সীমারেখার রাজনীতি
১. বাজেটের অঙ্ক, টাকার প্রশ্ন
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিঃসন্দেহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। সংখ্যার ভাষায় এটি এক মহাকাব্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো, কৃষি-প্রায় সবখানেই বরাদ্দ বেড়েছে। সরকারের বক্তব্য পরিষ্কার : মানুষকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের ধারাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। কাগজকলমে আপত্তি করার খুব বেশি কিছু নেই। শিক্ষায় বিনিয়োগ দরকার, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ দরকার, সামাজিক সুরক্ষা দরকার। একটি সুস্থ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ খুব কম।
কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রতি বছরই যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। টাকা কোথায়? আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই ব্যয়ের তালিকা সামনে আসে। কে কত পেল, কোন মন্ত্রণালয় কত বাড়তি বরাদ্দ পেল, কোন খাতে নতুন প্রকল্প হলো-এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে একটি অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে পড়েছে। আমরা ব্যয় নিয়ে ক্রমেই বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়েছি, কিন্তু আয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম বাস্তববাদী হয়েছি। অর্থনীতির মৌলিক সত্য হচ্ছে, রাষ্ট্র সম্পদ সৃষ্টি করে না; রাষ্ট্র সম্পদ সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে। সম্পদ সৃষ্টি করে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও বাজার। এ কারণেই বেসরকারি খাতের প্রশ্নটি আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামাজিক উন্নয়ন অবশ্যই উন্নয়ন, কিন্তু শুধু সামাজিক ব্যয় উন্নয়ন নয়। নতুন সম্পদ সৃষ্টি ছাড়া সামাজিক ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
একসময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল- ‘Money is no problem।’ বছরের পর বছর এই বাক্য নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কেউ বলেছেন এটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, কেউ বলেছেন অতিরিক্ত আশাবাদ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো এখন সত্যিই ‘Money।’ পরিকল্পনার অভাব নেই। প্রকল্পের অভাব নেই। স্বপ্নেরও অভাব নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পদ কোথায়?
তার ওপর কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। বাস্তববাদী অর্থনীতিবিদরা হয়তো বলবেন, কিছু অর্থ বাজারে ফিরবে। কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক বার্তাটি কী? যে নাগরিক নিয়ম মেনে কর দেন, আর যে বছরের পর বছর কর ফাঁকি দেন-রাষ্ট্র কি তাদের একই কাতারে দাঁড় করাবে? অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত শুধু টাকার বিষয় নয়। এটি আস্থার বিষয়। আর আস্থা একবার হারিয়ে গেলে তা বাজেট বক্তৃতা দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না।
২. কাঁটাতারের ওপারে
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অদ্ভুত দ্বৈধতা আছে। ঢাকায় বৈঠক হয়, দিল্লিতে করমর্দন হয়, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। তারপর সীমান্তে গিয়ে দেখা যায় অন্য এক বাস্তবতা। সাম্প্রতিক ‘পুশইন’ ইস্যু সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে বন্ধুত্বের ভাষা, অন্যদিকে সীমান্তে উত্তেজনা। এ যেন একই বইয়ের দুই বিপরীত অধ্যায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম জটিল সীমান্ত। একই ভাষা, একই ইতিহাস, একই সংস্কৃতি, একই নদী-কিন্তু মাঝখানে কাঁটাতার। অনেক সময় মনে হয়, সীমান্তের দুই পাশের মানুষ একই গল্পের দুই চরিত্র।
নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ একই আকাশের নিচে একই বেদনা অনুভব করে। কথাটি কূটনৈতিক শোনাতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে গভীর বাস্তবতা আছে। বর্ষার মেঘ পাসপোর্ট দেখে আসে না। নদীর পানি ভিসা নিয়ে প্রবাহিত হয় না। প্রকৃতির কোনো সীমান্ত নেই। সীমান্ত আছে রাষ্ট্রের। সেই কারণেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আবেগের চেয়ে বাস্তববাদ বেশি জরুরি। ভারত এখন ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্পের কথা বলছে। প্রযুক্তি, সেন্সর, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সব মিলিয়ে নতুন ধরনের সীমান্ত নিরাপত্তা।
প্রযুক্তি দরকার। কিন্তু প্রযুক্তি কখনো বিশ্বাসের বিকল্প নয়। ভালো প্রতিবেশী হতে হলে আগে একে অপরের সীমারেখাকে সম্মান করতে হয়। রবার্ট ফ্রস্টের বিখ্যাত কবিতার একটি লাইন আছে-Good fences make good neighbours. ভালো বেড়া কখনো শত্রুতা সৃষ্টি করে না। বরং ভুল বোঝাবুঝি কমায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও সম্ভবত এখন সেই বাস্তববাদী পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে আবেগের পাশাপাশি সীমারেখার গুরুত্বও সমানভাবে স্বীকৃত হবে।
৩. রাজনীতি : বক্তৃতা নয়, প্রতিষ্ঠান
রাজনীতির একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, আমরা প্রায়ই ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানকে গুলিয়ে ফেলি। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ সব সময়ই প্রবল। নেতা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে যান। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা ভিন্ন। একজন নেতা একটি নির্বাচন জিততে পারেন। কিন্তু একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রতিষ্ঠান। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও সেখানেই। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। এখন জনগণ শুধু বক্তৃতা শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়- বিদ্যুতের অবস্থা কী? বিনিয়োগ কোথায়? কর্মসংস্থান কত তৈরি হলো? বিচারব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আইনশৃঙ্খলা কতটা উন্নত হলো?
অর্থাৎ রাজনীতি এখন ধীরে ধীরে আবেগের পরীক্ষাগার থেকে প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষাগারে প্রবেশ করছে। এটি ভালো লক্ষণ। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ফলাফল। উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, রাজনীতিবিদ পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন, রাষ্ট্রনায়ক পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবেন। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জ। আমরা কি আগামী নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা করব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্য? এ প্রশ্নের উত্তরই আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।
৪. সীমারেখার দর্শন
আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন, কারও কাছাকাছি থাকা মানেই প্রভাবশালী হওয়া। কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রের আশপাশে ঘোরাফেরা করছেন, ছবি তুলছেন, নাম ব্যবহার করছেন-তাহলেই যেন তিনি ক্ষমতাবান। বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। প্রভাব আর প্রবেশাধিকার এক জিনিস নয়। প্রকৃত প্রভাব আসে বিশ্বাস থেকে। অনধিকার প্রবেশ থেকে নয়। আমাদের সময়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অনেকেই সমালোচনাকে পেশা বানিয়ে ফেলেছেন। তারা পরিবর্তন চান না, তারা মনোযোগ চান। বিশৃঙ্খলা তাদের জ্বালানি। প্রতিক্রিয়া তাদের অক্সিজেন। আর মনোযোগ তাদের মুদ্রা। এ কারণেই সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচক সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন। অনেক সময় তারা কেবল নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার ভয় পান।
একটি পুরোনো প্রবাদ আছে- ‘Never wrestle with a pig. You both get dirty, and the pig likes it.’ রাজনীতি, সমাজ, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও কথাটি প্রযোজ্য। যারা বিশৃঙ্খলার প্রতি আসক্ত, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র বিতর্ক নয়। সীমারেখা। কারণ কোনো পরিবার সীমারেখা ছাড়া টেকে না। কোনো প্রতিষ্ঠান সীমারেখা ছাড়া টেকে না। কোনো রাষ্ট্র সীমারেখা ছাড়া টেকে না। এমনকি গণতন্ত্রও সীমারেখার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আইনের সীমা ছাড়া স্বাধীনতা অরাজকতায় পরিণত হয়। ক্ষমতার সীমা ছাড়া নেতৃত্ব কর্তৃত্ববাদে পরিণত হয়। সম্পর্কের সীমা ছাড়া ভালোবাসা নির্ভরতায় পরিণত হয়। সীমারেখা নিষ্ঠুরতা নয়। সীমারেখা হলো শাসন।
শেষ কথা
এ সপ্তাহের চারটি ঘটনা-বাজেট, সীমান্ত, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা-একই গল্পের চারটি সংস্করণ। বাজেট আমাদের শিখিয়েছে সম্পদের সীমা আছে। সীমান্ত আমাদের শিখিয়েছে ভূখণ্ডের সীমা আছে। রাজনীতি আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমতার সীমা আছে। আর জীবন আমাদের শিখিয়েছে মানুষেরও সীমা আছে। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র নিজেদের সীমা ভুলে যায়। আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শক্তি অর্থ নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতাও নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ।
যে রাষ্ট্র নিজের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সমৃদ্ধ হয়। যে দেশ নিজের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে নিরাপদ থাকে। যে নেতা নিজের ক্ষমতার সীমা বোঝেন, তিনি দীর্ঘস্থায়ী হন। আর যে মানুষ নিজের জীবনের সীমারেখা আঁকতে পারেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই শান্তিতে থাকেন। কারণ সভ্যতার ইতিহাস মূলত একটিই গল্প বলে, স্বাধীনতা কখনো সীমারেখার বিপরীতে দাঁড়ায় না; স্বাধীনতা টিকে থাকে সীমারেখার ভিতরেই।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ




