• ই-পেপার

মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?

মহানবী (সা.)-এর শানে বেয়াদবির ভয়াবহ পরিণতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.)-এর শানে বেয়াদবির ভয়াবহ পরিণতি
সংগৃহীত ছবি

মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি শুধু একজন নবী নন; তিনি আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ রাসুল, সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ এবং ঈমানদারদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা সমুন্নত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি অবমাননা, বিদ্রূপ ও বেয়াদবির বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা মহানবী (সা.)-কে উপহাস করেছে, তাঁর বিরোধিতা করেছে এবং তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের অনেকেই দুনিয়াতেই ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করেছে। এটি আজ শুধু ইতিহাস নয়; বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে, আল্লাহর প্রিয় রাসুলের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯৫)

মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো, তাঁকে সাহায্য করো এবং যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করো।’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৮–৯)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত করেছেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৭)

মক্কার পাঁচ বিদ্রূপকারীর করুণ পরিণতি
মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এমন পাঁচজন কুখ্যাত ব্যক্তি ছিল, যারা মহানবী (সা.)-কে বিদ্রূপ, অপমান ও নির্যাতন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল। তারা হলো— ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব, আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস, হারেস ইবনে আইতাল ও আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমি। 

একদিন জিবরাঈল (আ.) মহানবী (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হলে মহানবী (সা.) তাঁদের অত্যাচারের কথা উল্লেখ করেন। এরপর একে একে ওই ব্যক্তিরা সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে জিবরাঈল (আ.) তাদের শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমি তার জন্য যথেষ্ট।’ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহ তাআলার ফয়সালা বাস্তবায়িত হতে শুরু করল।

১. ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা : একদিন খুজাআ গোত্রের এক ব্যক্তি তীর ঠিক করছিল। অসাবধানতাবশত একটি তীর ছিটকে এসে ওয়ালিদের আঙুলে আঘাত করে। সামান্য ক্ষতই পরে মারাত্মক হয়ে ওঠে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে মৃত্যুবরণ করে।

২. আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব : সে সন্তানদের নিয়ে গাছতলায় বসেছিল। হঠাৎ আতঙ্কে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আমাকে বাঁচাও! কেউ আমার চোখে কাঁটা ঢুকিয়ে দিচ্ছে!’ তার সন্তানরা কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু সে আর্তনাদ করতে থাকল। শেষ পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং অন্ধ অবস্থায় যন্ত্রণায় মৃত্যুবরণ করে।

৩. আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস : তার মাথায় ভয়াবহ ফোড়া ও ক্ষত সৃষ্টি হয়। পুরো মাথা ক্ষতে ভরে যায় এবং সেই দুরারোগ্য ব্যাধিতেই তার মৃত্যু ঘটে।

৪. হারেস ইবনে আইতাল : সে এমন এক অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত হয়, যাতে তার পেট হলুদ পানিতে ফুলে যায়। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয় যে মুখ দিয়েই পেটের ময়লা বের হতে থাকে। দীর্ঘ কষ্টের পর সে মৃত্যুবরণ করে।

৫. আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমি : তায়েফ যাওয়ার পথে তার গাধা একটি কাঁটাযুক্ত ঝোপে বসে পড়ে। একটি কাঁটা তার পায়ে গভীরভাবে বিঁধে যায়। সেই ক্ষত বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনাগুলো বর্ণিত হয়েছে ইমাম বায়হাকির আসসুনানুল কুবরা (৯/৮)-এ। ঐতিহাসিক ও সীরাতগ্রন্থগুলোতেও এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। 


এই ঘটনাগুলো আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—

১. মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। 
২. মহানবী (সা.)-কে বিদ্রূপ করা বা তাঁর শানে বেয়াদবি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
৩. আল্লাহ তাআলা চাইলে দুনিয়াতেই অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারেন।
৪. মুসলমানের কর্তব্য হলো মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর মর্যাদা সমুন্নত রাখা।
৫. কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে শাস্তি না পেলেও আখিরাতের শাস্তি আরো কঠিন হতে পারে; তাই বাহ্যিক পরিণতি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।

আজকের যুগেও একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো নিজের কথা, লেখা, আচরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার—সবক্ষেত্রেই মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং তাঁর আদর্শকে ভালোবাসা, অনুসরণ ও প্রচারের মাধ্যমে প্রকৃত মহব্বতের প্রমাণ দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

হাদিসের বাণী

ইসলামে যে দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা প্রশংসনীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামে যে দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা প্রশংসনীয়
সংগৃহীত ছবি

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, দুটি বিষয়ে ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় না। দুটি বিষয় হলো—
১. ওই ব্যক্তির প্রতি (ঈর্ষা করা প্রশংসনীয়), যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ দান করেছেন, তারপর সে তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার সক্ষমতাও দান করেছেন। 
২. ওই ব্যক্তির প্রতি (ঈর্ষা করা প্রশংসনীয়), যাকে আল্লাহ তাআলা জ্ঞান দান করেছেন আর সে তার জ্ঞানের মাধ্যমে (মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে) মীমাংসা করেন এবং অন্যকে জ্ঞান শিক্ষা দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৭৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৮৯৬)

হাদিসের শিক্ষাসমূহ :
১. কল্যাণকর বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা বৈধ ও প্রশংসনীয়। তাই দুনিয়াবি ভোগ-বিলাসে নয়; বরং নেক আমল, জ্ঞান ও দানশীলতায় একে অপরকে অতিক্রম করার চেষ্টা করা উচিত।
২. এখানে ঈর্ষা বলতে ‘গিবতাহ’ (غِبْطَة) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ অন্যের নিয়ামত দেখে তার ক্ষতি কামনা না করে নিজের জন্যও এমন নিয়ামত কামনা করা। এটি বৈধ ও উত্তম।
৩. আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা সর্বোত্তম আমলগুলোর একটি। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ সঠিক পথে ব্যয় করে, সে প্রশংসার যোগ্য।
৪. সম্পদ আল্লাহর আমানত। ধন-সম্পদ শুধু ভোগের জন্য নয়; বরং দীন, সমাজ ও মানবকল্যাণে ব্যয় করার জন্যও।
৫. ইলম (দ্বীনি জ্ঞান) মহান নিয়ামত। আল্লাহ যাকে উপকারী জ্ঞান দান করেন, তিনি বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত।
৬. জ্ঞান অনুযায়ী বিচার করা ও আমল করা অপরিহার্য। শুধু জ্ঞান অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই জ্ঞান দিয়ে ন্যায়বিচার ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
৭. সম্পদ ও জ্ঞানের প্রকৃত মর্যাদা তাদের সঠিক ব্যবহারে। যে সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় হয় এবং যে জ্ঞান মানুষের উপকারে আসে, সেটিই প্রকৃত সফলতা।
৮. মুসলিমের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আখিরাতের সফলতা। তাই দুনিয়ার মর্যাদা, পদ-পদবি বা ধন-সম্পদের জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করা উচিত।

অতএব, এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষের প্রতি ঈর্ষা নয়; বরং নেক কাজে অনুপ্রাণিত হওয়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তাই আমাদের উচিত আল্লাহর দেওয়া সম্পদ তাঁর পথে ব্যয় করা এবং উপকারী জ্ঞান অর্জন করে তা অনুযায়ী আমল করা ও অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা। এ দুটি গুণই দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি।

রাতে ছোট শিশুদের অতিরিক্ত কান্না থামাতে যা করবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
রাতে ছোট শিশুদের অতিরিক্ত কান্না থামাতে যা করবেন
সংগৃহীত ছবি

রাতে ছোট বাচ্চা অতিরিক্ত কান্না করা এটি অনেক পিতা-মাতার জন্য চিন্তার বিষয়। সাধারণভাবে প্রতিটি শিশুই রাতে কাঁদে। তাই এতে বেশি দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। যদি বাচ্চা অতিরিক্ত কান্না করে এবং তাতে কোনো অসুস্থতার আশঙ্কা হয়, তাহলে প্রথমত, কোনো ভালো চিকিৎসককে দেখিয়ে চিকিৎসা করানো উচিত।

তবে এই কান্না দেহগত বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ দুটি কারণেই হতে পারে। সম্ভবনাময় কিছু কারণ যেমন, ক্ষুধা বা বুকের দুধ না পাওয়া, পেটব্যথা / গ্যাস / কোষ্ঠকাঠিন্য, গরম বা ঠান্ডা লাগা, পিপাসা লাগা, ডায়াপার ভেজা থাকা, দাত উঠার ব্যথা, অস্বস্তি লাগা-এই সব দেহগত কারণের দিকে সর্বপ্রথম খেয়াল রাখতে হবে। এরপর যদি কোনো দৃশ্যমান কারণ না পাওয়া যায়, তাহলে অদৃশ্যগত দিক বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন, জ্বিন ও শয়তানী কুপ্রভাব। কেননা জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন রাতের আধার নেমে আসবে অথবা বলেছেন, যখন সন্ধ্যা হয়ে যাবে তখন তোমরা তোমাদের শিশুদের (ঘরে) আটকিয়ে রাখবে। কেননা এ সময় শয়তানেরা ছড়িয়ে পড়ে। আর যখন রাতের কিছু অংশ অতিবাহিত হয়ে যাবে তখন তাদের ছেড়ে দিতে পার। তোমরা ঘরের দরজা বন্ধ করবে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। কেননা শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩০৪)
এ হাদিস থেকে বুঝা যায়, সন্ধ্যার সময় থেকে কিছু সময় পর্যন্ত জ্বিনেরা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা ছোট বাচ্চাদের বেশি ক্ষতি করতে পারে। এজন্য সন্ধার সময় আজানের পরপর কিছু সময়ের জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা এবং শিশুদের বাইরে বের হতে না দেয়া। অপর এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এমন কোন নবজাতক নেই যাকে শয়তান খোঁচা না দেয়। যাকে শয়তান খোঁচায় সে চিৎকার করতে শুরু করে। শুধু মরিয়ম তনয় এবং তাঁর মাতা ছাড়া। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৬৬)

এক্ষেত্রে করণীয় কিছু আমল:
১. সন্ধ্যার আগে দরজা-জানালা বন্ধ করা।
২. সন্ধ্যার সময় (মাগরিব) শিশুকে বাইরে না নেওয়া।
৩. রাতে ঘুমানোর সময় কিছু দোয়া ও আমল করা:

ক. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা, প্রতিদিন রাতে-বিশেষ করে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর আগে পড়ে বাচ্চার গায়ে ফুঁ দেয়া।
খ. রাসুল (সা.) নিজের নাতি হাসান ও হুসাইনকে এই দুআটি পড়ে ফুঁ দিতেন,

أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ


উচ্চারণ : উয়িজু বিকালিমাতিল্লাহিত তা-ম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়ামিন কুল্লি আইনিন লাম্মাতিন।
অর্থ : ‘আমি তোমাদের দু’জনকে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের আশ্রয়ে দিচ্ছি-প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং সকল অনিষ্টকারী বদনজর থেকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৭১)

গ. সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে বাচ্চাকে ফুঁ দেয়া।
ঘ. রাতে ঘুমানোর আগে (সম্ভব হলে) পুরো ঘরে সুরা বাকারার রেকর্ড চালিয়ে রাখা।
ঙ. বাচ্চার নাম রাখার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা: ভালো ও অর্থপূর্ণ ইসলামি নাম রাখা জরুরী। কেননা নামের প্রভাব শিশুর মানসিকতা ও আত্মগঠনে খুবই প্রভাবক। বিশেষ করে ঘুমানোর পূর্বে নিজের রুমকে বন্ধ করে নেয়া। আয়াতুল কুরসি ও তার পরের দুই আয়াত পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে সজোরে তিনটি তালি দিন। ইনশাআল্লাহ বাচ্চাসহ সবাই রবের জিম্মায় নিরাপদ থাকবেন।

ব্যক্তিগত বিদ্বেষ যেভাবে জুলুমে রূপ নেয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
ব্যক্তিগত বিদ্বেষ যেভাবে জুলুমে রূপ নেয়
সংগৃহীত ছবি

আমাদের সমাজে বা পরিবারে কলহ তৈরি হওয়ার পেছনে যে সমস্যাগুলো কাজ করে, তার মধ্যে অন্যতম বড় সমস্যা হলো সামান্য কষ্ট পেলেই অন্যের সব অবদান ভুলে যাওয়া। কারো একটি কথা কিংবা একটি ভুলকে বড় করে দেখে তার সারা জীবনের সব অবদানকে অস্বীকার করে বসা। 

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা হয় যে, যে ব্যক্তিটি আমাদের অসংখ্যবার উপকার করেছে, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে, আন্তরিক পরামর্শ দিয়েছে, দুঃসময়ে সাহায্য করেছে, কোনো একদিন তার একটি আচরণ আমাদের মন খারাপ করে দিলে আমরা তার সব অবদান ভুলে যাই। এমনকি তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করি। ফলে তার ভালো গুণগুলো জেনেশুনে আড়াল করি এবং সুযোগ পেলেই তার দোষত্রুটি অন্যের কাছে তুলে ধরি।

বিদ্বেষ আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে বিকৃত করে দেয় যে প্রতিপক্ষের কোনো গুণই আমাদের চোখে পড়ে না, বরং তার গুণগুলোকেও শয়তান বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে আমাদের সামনে ত্রুটি হিসেবে উপস্থাপন করে।

আমরাও শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সর্বত্র তার ত্রুটি ছড়াতে থাকি। এমনকি যার পেছনে আমরা এসব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকি, বেইনসাফপূর্ণ আচরণ করি, বেশির ভাগ সময় দেখা যায় সে আমাদের আত্মীয়, বন্ধু বা কাছের মানুষই হয়।

অথচ মহান আল্লাহ শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও।

কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শত্রুর ক্ষেত্রেও সুবিচার করতে হয়। অতএব আপনজন, প্রতিবেশী, সহকর্মী বা বন্ধুদের একটি ভুলের কারণে তাদের সব ভালো দিক অস্বীকার করা, তাদের সব ভুলকে ভুল হিসেবে প্রচার করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।

মানুষের মধ্যে ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কারণ মহান আল্লাহ মানবজাতিকে দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৮)

দুর্বলতার মানেই হলো মানুষের ভুল হয়ে যাওয়া, সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক। তাই একজন মানুষের একটি ত্রুটিকে সামনে এনে তার সব গুণকে অন্ধকারে ফেলে দেওয়া, তার সারা জীবনের অবদানগুলো ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই দোষ-গুণ থাকবে, এর মধ্যেই নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে চলতে হবে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ-ঘৃণা পোষণ করবে না; (কারণ) তার কোনো চরিত্র অভ্যাসকে অপছন্দ করলে তার অন্য কোনোটি (চরিত্র-অভ্যাস) সে পছন্দ করবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৫৪০)

এই হাদিসটি স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে হলেও অন্য মানুষের প্রতি একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরও শিক্ষা দেয়। একজন মানুষের মধ্যে যেমন ত্রুটি থাকতে পারে, তেমনি অসংখ্য গুণও থাকতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। তাই নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সেই গুণগুলোও স্মরণ করতে হবে। তার অবদানগুলোর কথা স্মরণ করলে বিদ্বেষ অনেকাংশে কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।

তা ছাড়া মানুষের অবদান মনে রেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও ঈমানের অংশ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। অথবা যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮১১)

অতএব কারো কাছ থেকে পাওয়া দু-একটি কষ্টের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তার শত শত উপকার ভুলে যাওয়া কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। এটা নিছক হিংসা ও ক্ষোভ। যা মানুষকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা অপবাদ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যের চরিত্র ও সফলতা হরণের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত করে।

অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে কারো ওপর অপবাদ দেওয়া তো দূরের কথা, তার মধ্যে বাস্তবে কোনো দোষ থাকলেও তা ব্যাপকভাবে প্রচার করার ব্যাপারে অনুৎসাহ দিয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৪৪)

এটি অবশ্য সেই ক্ষেত্রে, যেখানে কারো গোপন পাপ ঢেকে রাখলে সমাজের ক্ষতি বা অন্যের অধিকার নষ্ট হয় না। কিন্তু শত্রুতার জেরে মানুষের ব্যক্তিগত দুর্বলতা, ভুল বা অতীতের ত্রুটি প্রচার করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।

এমনকি কাউকে হেয় করার জন্য তার দোষত্রুটি অনুসন্ধান করাও নিষেধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাক। ধারণা বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা দোষ তালাশ কোরো না, গোয়েন্দাগিরি কোরো না, পরস্পর হিংসা পোষণ কোরো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ কোরো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না; বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।’  (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৪)

অন্য হাদিসে আরো কঠোর ভাষায় মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে সেসব লোক, যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছে কিন্তু অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গিবত করবে না ও দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কারণ যারা তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারো দোষত্রুটি তালাশ করলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৮০)

মহানবী (সা.) এসব কাজ কতটা অপছন্দ করলে বলেছেন যে, যারা মুখে ঈমান এনেছে, কিন্তু তা অন্তরে প্রবেশ করেনি! বোঝা গেল, অন্যের দোষচর্চা করে বেড়ানো, অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করা ঈমানবিরোধী কাজ।

অন্যের বিনাশ কামনা কখনোই ঈমানের পরিচয় হতে পারে না। বরং যারা অন্যের কল্যাণ চায়, তারাই মুমিন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩)

অর্থাৎ একজন মুমিনের অন্তরে মানুষের জন্য শুভ কামনা থাকবে। কারো মধ্যে সত্যিই যদি দোষত্রুটি থাকে, সে ওই লোকটার অপমান চাইবে না, বরং সে চাইবে যে লোকটা সংশোধিত হোক। তাকে সংশোধন করার প্রয়াসে নেওয়া পদক্ষেপগুলো হবে গঠনমূলক ও কল্যাণকামী মনোভাব নিয়ে।

জীবনে চলার পথে আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা সহকর্মীর সঙ্গে মনোমালিন্য হতেই পারে। তাই বলে তাদের সব অবদান ভুলে গিয়ে তাদের ক্ষতি করার জন্য আদাজল খেয়ে নেমে পড়া মুসলমানের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং এ রকম পরিস্থিতিতে রাগ সংবরণ করে ক্ষমা করে দেওয়া ঈমানের দাবি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩৪)

মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ সবার অন্তরের খবর জানেন। মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ, কথাবার্তা, কাজকর্ম ফেরেশতারা লিখে রাখেন। কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে নিজ নিজ কর্মের হিসাব দিতে হবে।

মহান আল্লাহ সবাইকে অতিরিক্ত রাগ, ক্ষোভ, হিংসার বশবর্তী হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক ঘৃণ্য কাজ করা থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।