাই আমাদের ব্যাংক সব সময়ে এসএমই খাতকে ফোকাস করে ঋণ দেয়। তা ছাড়া ক্ষুদ্র গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের তাড়া বেশি। এসব ঋণ সহজে খেলাপি হয় না। কিন্তু বড় ঋণ যেকোনো দুর্যোগ বা অস্থিরতায় খেলাপি হয়ে পড়ে।

তারেক রেফাত উল্লাহ অন্য ব্যাংকগুলোকে এসএমই খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর আহবান জানান। কারণ ঋণ পোর্টফোলিও যত বিস্তৃত হয় বিনিয়োগ তত নিরাপদে থাকে। দেশের উন্নয়নে ব্র্যাক ব্যাংকের মতো সব ব্যাংকেরই এসএমই ও কৃষি ঋণে গুরুত্ব বাড়ানো উচিত।

অর্থনীতির বৃহৎ চিত্রে এ খাতের অবদানও কম নয়। বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে। একই সঙ্গে এই খাতই সৃষ্টি করেছে ২.৫ থেকে তিন কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান, যা বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বিশাল অংশকে ধারণ করে। শিল্প খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান এসএমইনির্ভর হওয়ায়, বড় শিল্প নয়; বরং ছোট ও মাঝারি উদ্যোগই দেশের কর্মসংস্থানের প্রকৃত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গত দশকের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে নীতিগত সহায়তা, ব্যাংক ঋণের সমপ্রসারণ এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন এবং সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত-বাজারের সঙ্গে, গ্রাহকের সঙ্গে, এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও। নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও বেড়েছে, যা এই খাতকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। তবে এই প্রবাহের নিচে কিছু দুঃসংবাদও রয়েছে। ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু সেই ঋণ সব সময় উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে নাএমন অভিযোগ রয়েছে। উচ্চ সুদের হার, তারল্য সংকট এবং ব্যাংকঋণে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা এখনো অনেক উদ্যোক্তার পথ রুদ্ধ করে রাখে। সামপ্রতিক সময়ে ঋণ প্রবাহের গতি কমে যাওয়াও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে গত এক দশকে এসএমই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে, যেখানে বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও হয়ে উঠেছে প্রবৃদ্ধির সমান অংশীদার। কিন্তু এই বিপ্লবকে টেকসই ও শক্তিশালী করতে হলে এখন প্রয়োজন আরো গভীর সংস্কার, সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নীতিগত সমন্বয়। না হলে প্রবৃদ্ধির এই নদী একসময় গতি হারাতে পারে, আর তখন থমকে যেতে পারে সেই স্বপ্নের স্রোত, যা আজ লাখো মানুষের জীবিকা বয়ে নিয়ে চলছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করে জানান, সরকার শিল্প, সেবা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্য-প্রযুক্তি এবং আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ জন্য এসএমই, কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক পুনরর্থায়ন কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে এক কোটি ১৭ লাখ কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) প্রতিষ্ঠান রয়েছে।