একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভারত। মাঝখানে কয়েক গজের শূন্যরেখা। সেই শূন্যরেখাতেই একই পরিবারের চার সদস্যসহ মোট ৯ জন মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছেন। রবিবার (১৪ জুন) ভোর থেকে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবির বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি।
সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে দুই শিশু—পাঁচ মাস বয়সী ফাহিমা খাতুন ও চার বছরের ফাতেমা খাতুন। ছোট্ট ফাহিমার কান্না থামছে না। ক্ষুধা আর তীব্র গরমে বড় বোন ফাতেমাও বারবার কেঁদে উঠছে। দুই মেয়ের এমন অবস্থা দেখে মা সুমি খাতুনের চোখে শুধু অসহায়ত্ব। কখনো ছোট মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছেন, কখনো বড় মেয়ের চোখের পানি মুছে দিচ্ছেন। কিন্তু সন্তানদের কষ্ট লাঘব করার মতো কোনো উপায় তার হাতে নেই।
পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন বাবা বিল্লাল। মুখে কোনো কথা নেই, শুধু নিঃশব্দ দৃষ্টি। কখনো সন্তানদের দিকে, কখনো সীমান্তের ওপারে তাকিয়ে থাকছেন। একজন বাবার অসহায়ত্ব যেন তার নীরবতাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
মাথার ওপর প্রখর রোদ। আশপাশে নেই কোনো ছাউনি। তাপদাহ থেকে শিশুদের রক্ষা করতে ফাহিম ও হিমেল নিজেদের পরনের লুঙ্গি খুলে অস্থায়ী ছাউনি তৈরির চেষ্টা করেন। সেই সামান্য ছায়ার নিচেই একটু স্বস্তি খোঁজে শিশুরা।
ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্তে ছুটে আসেন। বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে তারাও অবস্থান নেন। রোববার বেলা ১১টার দিকে দুই দেশের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে দাঁতভাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ঠান্ডু মিয়া এবং ভারতের ১৮৩ ব্যাটালিয়নের ঝালোরচর ক্যাম্পের ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার আলোচনায় অংশ নেন। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমাধান হয়নি।
এপারে বিজিবি, ওপারে বিএসএফ। দুই বাহিনী নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও মাঝখানে মানবিক সংকট নিয়ে লড়াই করছেন ৯ জন মানুষ।
সীমান্তে উপস্থিত অনেকের চোখেও জল। কারণ রাষ্ট্রের সীমারেখা মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু শিশুদের কান্নার কোনো সীমান্ত নেই। পাঁচ মাস বয়সী ফাহিমা জানে না সে কোন দেশের নাগরিক। চার বছরের ফাতেমাও জানে না কেন তাকে খোলা আকাশের নিচে বসে থাকতে হচ্ছে। তারা শুধু জানে তাদের ক্ষুধা লেগেছে, রোদে শরীর পুড়ছে, আর তারা মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চায়।
সোমবার দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। একের পর এক আলোচনা হয়েছে, সীমান্তে এসেছে যানবাহন, কিন্তু মেলেনি কোনো সমাধান। ফলে দ্বিতীয় দিনের মতো খোলা আকাশের নিচে, ঘাসের ওপরই রাত কাটাতে হচ্ছে তাদের। মানবিক বিবেচনায় স্থানীয় বাসিন্দারা খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন।
হয়তো ইতিহাস সীমান্ত বিরোধের কথা মনে রাখবে। কিন্তু রৌমারীর এই শূন্যরেখায় বসে থাকা দুই শিশুর কান্না, এক বাবার নীরবতা আর এক মায়ের অশ্রু—সেটিও একদিন মানবতার কাছে প্রশ্ন হয়ে থাকবে।




