পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১০টি মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
আজ সোমবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এই তথ্য দেন। সেই সঙ্গে বলেছেন, এক যুগ আগে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব ছিলেন বেনজীর আহমেদ। শুধু তা-ই নয়, আট বছর আগে কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বেনজীরের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও দাবি করেন চিফ প্রসিকিউটর।
২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন একরামুল হক। ঘটনার কিছু সময় আগে মেয়ের সঙ্গে একরামুলের কথোপকথনের একটি ফোনকল রেকর্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। সে সময় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তাঁকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) করা হয়।
২০১৩ সালে বেনজীর আহমেদ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার ছিলেন। ওই বছর ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ঘিরে যে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেই অভিযানে বেনজীরের ভূমিকা তুলে ধরে ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তিনি শুধু শাপলা চত্বরের মাস্টারমাইন্ড না, তার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে আমাদের এখানে প্রায় ১০টির মতো মামলা আমরা ইনভেস্টিগেশন করে যাচ্ছি এবং প্রত্যেকটার সঙ্গে তার সরাসরি কানেকশন আছে। তার বিরুদ্ধে কক্সবাজারে একরামুল কমিশনারের যে হত্যাকাণ্ড, তার সঙ্গে তার (বেনজীরের) সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। সে মামলাও তিনি আছেন (আসামি হিসেবে)।’
চিফ প্রসিকিউটরের মতে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে হেন কোনো দুষ্কর্ম নেই, যেটা বেনজীর তার কর্মজীবনে করেননি। আওয়ামী লীগ বা পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের দিকে ইঙ্গিত করে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে (গণ-অভ্যুত্থানে পতনের আগে) তাদেরই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তাদের কোনো কুশীলব তার (বেনজীরের) কুকীর্তি প্রকাশ করে দেন।’ এ সময় চিফ প্রসিকিউটর ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনান সাংবাদিকদের।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এই প্রতিবেদনের পর সবাই প্রথমবরের মতো জানতে পারে যে বেনজীর কত সম্পদের মালিক! কত ফ্ল্যাট, কত জায়গা, কত জমি আছে তার স্ত্রীর নামে, তার সন্তানদের নামে। তার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া যায় দেশে, বিদেশে। এমন কোনো কুকীর্তি নেই, যেটা বেনজীর আহমেদ করেননি।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তিনি পুলিশ কমিশনার হিসেবে অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি র্যাবের প্রধান হিসেবে অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি যখন পুলিশের প্রধান ছিলেন, আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, অসংখ্য অপরাধের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়টি বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে, প্রত্যেকটি নির্বাচনে তার বিতর্কিত ভূমিকা ছিল। এই দেশের গণতন্ত্র নস্যাৎ করবার জন্য, হাজার হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করার দায়সহ অসংখ্য দায় তার বিরুদ্ধে।’
বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে ট্রাইব্যুনালেও হাজির করা হবে। আর তদন্তাধীন মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া হবে জানান আমিনুল ইসলাম।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আমাদের কোনো এক্সট্রাডিশন ট্রিটি (প্রত্যর্পণ চুক্তি) না। কিন্তু আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। ইতোমধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে কয়টি ওয়ারেন্ট আছে সেগুলো দিয়ে সরকার ইতোমধ্যে ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) সরকারের কাছে আবেদন করেছে তাঁকে ফেরত দেওয়ার জন্যে।’
আলোচিত-বিতর্কিত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে গত রবিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানায়, পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র। এর আগে গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়। বর্তমানে তিনি সেখানেই আছেন।









