তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা পারিনি। সে জন্য অবশ্যই বিগত দিনের সরকারগুলোকে এর দায় বহন করা উচিত।’
সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডের তথ্য ভবনের ডিএফপি সম্মেলনকক্ষে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) আয়োজিত ‘বাকশালী শাসনে সংবাদপত্র বন্ধের কালো দিবস’ স্মরণে ও ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যে আয়নায় আমরা চেহারা দেখি, তা যত নিখুঁত হবে, তত বেশি পরিষ্কার চেহারা আমরা দেখতে পাব। গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। গণমাধ্যমকে অবশ্যই নিখুঁত হতে হবে। গণমাধ্যমকে নিখুঁত করে গড়ে তোলা ও নিখুঁত রাখার দায়িত্বও গণমাধ্যমকে পালন করতে হবে। একজন সংবাদপত্র পাঠক হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে, অতীতে এসংক্রান্ত যত যাবতীয় উদ্যোগ কিছুটা ছিল আংশিক। যেহেতু তা কখনো পূর্ণাঙ্গতা পায়নি এবং কোনো কাঠামোবদ্ধ হয়নি, সে কারণেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা পারিনি। অবশ্যই বিগত দিনের সরকারগুলোকে এর দায় বহন করা উচিত। বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা যাবে না।’
আরো পড়ুন
আল জাইদি সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতে ইরাকে মার্কিন দূত
তিনি বলেন, ‘অতীতে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে একটি প্রেস কমিশন গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু সেই কমিশনের রিপোর্ট ও সুপারিশ কখনো আলোর মুখ দেখেনি। তবে ওই ধরন মাথায় রেখেই সাবেক একজন বিজ্ঞ বিচারপতির নেতৃত্বে এই গণমাধ্যম কমিশন গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি।’
মন্ত্রী আরো বলেন, ‘এই কমিশনে তথ্য ও আইন মন্ত্রণালয়, ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল, সংবাদপত্রগুলোর বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিনিধি থাকতে পারেন। এই কমিশন মিডিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বাতলে দেবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর দায়িত্বশীলতার সীমারেখাও নির্ধারণ করবে। এই কমিশন নীতি, আইন ও কাঠামো প্রণয়ন করবে। এটি একদিকে যেমন গণমাধ্যমের পেশাগত ও বাণিজ্যিক উভয় দিকের বিকাশের ব্যবস্থা দেখাবে, অন্যদিকে ইথিক্যাল জার্নালিজমকে এগিয়ে নেবে, তেমনি মিডিয়া ও সাংবাদিকদের বিপথগামিতা এবং অপসাংবাদিকতার পথ বন্ধ করবে।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক মারুফ কামাল খান। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে গণতন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৬ জুন বাকশাল গঠনের পর মাত্র চারটি সরকারি পত্রিকা রেখে দেশের সব সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছিল, যা ছিল সাংবাদিকতার অপমৃত্যুর এক কালো অধ্যায়। পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন।’
সভাপতির বক্তব্যে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘মিডিয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা মানে নিজের মত প্রকাশ করতে পারা। কেউ দ্বিমত পোষণ করলে লেখার মাধ্যমে তার প্রতিবাদ হবে, কিন্তু কোনো শক্তি দিয়ে কণ্ঠরোধ করা যাবে না।’
আরো পড়ুন
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে দিল্লির বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখার ঘটনায় সংসদে ক্ষোভ
তিনি বলেন, ‘যারা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে কাজ করেছে এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো গণহত্যাকে মিডিয়ায় জায়েজ করার চেষ্টা করেছে, তাদের সঙ্গে কোনো আপস বা ঐক্যের সুযোগ নেই। বরং তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ বলেন, “জাতীয় প্রেস ক্লাব একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। যেটার মধ্যে কিন্তু সরকারের কোনো নজরদারি নেই। আওয়ামী শাসন আমলে প্রেস ক্লাব সব সময় বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। কোনো কিছু পায়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে নেওয়া হলো যে বঙ্গবন্ধু মিডিয়া কনফেস্ট করা হবে। এটি একটি প্রাইভেট ক্লাব। সরকারের টাকায় কিন্তু জাতীয় প্রেস ক্লাব চলে না। এক টাকা অনুমোদনও আমরা নিই না। আমাদের সহকর্মী মরহুম ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী আওয়ামী আমলের সেই বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কথামালার রাজনীতি’ সেটার কিন্তু আরো গবেষণা হওয়া উচিত। সেটার আরো এক্সটেনশন হওয়া উচিত। শেখ হাসিনার ১৭ বছরের যে মিথ্যাচার সেগুলো লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত। সেই সময়কার যে অন্ধকার দিকগুলো সেগুলো আমাদের নতুন প্রজন্মকে জানানোর জন্য প্রচুর গবেষণা হওয়া দরকার।”
তিনি বলেন, ‘আমাদের গণতন্ত্রের অভিযাত্রার বিরুদ্ধে, বিপুল ম্যান্ডেট পাওয়া নির্বাচিত সরকারকে নসাৎ করার জন্য ষড়যন্ত্র চলছে। দেশের ভেতরে ষড়যন্ত্র চলছে, দেশের বাইরে চলছে। সীমান্তে রক্ত ঝরছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্ন এবং ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে এখন আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়াটা খুবই দরকার।’
অনুষ্ঠানে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদারের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রেসসচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, ডিইউজের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম দিদার প্রমুখ।