বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি বা ‘ব্লু-ইকোনমি’কে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করতে গভীর সমুদ্রে টুনা মাছ আহরণ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিংড়ি চাষ এবং মেরিকালচার খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে দুর্বল কোল্ড-চেইন অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক ই-ট্রেসেবিলিটি মানদন্ড পূরণে ব্যর্থতাকে এই সম্ভাবনার প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীতে মঙ্গলবার মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) ও জাইকার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলা সরকারের জাতীয় অগ্রাধিকার। তিনি স্বীকার করেন, বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও আমলাতান্ত্রিক ও অবকাঠামোগত জটিলতার কারণে বাস্তবায়নের পথ এখনো সহজ নয়। তবে নতুন নেতৃত্বের অধীনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।
কারিগরি অধিবেশনে এসিআই অ্যাগ্রোলিংক লিমিটেডের ফিশারিজ স্পেশালিস্ট সৈয়দ এম. ইশতিয়াক জানান, বাংলাদেশের ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ ও আন্দামান সাগর-সংলগ্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ টুনা মাছের সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৫০টি আধুনিক লংলাইনার ভেসেলের বহর গড়ে বছরে ৩০ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন টুনা আহরণ এবং প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০টি ভেসেল পরিচালনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
চিংড়ি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সেমিনারে। মিডার সদস্য কমোডর তানজিম ফারুক বলেন, বাংলাদেশ বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি চিংড়ি রপ্তানি করলেও সনাতন চাষপদ্ধতির কারণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি বদলাতে একটি বিশেষায়িত ‘চিংড়ি অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেখানে বায়োফ্লক, ইনডোর স্মার্ট ফার্মিং ও রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ৫০০ কেজি থেকে ২১ হাজার কেজিতে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়।
জাইকা বিশেষজ্ঞ ড. এচিগো মানাবু জাপানের বাজারে বাংলাদেশি সামুদ্রিক খাদ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরে বলেন, কক্সবাজারভিত্তিক ‘জাপান সি-ফুড লিমিটেড’-এর মতো উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সি-বাস, কোবিয়া, গ্রুপার, সামুদ্রিক শৈবাল ও কাঁকড়া চাষেও বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো বাজারে প্রবেশ করতে হলে অবৈধ মৎস্য আহরণ বন্ধ, আধুনিক কোল্ড-চেইন ও ল্যান্ডিং সেন্টার গড়ে তোলা এবং প্রতিটি মাছের ডিজিটাল ই-ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতেই হবে। তাদের মতে, নীতিগত সংস্কার ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানো গেলে তৈরি পোশাক শিল্পের পর বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে ব্লু-ইকোনমি।




