• ই-পেপার

বান্দা যে সময়ে দোয়া করলে শূন্যহাতে ফিরিয়ে দেয়া হয় না

ইন্টারনেট ভাড়া দিলে ব্যবহারকারীর গোনাহের দায় কি মালিকের ওপর বর্তাবে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
ইন্টারনেট ভাড়া দিলে ব্যবহারকারীর গোনাহের দায় কি মালিকের ওপর বর্তাবে?
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগে ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। শিক্ষা, ব্যবসা, যোগাযোগ, চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। অনেকেই নিজেদের ইন্টারনেট সংযোগ অন্যদের কাছে ভাড়া দেন বা শেয়ার করেন। এ অবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যদি কোনো ব্যক্তি সেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে গোনাহের কাজ করে, তাহলে কি ইন্টারনেটের মালিকও সেই গোনাহের অংশীদার হবেন?

ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি হলো—মানুষ তার নিজের কাজের জন্য দায়ী। কোনো বৈধ জিনিসের অপব্যবহার করলে তার দায় সাধারণত অপব্যবহারকারীর ওপরই বর্তায়। তবে যদি কেউ জেনে-শুনে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গোনাহের কাজে সহযোগিতা করে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো বহনকারী অন্য কারো বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬৪)

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জিত সৎকর্মের সুফল পাবে এবং তার কৃত অসৎকর্মের দায়ভারও তারই ওপর বর্তাবে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, প্রত্যেক মানুষ নিজের কর্মের জন্যই জবাবদিহি করবে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিজে ক্ষতি করবে না এবং অন্যেরও ক্ষতি করবে না।’ (ইবন মাজাহ, হাদিস : ২৩৪০)
হাদিসে আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১)
অতএব, যদি ইন্টারনেটের মালিকের উদ্দেশ্য বৈধভাবে সেবা প্রদান করা হয়, আর ব্যবহারকারী নিজের ইচ্ছায় সেটিকে হারাম কাজে ব্যবহার করে, তাহলে সেই গোনাহ ব্যবহারকারীর ওপর বর্তাবে।

ইসলামী ফিকহে মালিকানার একটি মৌলিক নীতি হলো—মালিক তার সম্পত্তি বৈধ উপায়ে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার ও অন্যকে ব্যবহারের অধিকার দিতে পারেন। ফোকাহায়ে কেরাম বলেন, ‘তাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অংশ নিজের ইচ্ছামতো নিষ্পত্তি করার অধিকার আছে।’ (শারহুল মাজাল্লা, ১/৬৪৩)
আরো বলা হয়েছে যে, ‘মালিক তিনিই, যিনি নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি নিজের ইচ্ছামতো নিষ্পত্তি করেন।’ (তাফসিরে বায়জাবি, ১/৭)
এছাড়া—‘মালিকানা হলো এমন অধিকার, যার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের সম্পদের ওপর একচ্ছত্রভাবে বৈধ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৭/১০, ২৩৫), আল-মাওসুআতুল-ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ১৪/২৯)

বৈধ জিনিসের অপব্যবহারের দায় কার?
ইন্টারনেট একটি বৈধ সেবা। কেউ যদি সেটিকে বৈধ কাজে ব্যবহার করে, সওয়াব পেতে পারে; আবার কেউ যদি হারাম কাজে ব্যবহার করে, তাহলে গোনাহও তার নিজের হবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। তা হলো, যদি ইন্টারনেটের মালিক নিশ্চিতভাবে জানেন যে, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এটিকে শুধু হারাম কাজেই ব্যবহার করবে এবং তিনি সেই উদ্দেশ্যেই ইন্টারনেট সরবরাহ করেন বা উৎসাহ দেন, তাহলে তা গোনাহের কাজে সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হবে। আর আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ইন্টারনেট একটি বৈধ সেবা। তাই বৈধভাবে ইন্টারনেট ভাড়া দেওয়া বা অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়া জায়েজ। ব্যবহারকারী যদি নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় সেটিকে হারাম কাজে ব্যবহার করে, তবে সেই গোনাহ তার নিজের ওপর বর্তাবে; সাধারণ অবস্থায় ইন্টারনেটের মালিক তার জন্য দায়ী হবেন না। তবে মালিক যদি জেনে-শুনে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বা নিশ্চিতভাবে হারাম কাজে সহযোগিতা করেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন। (তাহতাবি আলাদ-দুররুল মুখতার, ৪/১৯৬, তাহতাবি, ৪/১৯৭, আদ-দুররুল মুখতার, ৪/১৯৬,  আল-মাওসুআতুল-ফিকহিয়্যাহ, ৯/২১৫)।
 

পর্তুগালের ঐতিহাসিক লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
পর্তুগালের ঐতিহাসিক লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদ
সংগৃহীত ছবি

ইউরোপের অন্যতম নান্দনিক দেশ পর্তুগাল। আর সেই দেশের রাজধানী লিসবনের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য ইসলামী স্থাপত্য—লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদ। এটি শুধু পর্তুগালের বৃহত্তম মসজিদই নয়; বরং ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবসেবা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে আজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্য, মানবিক কর্মকাণ্ড এবং উদার ইসলামী মূল্যবোধের কারণে মসজিদটি মুসলিম-অমুসলিম সবার হৃদয় জয় করেছে।

লিসবনে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণের স্বপ্নের সূচনা হয় ১৯৬৬ সালে। সে সময় পাঁচজন মুসলিম ও পাঁচজন অমুসলিম নাগরিকের একটি প্রতিনিধিদল মসজিদ নির্মাণের অনুমতি চাইলেও পৌরসভা তা প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে মোজাম্বিকসহ বিভিন্ন পর্তুগিজ উপনিবেশ থেকে বহু মুসলিম শিক্ষার্থী লিসবনে উচ্চশিক্ষার জন্য আসতে শুরু করলে একটি মসজিদের প্রয়োজনিয়তা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৭৩ সালের আরব তেলসংকটের পর মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ১৯৭৭ সালে লিসবনের তৎকালীন মেয়র মসজিদের জন্য জমি বরাদ্দ দেন। ১৯৭৮ সালে সরকার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয় এবং ১৯৭৯ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। দীর্ঘ সাত বছরের নির্মাণকাজ শেষে ১৯৮৫ সালে উদ্বোধন করা হয় এই ঐতিহাসিক মসজিদ।

মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত সহযোগিতা
এই মসজিদ নির্মাণে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, লিবিয়া, মিসর, পাকিস্তান ও ইরানসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। বিশেষভাবে সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আজিজের নির্দেশনায় বড় অঙ্কের অনুদান আসে। পরে তৎকালীন প্রিন্স সালমান বিন আবদুল আজিজ (বর্তমান সৌদি বাদশাহ) নিজে লিসবন সফর করে অনুদানের শেষ কিস্তি হস্তান্তর করেন এবং পবিত্র কাবার গিলাফের (কিসওয়া) একটি অংশ উপহার দেন। সেই ঐতিহাসিক নিদর্শন আজও মসজিদের দেয়ালে সংরক্ষিত রয়েছে। তারপর মসজিদের সম্মানে ১৯৮১ সালে পাশের সড়কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রুয়া দেল মস্কিতো’ (মসজিদ সড়ক)।

ইসলামি ও পর্তুগিজ স্থাপত্যের অপূর্ব সমন্বয়
লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদটি বিখ্যাত স্থপতি আন্তোনিও মারিয়া ব্রাগা ও জোয়াও পাওলো কনসেইসাওয়ের যৌথ নকশায় নির্মিত হয়েছে। ইসলামি ঐতিহ্য ও পর্তুগিজ স্থাপত্যশৈলীর চমৎকার সংমিশ্রণ এই মসজিদকে দিয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য। সুউচ্চ মিনার, তিনটি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ, প্রশস্ত নামাজের হল, অভ্যর্থনা কক্ষ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সুবিশাল অডিটোরিয়াম—সব মিলিয়ে এটি এক মনোমুগ্ধকর স্থাপত্যকীর্তি। ভেতরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে নয়নাভিরাম আরবি ক্যালিগ্রাফি ও সূক্ষ্ম অলংকরণ। একসঙ্গে এক হাজারেরও বেশি মুসল্লি এখানে সালাত আদায় করতে পারেন। ২০১৫ সাল থেকে হাফেজ শায়খ ডেভিড মুনির এই মসজিদের প্রধান ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মানবতার সেবায় এক আলোকবর্তিকা
পর্তুগাল একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়ায় সরকার এই মসজিদকে কোনো আর্থিক সহায়তা দেয় না। তবুও স্থানীয় মুসলিম সমাজ ও বিভিন্ন মুসলিম দেশের সহযোগিতায় এটি মানবসেবার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। ২০১১ সাল থেকে প্রতিমাসে নির্ধারিত দিনে অভাবী মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। বড়দিনের এক সপ্তাহ আগে থেকে প্রায় ২০০ জন অমুসলিম দরিদ্র মানুষের জন্য প্রতিদিন খাবার ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর বক্স বিতরণ করা হয়। সারা বছরই অসহায় মানুষের মাঝে পোশাক বিতরণ অব্যাহত থাকে।

রমজান মাসে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষের জন্য বিনামূল্যে ইফতারের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন করা, হালাল ভোজের ব্যবস্থা, মরদেহ গোসল, জানাজা এবং পর্তুগাল সরকারের দেওয়া মুসলিম কবরস্থানে দাফনের পূর্ণাঙ্গ সুবিধাও রয়েছে এখানে।

জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র
লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদের অন্যতম বড় শক্তি এর বিস্তৃত শিক্ষামূলক কার্যক্রম। এখানে শিশুদের জন্য ইসলামি শিক্ষা ও আরবি ভাষা শেখানোর পৃথক বিদ্যালয় পরিচালিত হয়, যেখানে প্রায় ৩০০ শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নৈশকালীন আরবি ভাষা শিক্ষা কর্মসূচিতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে বহু অমুসলিমও রয়েছেন, যারা আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। নবমুসলিমদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্লাস, নারীদের জন্য পৃথক ইসলামি শিক্ষা বিভাগ এবং শিশু ও বড়দের জন্য কোরআন হিফজ কর্মসূচিও নিয়মিত পরিচালিত হয়।

প্রতিবছর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থী এই মসজিদ পরিদর্শনে আসেন। পর্তুগালের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিরা দায়িত্ব গ্রহণের পর এই মসজিদ পরিদর্শন করেন—যা দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে মসজিদটির মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। ২০০৮ সালে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামাও এই মসজিদ সফর করেন। এটি ছিল তার জীবনের প্রথম কোনো মসজিদ পরিদর্শন। সফর শেষে তিনি এটিকে তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা বলে উল্লেখ করেন।

লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদ আজ শুধু ইবাদতের স্থান নয়; এটি মানবতা, সহমর্মিতা, শিক্ষা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। ধর্ম, জাতি কিংবা বর্ণের বিভেদ ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্যকে বাস্তব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই মসজিদ। 

পরস্পর উঠাবসায় যে তিনটি কাজ হারাম

মুফতি ওমর বিন নাছির
পরস্পর উঠাবসায় যে তিনটি কাজ হারাম
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম মানুষের ইবাদতের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ককেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই একজন মুসলমান তার উত্তম চরিত্র, সুন্দর আচরণ, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং অন্য মুসলমানের সম্মান রক্ষার মাধ্যমেও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে অনেক সময় মানুষ না বুঝেই অন্যকে উপহাস করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, দোষ খুঁজে বেড়ায় কিংবা অপমানজনক নামে ডাকে। অথচ এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ। পবিত্র কোরআনের সুরা হুজরাতে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিমালা প্রদান করেছেন। 

মুমিনের জন্য পরস্পর উঠাবসায় তিনটি কাজ হারাম

১. অন্যকে উপহাস করা হারাম
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, উপহাস হলো এমনভাবে কারো দোষ, দুর্বলতা বা ত্রুটি তুলে ধরা, যাতে অন্যরা হাসাহাসি করে এবং তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে। এটি কুরআনের ভাষায় স্পষ্ট হারাম। আজ অনেকেই কারো চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা বা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে হাসাহাসি করে। অথচ আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা তার তাকওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, বাহ্যিক রূপ বা সম্পদের ভিত্তিতে নয়।

২. অন্যের দোষ তালাশ ও দোষারোপ করা হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)

অর্থাৎ অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো, তাকে অপমান করা বা তার দুর্বলতা প্রকাশ করা একজন মুসলমানের কাজ নয়। তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষ যখন অন্যের দোষ প্রকাশ করে, তখন অপর পক্ষও তার দোষ প্রকাশ করে। কারণ দোষ থেকে কোনো মানুষই সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। তাই মুসলমানের কর্তব্য হলো অন্যের দোষ গোপন রাখা, সংশোধনের চেষ্টা করা এবং নিজের দোষ সংশোধনে ব্যস্ত থাকা।

৩. অপমানজনক নামে ডাকা হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)

কাউকে খোঁড়া, কানা, অন্ধ, কালা, বোবা কিংবা তার অপছন্দনীয় কোনো নামে সম্বোধন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন গুনাহ দ্বারা লজ্জা দেয়, যা থেকে সে তাওবা করেছে, আল্লাহ তাকে সেই গুনাহে লিপ্ত করে ইহকাল ও পরকালে অপমানিত করবেন।’ (তাফসিরে কুরতুবি)
এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের অতীত গুনাহ বা দুর্বলতা নিয়ে তাকে অপমান করা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ।

আমাদের করণীয় হলো-

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিটি মুসলমানকে সম্মান করা।
২. কাউকে উপহাস না করা।
৩. কারো দোষ খুঁজে বেড়ানোর বদলে নিজের সংশোধনে মনোযোগী হওয়া।
৪. কাউকে কষ্ট দেয় এমন নামে না ডাকা।
৫. গীবত, অপবাদ ও কটু ভাষা বর্জন করা।
৬. মুসলিম ভাই-বোনের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
৭. বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
৮. হিংসা ও বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা ও ক্ষমাশীলতার মনোভাব গড়ে তোলা।

আমরা যদি উপহাস, দোষারোপ ও অপমানজনক নামে ডাকা থেকে বিরত থাকি, তবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক মুসলমান যদি অপর মুসলমানের সম্মানকে নিজের সম্মানের মতো রক্ষা করে, তবে উম্মাহর ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে এবং আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হবে। ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার, মুসলিম ভাই-বোনদের সম্মান রক্ষা করার এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মহানবী (সা.)-এর শানে বেয়াদবির ভয়াবহ পরিণতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.)-এর শানে বেয়াদবির ভয়াবহ পরিণতি
সংগৃহীত ছবি

মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি শুধু একজন নবী নন; তিনি আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ রাসুল, সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ এবং ঈমানদারদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা সমুন্নত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি অবমাননা, বিদ্রূপ ও বেয়াদবির বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা মহানবী (সা.)-কে উপহাস করেছে, তাঁর বিরোধিতা করেছে এবং তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের অনেকেই দুনিয়াতেই ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করেছে। এটি আজ শুধু ইতিহাস নয়; বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে, আল্লাহর প্রিয় রাসুলের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯৫)

মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো, তাঁকে সাহায্য করো এবং যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করো।’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৮–৯)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত করেছেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৭)

মক্কার পাঁচ বিদ্রূপকারীর করুণ পরিণতি
মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এমন পাঁচজন কুখ্যাত ব্যক্তি ছিল, যারা মহানবী (সা.)-কে বিদ্রূপ, অপমান ও নির্যাতন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল। তারা হলো— ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব, আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস, হারেস ইবনে আইতাল ও আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমি। 

একদিন জিবরাঈল (আ.) মহানবী (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হলে মহানবী (সা.) তাঁদের অত্যাচারের কথা উল্লেখ করেন। এরপর একে একে ওই ব্যক্তিরা সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে জিবরাঈল (আ.) তাদের শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমি তার জন্য যথেষ্ট।’ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহ তাআলার ফয়সালা বাস্তবায়িত হতে শুরু করল।

১. ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা : একদিন খুজাআ গোত্রের এক ব্যক্তি তীর ঠিক করছিল। অসাবধানতাবশত একটি তীর ছিটকে এসে ওয়ালিদের আঙুলে আঘাত করে। সামান্য ক্ষতই পরে মারাত্মক হয়ে ওঠে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে মৃত্যুবরণ করে।

২. আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব : সে সন্তানদের নিয়ে গাছতলায় বসেছিল। হঠাৎ আতঙ্কে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আমাকে বাঁচাও! কেউ আমার চোখে কাঁটা ঢুকিয়ে দিচ্ছে!’ তার সন্তানরা কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু সে আর্তনাদ করতে থাকল। শেষ পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং অন্ধ অবস্থায় যন্ত্রণায় মৃত্যুবরণ করে।

৩. আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস : তার মাথায় ভয়াবহ ফোড়া ও ক্ষত সৃষ্টি হয়। পুরো মাথা ক্ষতে ভরে যায় এবং সেই দুরারোগ্য ব্যাধিতেই তার মৃত্যু ঘটে।

৪. হারেস ইবনে আইতাল : সে এমন এক অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত হয়, যাতে তার পেট হলুদ পানিতে ফুলে যায়। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয় যে মুখ দিয়েই পেটের ময়লা বের হতে থাকে। দীর্ঘ কষ্টের পর সে মৃত্যুবরণ করে।

৫. আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমি : তায়েফ যাওয়ার পথে তার গাধা একটি কাঁটাযুক্ত ঝোপে বসে পড়ে। একটি কাঁটা তার পায়ে গভীরভাবে বিঁধে যায়। সেই ক্ষত বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনাগুলো বর্ণিত হয়েছে ইমাম বায়হাকির আসসুনানুল কুবরা (৯/৮)-এ। ঐতিহাসিক ও সীরাতগ্রন্থগুলোতেও এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। 


এই ঘটনাগুলো আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—

১. মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। 
২. মহানবী (সা.)-কে বিদ্রূপ করা বা তাঁর শানে বেয়াদবি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
৩. আল্লাহ তাআলা চাইলে দুনিয়াতেই অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারেন।
৪. মুসলমানের কর্তব্য হলো মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর মর্যাদা সমুন্নত রাখা।
৫. কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে শাস্তি না পেলেও আখিরাতের শাস্তি আরো কঠিন হতে পারে; তাই বাহ্যিক পরিণতি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।

আজকের যুগেও একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো নিজের কথা, লেখা, আচরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার—সবক্ষেত্রেই মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং তাঁর আদর্শকে ভালোবাসা, অনুসরণ ও প্রচারের মাধ্যমে প্রকৃত মহব্বতের প্রমাণ দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।