জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, এক আসামিকে যাবজ্জীবন ও আরেক আসামিকে ২০ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দণ্ডিত পাঁচজনই পুলিশের সাবেক সদস্য।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গতকাল রবিবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি শফিউল আলম ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মীয়মাণ ভবনের তিন তলার কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি এবং দুজনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল আসামিদের বিরুদ্ধে।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তিনজন হলেন—ডিএমপি সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান। তিন আসামিই পলাতক। এ নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি মামলায় হাবিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। গত ২৬ জানুয়ারি ‘চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডে’র মামলায় হাবিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন এই ট্রাইব্যুনাল।
গতকালের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া
হয়েছে—রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে। তিনিও পলাতক। আর একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে দেওয়া হয়েছে ২০ বছরের কারাদণ্ড। গতকাল রায় ঘোষণার সময় তাঁকে ট্রাইব্যুনালে তোলা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় এ নিয়ে পাঁচটি মামলার রায় হলো পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে।
গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রায় পড়া শুরু হয়। এর আগে রায় ঘোষণার কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের জন্য অনুমতি চান প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। ট্রাইব্যুনাল অনুমতি দিলে তা সরাসরি সম্প্রচার করে বিটিভি।
রায় নিয়ে প্রসিকিউশন সন্তোষ প্রকাশ করলেও সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। গতকাল রায় ঘোষণার পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি একটি যথার্থ রায় হয়েছে। আমরা এ রায়ে আপাতত সন্তোষ প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। এ রায়ের মধ্য দিয়ে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘একটি বেতার বার্তার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকানোর জন্য ছাত্র-জনতার পায়ে গুলি করতে অধীনদের নির্দেশ দিয়েছিলেন ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান। তাঁর মৌখিক নির্দেশ এমন থাকলেও বাস্তবে বুকে ও মাথায় গুলি করা হয়।’
আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন মনে করেন, ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁর মক্কেল ন্যায়বিচার পাননি। এ জন্য রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। চঞ্চল চন্দ্র সরকারের কাছ থেকে বিচারবহির্ভূতভাবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়ের অভিযোগ আছে জানিয়ে আইনজীবী নিপ্পন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বারবার ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেছি বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হোক। কিন্তু তা করা হয়নি। অতএব, আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এ কারণেই আপিল বিভাগে যাব।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার ক্লায়েন্টের কাছে (ঘটনার দিন) কোনো অস্ত্র ছিল না। ১৯ জুলাই তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন সেন্টারে দায়িত্বে ছিলেন। সিডিআরে সেটি উল্লেখ রয়েছে। হঠাৎ একটি ভিডিওর ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, যা সমীচীন হয়নি বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ কারণেই আপিলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এ মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আরশাদুল হক বাবু ও মো. আমির হোসেন।
যে তিন ঘটনায় মামলা : ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন আমির হোসেন। রাজধানীর রামপুরা এলাকায় তখন পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছিল। এর থেকে বাঁচতে তিনি নির্মীয়মাণ ওই ভবনের চারতলায় গিয়ে আশ্রয় নেন। এক পর্যায়ে আন্দোলকারীদের ধাওয়া করে পুলিশও ভবনটিতে উঠে যায়। ভয়ে কার্নিশের রড ধরে নিচে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করছিলেন আমির হোসেন। তখন তিনতলা থেকে এক পুলিশ সদস্য ঝুলতে থাকা আমির হোসেনকে ছয়টি গুলি করেন। সব কটি গুলি তাঁর পায়ে লাগে। পরে সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যায় লোকজন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর সেখান থেকে তাঁকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আমির হোসেন।
আরেক ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়েছে, রামপুরার মেরাদিয়া হাট এলাকায় বাসার নিচের দোকান থেকে সাত বছরের নাতি বাসিত খান মুসাকে আইসক্রিম কিনে দিতে যান দাদি মায়া ইসলাম (৬০)। এ সময় মায়া ইসলামের পেটে গুলি এবং মুসার মাথায় গুলি লাগে। মায়া ইসলাম পরদিন মারা যান। মুসাকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা দেওয়া হয়। সংকটাপন্ন অবস্থায় মুসাকে সিএমএইচ থেকে ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে পাঠায় সরকার। পাঁচ মাস ১২ দিন পর গত বছর ৪ এপ্রিল দেশে আনা হয় শিশুটিকে। বেঁচে গেলেও শিশুটি কথা বলছে না বলে সাংবাদিকদের জানান প্রসিকিউটর তামীম।
আরেক অভিযোগে বলা হয়েছে, গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসায়ী নাদিম মিজান স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বনশ্রী এলাকায় থাকতেন। ওই দিন (২০২৪ সালের ১৯ জুলাই) জুমার নামাজ পড়তে বাসা থেকে বেরিয়েই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনি। রাতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।
গত বছর ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। শুনানির পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
পরে ১৮ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ১৬ অক্টোবর প্রসিকিউশন সূচনা বক্তব্য দেওয়ার পর মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় ২৩ অক্টোবর থেকে। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয় চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি। পরে শুরু হয় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এর পর থেকে মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় ছিল। গত ৪ মার্চ প্রথমে রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করলেও প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন রায় ঘোষণা করা হয়নি। সেদিন প্রসিকিউশন নতুন করে ডিজিটাল প্রমাণ দাখিল করার জন্য চার সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করে ট্রাইব্যুনালের কাছে। অন্যদিকে আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পনও ছয় সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করেন। শুনানির পর ট্রাইব্যুনাল উভয় পক্ষকে পাঁচ সপ্তাহ সময় দিয়ে গত ৯ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য করেন। পরে গত ৯ এপ্রিল শুনানির দিনে চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এএসআই চঞ্চলের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি নয়, বরং তা সম্পূর্ণ অথেনটিক বা সত্য। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী সারোয়ার জাহান ট্রাইব্যুনালের কাছে চঞ্চল সরকারের পুনরায় জবানবন্দি বা পুনরায় সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদন করেন, যা ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করেন। গত ১০ জুন আসামি চঞ্চল সরকার ট্রাইব্যুনালে তাঁর দ্বিতীয় দফার সাফাই সাক্ষ্য দেন। সেই সাক্ষ্যে তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা তাঁকে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছিলেন।
সাক্ষ্যে চঞ্চল বলেছিলেন, গ্রেপ্তারের পর থানা হেফাজতে থাকাকালে প্রসিকিউটর জোহা তাঁকে ভয়ভীতি দেখান এবং মেরে ফেলার হুমকির পাশাপাশি তাঁর নিকটাত্মীয়-স্বজনকেও হত্যার হুমকি দেন। মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় তিনি ওই ভিডিওতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। তবে সাংবাদিকদের কাছে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা।
নতুন সাক্ষ্য-প্রমাণের সংযুক্তির পর মামলাটিতে পুনরায় আইনি যুক্তিতর্ক হয়। গত ১৫ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ নতুন সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। সেদিনই ট্রাইব্যুনাল ২৮ জুন এ মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করেন।




