যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র দ্রুত এবং কম খরচে তৈরি করতে নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপ কম্পানিগুলো। এ জন্য তারা গাড়ি, তেল-গ্যাস (ফ্র্যাকিং) এবং ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ কাজে লাগাচ্ছে।
বুধবার (১ জুলাই) রয়টার্সের এক প্রতিবেদন এ তথ্য দেয়।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা শিল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামরিক অভিযানের কারণে রকেট মোটরের চাহিদা অনেক বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রচলিত বড় প্রতিরক্ষা কম্পানিগুলোর পাশাপাশি নতুন স্টার্টআপগুলোও দ্রুত উৎপাদন ও কম খরচে অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলা পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য রকেটচালিত অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৫৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে এবং ক্রয় প্রক্রিয়াও সহজ করছে।
তবে বিশ্বের বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো—লকহিড মার্টিন, বোয়িং এবং আরটিএক্স—আগেই সতর্ক করেছে, রকেট মোটরের সংকটের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
গাড়ি ও তেল-গ্যাস শিল্পের যন্ত্রাংশ ব্যবহার
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ ক্যাস্টিলিওন ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা নিয়ন্ত্রণে গাড়ি শিল্পে ব্যবহৃত উন্নতমানের ইলেকট্রনিক চিপ ব্যবহার করছে। কম্পানিটির দাবি, এসব চিপ মহাকাশ শিল্পের সমমানের যন্ত্রাংশের তুলনায় প্রায় ১০ ভাগ দামে পাওয়া যায় এবং সংগ্রহ করতেও প্রায় ছয় গুণ কম সময় লাগে।
এ ছাড়া কম্পানিটি তেল ও গ্যাস শিল্পে ফ্র্যাকিংয়ের কাজে ব্যবহৃত উচ্চচাপ সহনশীল ধাতব পাইপ ব্যবহার করছে। এগুলো রকেট মোটরের প্রয়োজনীয় তাপ ও চাপ সহ্য করতে পারে, আবার দামও কম এবং সহজে পাওয়া যায়।
ওষুধ শিল্পের প্রযুক্তিতে রকেট জ্বালানি তৈরি
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আন্দুরিল রকেট মোটরের জ্বালানি তৈরিতে ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত বিশেষ ব্লেডবিহীন মিক্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই বড় পরিমাণ জ্বালানি মেশানো সম্ভব, যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। কম্পানির দাবি, এতে উৎপাদনক্ষমতা আগের তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি বেড়েছে।
থ্রিডি প্রিন্টিংয়ে উৎপাদনের সময় কমছে
রকেট মোটর তৈরিতে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে।
প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্থরপ গ্রুম্যান -এর এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রচলিত ধাতব যন্ত্রপাতির বদলে থ্রিডি প্রিন্টেড টুল ব্যবহার করলে নতুন উৎপাদন লাইন তৈরি করতে প্রায় এক বছরের বদলে মাত্র ছয় সপ্তাহ সময় লাগে।
নিউ মেক্সিকোভিত্তিক এক্স-বো সিস্টেমস থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে কম খরচে রকেট মোটর তৈরি করছে। কম্পানিটির দাবি, নতুন উৎপাদন লাইন স্থাপনের সময় তিন থেকে ছয় বছর থেকে কমে প্রায় এক বছরে নেমে এসেছে। ইতিমধ্যে তারা পেন্টাগনের কাছ থেকে ১৯১ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি পেয়েছে।
অন্যদিকে ফায়ারহক অ্যারোস্পেস জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তিতে রকেটের জ্বালানি তৈরির সময় ৬০ দিন থেকে কমে মাত্র ৭ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। এতে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় এক-দশমাংশ খরচে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি সম্ভব।
এখনো রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও রকেট মোটর উৎপাদনে এখনো কাস্টিং, কিউরিং, বেকিং, এক্স-রে পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো জটিল ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এ ছাড়া কিউরিং ওভেন ও এক্স-রে যন্ত্রপাতির সীমিত সংখ্যা এখনো উৎপাদন বাড়ানোর বড় বাধা।
এ ছাড়া স্টার্টআপগুলোর সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা। বর্তমানে তারা বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। পাশাপাশি পেন্টাগনের দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি না থাকায় নতুন কম্পানিগুলোর জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।