ইরানকে একটু বেশিই অবমূল্যায়ন করে ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েলের দিকটি বিবেচনায় নিলে বলতে হয়, তারা ইরানের সক্ষমতার বিষয়টি হয়তো আগেই বুঝেছিল, আর এটিও ভালো করে অনুধাবন করতে পেরেছিল যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে এবং কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বৃদ্ধি করতে হলে সেটি তাদের একক সামরিক শক্তি বা সক্ষমতা দিয়ে সম্ভব নয়। তাই কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে আনা হয়েছে এবং তার মধ্য দিয়ে একটি সফল যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই জায়গাটিতে ইসরায়েলের কূটকৌশলও ঠিকমতো কাজ করল না! এ ক্ষেত্রে অবশ্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিতর্কিত কর্মকাণ্ডগুলো এড়ানো এবং দুর্নীতির অভিযোগে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া থেকে বিরত থাকার একটি কৌশলও সমানভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। এই যুদ্ধের ফলাফল তাঁদের সপক্ষে না এলেও তিনি চেয়েছিলেন যুদ্ধটিকে প্রলম্বিত করে আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনটিকে জরুরি অবস্থার আলোকে পিছিয়ে দিতে। তাঁর নানা ধরনের কলাকৌশলের ফাঁদে নিশ্চিতভাবে পা দিয়েছিলেন রাজনৈতিকভাবে আনকোরা ডোনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেসের অনুমোদনহীন ৪০ দিনের যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করার ফলে তিনি দেশের অভ্যন্তরেও নানামুখী সংকট তৈরি করেছেন। ফলে এখন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা তিনি। আগামী নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান শিবিরে তাই দেখা দিয়েছে চিন্তার ভাঁজ।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে মূলত এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সর্বশেষ উপলব্ধিটিই প্রকাশ পেয়েছে। এই উপলব্ধি হচ্ছে এমন এক বিষয়, যার মধ্য দিয়ে কার্যত এটিই খোলাসা হয়ে গেল যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্ররোচনায় এই যুদ্ধে জড়িয়ে তাদের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ভুল কাজটি করেছে। এটি এমনই এক ভুল, যার জন্য দেশটিকে খেসারত দিয়ে যেতে হবে অনেক দিন। এটি তাদের জন্য এমন এক আত্মঘাতী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার খেসারত দিতে হতে পারে সামনের দিনগুলোতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবং নির্বাচনোত্তর সময়ে রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য ভরাডুবির মধ্য দিয়ে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিসংশনের মতো বিষয়ও সামনে চলে আসতে পারে। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও এরই মধ্যে আবারও একে অপরকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখনো হুংকার দিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেব।’ ট্রাম্পের এই দম্ভোক্তি এটিই জানান দেয় যে তাঁর হাতে সেই ক্ষমতা থাকলে ইরানের ক্ষেত্রে তিনি এর প্রয়োগ ঘটাতে একমুহূর্ত বিলম্ব করতেন না। এই মুহূর্তে তাঁর অবস্থা এমন হয়েছে, যাঁকে তুলনা করা যায় দন্তবিহীন ব্যাঘ্রের সঙ্গে!
ইরান ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক রাজনৈতিক মানচিত্রে ক্ষমতার কেন্দ্রিকতার সমীকরণ যে অনেকটাই পাল্টে গেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি এটি অনুধাবন করতে পারছে? বিষয়টি আসলে একটু অন্য রকমভাবে বললে ভালো হয়, আসলে এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমানশক্তিতে ঠিকমতো কাজ করছে বলে মনে হয় না। যদি এমনটিই হতো, তাহলে তিনি এই সময়ে ইরান নিয়ে দম্ভোক্তি কম করতেন। কারণ তিনি দম্ভোক্তি যতটা কম করবেন, ততটাই তাঁর এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক হবে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কথিত হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরিচালিত হামলার ততক্ষণাৎ জবাব দিয়ে ইরান এটিই জানান দিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষুকে ভয় করে না, প্রয়োজনে তারা আরো অনেক দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। আর এখানেই মূল চিন্তার বিষয়টি কাজ করার কথা। হয়তো সেটি মার্কিন উপলব্ধিতে সঠিকভাবে কাজ করছে না। ইরানের সঙ্গে অদৃশ্য সহায়ক শক্তি রয়েছে, বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কারা সেই শক্তি, এই বিষয়ে চীন ও রাশিয়ার নাম একবাক্যে বলে দেওয়া গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বিস্তৃত একটি ইহুদি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা থেকেই ইরানকে নির্মূল করার প্রচেষ্টা যদি সফল হয়, তাহলে ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের অপরাপর দেশও ইসরায়েলের ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পাবে না। এমন বোধোদয় যদি আরো কোনো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ঘটে থাকে, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
তবে পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই এবং অনেকটাই পরিবর্তন ঘটেছে। ইরান কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সবাইকে এই বার্তাই যেন দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরিহার্যতার আর কোনো অবকাশ নেই। এত দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার নামে এই অঞ্চলের ১২টি দেশে ঘাঁটি স্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ইসরায়েলকেই শক্তিশালী করতে চেয়েছে। এগুলোকে লক্ষ্য করে ইরানের পক্ষ থেকে মুহুর্মুহু হামলায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজেদের ঘাঁটি এবং লোকবলকেই রক্ষা করতে সচেতন থেকেছে। এ বিষয়ে বোধোদয় ঘটতে শুরু করেছে সৌদি আরবসহ অপরাপর দেশের। একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির অন্যতম শর্ত হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
একদিকে ট্রাম্পের হাঁকডাক, সমঝোতা স্মারকের শর্ত ভেঙে ইরানে আবারও হামলার হুমকি, আবার অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় কয়েক দিনের আলোচনায় ইরানের ওপর থেকে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দিতে দুই পক্ষের ঐকমত্য এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে মার্কিন সম্মতি এই যুদ্ধে ইরানকে বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থায় আসীন করেছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধেও এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা ফলপ্রসূ হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে নেতানিয়াহুর হম্বিতম্বিও কমেছে। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ছয় বিলিয়ন ডলার অবমুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা থেকে এটিই দিবালোকের মতো দৃশ্যমান হয়েছে যে যুদ্ধের ফলে ইরানের অপূরণীয় ক্ষতি হলেও এই যুদ্ধের আপাত অবসানের মধ্য দিয়ে তারা যুদ্ধাবস্থার আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের টোল আরোপের বিষয়টি নিয়েও ইরানের অবস্থান শক্ত রয়েছে।
এই যুদ্ধে কোন পক্ষ জয়ী বা কোন পক্ষ পরাজিত হয়েছে—এসব প্রশ্নকে অতিক্রম করে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে তা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একমেরুকেন্দ্রিক বৈশ্বিক রাজনীতি কার্যত বদলে যাচ্ছে এবং নতুন এক রাজনৈতিক মানচিত্রের জন্ম হতে যাচ্ছে। এই শতাব্দীর শুরু থেকেই চীন ও রাশিয়ার ক্রম-উত্থান এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থা সৃষ্টিতে তাদের জোটগত অবস্থান, অন্যদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটব্যবস্থার অবনতিশীল অবস্থা বৈশ্বিক মেরুকরণে এক ধরনের বহুপাক্ষিকতা সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এই বহুপাক্ষিকতার অংশীদার হিসেবে একদিকে যেমন রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র রয়েছে, একই সঙ্গে ভারতকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের মতো সংস্থাগুলো বৈশ্বিক রাজনৈতিক ভরকে এশিয়ামুখী করে তুলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে অগ্রগতি হয়েছে এবং আলোচনা চলমান। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি সারা বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কিছুটা শিথিলতা তৈরি করেছে অথবা সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে রাষ্ট্রগুলোকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সামরিক জোট ন্যাটো এবং জি-৭-এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ধারাটি ক্ষুণ্ন হচ্ছে মারাত্মকভাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তিত হলেও পররাষ্ট্রনীতির মূল জায়গায় পরিবর্তন ঘটে না বলে যে ধারণাটি এত দিন ধরে প্রচলিত ছিল, ট্রাম্পের এই মেয়াদে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়া এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে ইউরোপের সহযোগী না হওয়া অন্য রকম বার্তা দিচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নবায়নের চেষ্টা এখন পুরোদমে এগিয়ে চলছে। অর্থনৈতিকভাবে চীনের সঙ্গে তাদের দূরত্বও অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে। এশিয়ায় ভারত ও চীন একত্র থাকলে বিশ্বব্যবস্থায় নতুন কিছু অর্জন করা সম্ভব—চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এমন মন্তব্য থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে পারস্পরিক অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং এ লক্ষ্যে যৌথ উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের এত দিনের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোর ভিতকে দুর্বল করে তুলছে।
মূলত ইরান যুদ্ধ বিশ্বের কাছে এই বার্তাই দিয়েছে যে এত দিন ধরে চলমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন আশু করণীয় হয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে ইসরায়েল ছাড়া আর কোনো সহযোগীকেই পাশে পাচ্ছে না, সেটিও আবার মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক, যা এক ভঙ্গুর অবস্থায় পতিত। বৈশ্বিক রাজনৈতিক মানচিত্রে শিগগিরই পরিবর্তন ঘটছে কি না, সেটিই এখন দেখার পালা।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়




অন্যদিকে প্রায় সমসাময়িক সময়ে অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করা এবং সস্তা শ্রমের বিশাল জনমিতিক লভ্যাংশ (পপুলেশন ডিভিডেন্ড) থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উল্লম্ফন এবং বাংলাদেশের এই দীর্ঘস্থায়ী অনগ্রসরতা দুই দেশের নীতিমালার পার্থক্যকেই স্পষ্ট করে।
এ বছর এবং/অথবা পরের বছর চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে।’ ম্যাকগুয়ার আরো বলেন, ‘বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরে রেকর্ড পরিমাণে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার কারণে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা সম্ভব।’ ‘এল নিনো’ হলো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়ার ধরন, যা বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ায় এবং সম্ভবত এই গ্রীষ্মে এটি আবির্ভূত হবে। প্রকৃতপক্ষে এই সপ্তাহে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কিছু অংশে তাপমাত্রা আটত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। ইংল্যান্ডের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু অংশের জন্য অতি তাপপ্রবাহের অ্যাম্বার সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে।