ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হোছেন আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে কলেজের জমি ও ভবন বিক্রির অভিযোগ করেন একই কলেজের শিক্ষকরা।
গত মে মাসে করা ওই অভিযোগের ব্যাপারে শুক্রবার (১৯ জুন) বিরোধপূর্ণ অবস্থান থেকে হঠাৎ দুই পক্ষের মধ্যে ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা মনে করছে, দুই পক্ষের সমঝোতায় মোটা অংকের টাকার লেনদেন হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কয়েকজন প্রভাবশালীর মধ্যস্থতায় অধ্যক্ষ হোছেন আলী চৌধুরী আন্দোলনরত শিক্ষকদের মোটা অংকের টাকা দিয়েছেন। শর্ত হচ্ছে, তার (অধ্যক্ষ) বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দেওয়া দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষকরা আর কোনো কথা বলবেন না। পাশাপাশি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় বরখাস্ত করা দুই শিক্ষককে পুনর্বহাল করা হবে।
তারাকান্দা উপজেলা সদরের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘টাকা লেনদেনের বিষয়ে জানা গেছে, অধ্যক্ষ ১০ লাখ টাকা আন্দোলকারী শিক্ষকদের দেবেন। গত শুক্রবার রাতে এ বিষয়ে অধ্যক্ষ ও একাধিক শিক্ষকের মধ্যে মৌখিক সমঝোতা হয় বলে জানা যায়।’
কলেজের একাধিক শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, তারাকান্দা উপজেলায় অবস্থিত ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হোছেন আলী চৌধুরী গোপনে কলেজের জমি ও তিনতলা ভবন বিক্রি করে দিয়েছেন। বিষয়টি এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
হোছেন আলী চৌধুরী নিজের বাবার নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন ২০০৯ সালে। পরে এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণ করতে নিজের মায়ের কাছ থেকে তারাকান্দা উপজেলা সদরে কলেজের নামে জমি লিখে নেন। কিন্তু এর আগে হোছেন আলী কলেজের জমিটি নিজের নামেও মায়ের কাছ থেকে লিখে নেন। জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি একই জমি কলেজ ও নিজের নামে লিখে নেন মায়ের কাছ থেকে।
পরে ২০২২ সালে কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে ২০২৪ সালে হোছেন আলী কলেজের জমি কোটি টাকায় অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন। পরে উপজেলা সদর থেকে কিছুটা দূরে মধুপুর গ্রামে কলেজের জন্য অন্য একটি জমি কিনে সেখানে টিনশেড ভবন নির্মাণ করে কলেজের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রেতার পক্ষ থেকে লোক পাঠিয়ে কলেজটির জমি দখলের প্রক্রিয়া শুরু হলে বিষয়টি জানাজানি হয়। বিষয়টি তখন এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর প্রতিবাদে কলেজের শিক্ষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন।
এদিকে, শিক্ষকদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে কলেজের প্রভাষক হান্নান তালুকদার ও কামরুল ইসলামকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়। এতে শিক্ষকদের প্রতিবাদ কর্মসূচি আরো জোরালো হয়। মে মাসে কলেজটির শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে জমি বিক্রি, কলেজ তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেন।
শিক্ষকরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে গত ২৩ ফেব্রæয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করেন কলেজের শিক্ষকরা। পরে গত ১৯ মে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক বরাবর এসব বিষয়ে অভিযোগ করেন।
অধ্যক্ষের সঙ্গে শিক্ষকদের বিরোধপূর্ণ অবস্থানের পর অধ্যক্ষের সঙ্গে শিক্ষকদের ‘ভুল বোঝাবুঝির’ অবসান হয়েছে- গত শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন খবর প্রচারিত হয়। ওই খবরের সঙ্গে একটি ছবিও প্রকাশিত হয়।
ছবিতে দেখা যায়, প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে স্থায়ীভাবে বরখান্ত শিক্ষক হান্নান অধ্যক্ষকে মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছেন। ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিষয়টি ফের আলোচনার জন্ম দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, এ সমোঝতার জন্য অধ্যক্ষ মোটা অংকের টাকা দিয়েছেন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষকদের।
ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের প্রভাষক হান্নান তালুকদার বলেন, কলেজের স্বার্থে অধ্যক্ষের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা হয়েছে। তবে সেজন্য কোনো টাকা লেনদেন হয়নি।
কলেজের জমি বিক্রির অভিযোগ বিষয়ে মাউশির ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোজ্জামেল হক বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কলেজের জমি ও ভবন বিক্রি করা যায় না। এ বিষয়ে ফজলুল হক চৌধুরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেননি।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ হোছেন আলী চৌধুরী সোমবার মোবাইল ফোনে বলেন, ‘কলেজের জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।’ সমঝোতার জন্য টাকা লেনদেনের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। স্থায়ীভাবে বরখাস্ত হওয়া দুই শিক্ষককে পুনর্বহাল প্রসঙ্গে বলেন, ‘কলেজ কমিটি তাদের বরখাস্ত করেছে। তবে শিক্ষা বোর্ড এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।’