• ই-পেপার

জাতীয় প্রতিরক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামরিক বাজেটের বাস্তবতা

সীমারেখার রাজনীতি

জিল্লুর রহমান
সীমারেখার রাজনীতি

সীমারেখার রাজনীতি

১. বাজেটের অঙ্ক, টাকার প্রশ্ন

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিঃসন্দেহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। সংখ্যার ভাষায় এটি এক মহাকাব্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো, কৃষি-প্রায় সবখানেই বরাদ্দ বেড়েছে। সরকারের বক্তব্য পরিষ্কার : মানুষকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের ধারাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। কাগজকলমে আপত্তি করার খুব বেশি কিছু নেই। শিক্ষায় বিনিয়োগ দরকার, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ দরকার, সামাজিক সুরক্ষা দরকার। একটি সুস্থ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ খুব কম।

কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রতি বছরই যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। টাকা কোথায়? আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই ব্যয়ের তালিকা সামনে আসে। কে কত পেল, কোন মন্ত্রণালয় কত বাড়তি বরাদ্দ পেল, কোন খাতে নতুন প্রকল্প হলো-এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে একটি অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে পড়েছে। আমরা ব্যয় নিয়ে ক্রমেই বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়েছি, কিন্তু আয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম বাস্তববাদী হয়েছি। অর্থনীতির মৌলিক সত্য হচ্ছে, রাষ্ট্র সম্পদ সৃষ্টি করে না; রাষ্ট্র সম্পদ সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে। সম্পদ সৃষ্টি করে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও বাজার। এ কারণেই বেসরকারি খাতের প্রশ্নটি আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামাজিক উন্নয়ন অবশ্যই উন্নয়ন, কিন্তু শুধু সামাজিক ব্যয় উন্নয়ন নয়। নতুন সম্পদ সৃষ্টি ছাড়া সামাজিক ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।

একসময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল- ‘Money is no problem।’ বছরের পর বছর এই বাক্য নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কেউ বলেছেন এটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, কেউ বলেছেন অতিরিক্ত আশাবাদ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো এখন সত্যিই ‘Money।’ পরিকল্পনার অভাব নেই। প্রকল্পের অভাব নেই। স্বপ্নেরও অভাব নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পদ কোথায়?

তার ওপর কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। বাস্তববাদী অর্থনীতিবিদরা হয়তো বলবেন, কিছু অর্থ বাজারে ফিরবে। কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক বার্তাটি কী? যে নাগরিক নিয়ম মেনে কর দেন, আর যে বছরের পর বছর কর ফাঁকি দেন-রাষ্ট্র কি তাদের একই কাতারে দাঁড় করাবে? অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত শুধু টাকার বিষয় নয়। এটি আস্থার বিষয়। আর আস্থা একবার হারিয়ে গেলে তা বাজেট বক্তৃতা দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না।

২. কাঁটাতারের ওপারে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অদ্ভুত দ্বৈধতা আছে। ঢাকায় বৈঠক হয়, দিল্লিতে করমর্দন হয়, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। তারপর সীমান্তে গিয়ে দেখা যায় অন্য এক বাস্তবতা। সাম্প্রতিক ‘পুশইন’ ইস্যু সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে বন্ধুত্বের ভাষা, অন্যদিকে সীমান্তে উত্তেজনা। এ যেন একই বইয়ের দুই বিপরীত অধ্যায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম জটিল সীমান্ত। একই ভাষা, একই ইতিহাস, একই সংস্কৃতি, একই নদী-কিন্তু মাঝখানে কাঁটাতার। অনেক সময় মনে হয়, সীমান্তের দুই পাশের মানুষ একই গল্পের দুই চরিত্র।

নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ একই আকাশের নিচে একই বেদনা অনুভব করে। কথাটি কূটনৈতিক শোনাতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে গভীর বাস্তবতা আছে। বর্ষার মেঘ পাসপোর্ট দেখে আসে না। নদীর পানি ভিসা নিয়ে প্রবাহিত হয় না। প্রকৃতির কোনো সীমান্ত নেই। সীমান্ত আছে রাষ্ট্রের। সেই কারণেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আবেগের চেয়ে বাস্তববাদ বেশি জরুরি। ভারত এখন ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্পের কথা বলছে। প্রযুক্তি, সেন্সর, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সব মিলিয়ে নতুন ধরনের সীমান্ত নিরাপত্তা।

প্রযুক্তি দরকার। কিন্তু প্রযুক্তি কখনো বিশ্বাসের বিকল্প নয়। ভালো প্রতিবেশী হতে হলে আগে একে অপরের সীমারেখাকে সম্মান করতে হয়। রবার্ট ফ্রস্টের বিখ্যাত কবিতার একটি লাইন আছে-Good fences make good neighbours. ভালো বেড়া কখনো শত্রুতা সৃষ্টি করে না। বরং ভুল বোঝাবুঝি কমায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও সম্ভবত এখন সেই বাস্তববাদী পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে আবেগের পাশাপাশি সীমারেখার গুরুত্বও সমানভাবে স্বীকৃত হবে।

৩. রাজনীতি : বক্তৃতা নয়, প্রতিষ্ঠান

রাজনীতির একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, আমরা প্রায়ই ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানকে গুলিয়ে ফেলি। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ সব সময়ই প্রবল। নেতা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে যান। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা ভিন্ন। একজন নেতা একটি নির্বাচন জিততে পারেন। কিন্তু একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রতিষ্ঠান। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও সেখানেই। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। এখন জনগণ শুধু বক্তৃতা শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়- বিদ্যুতের অবস্থা কী? বিনিয়োগ কোথায়? কর্মসংস্থান কত তৈরি হলো? বিচারব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আইনশৃঙ্খলা কতটা উন্নত হলো?

অর্থাৎ রাজনীতি এখন ধীরে ধীরে আবেগের পরীক্ষাগার থেকে প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষাগারে প্রবেশ করছে। এটি ভালো লক্ষণ। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ফলাফল। উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, রাজনীতিবিদ পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন, রাষ্ট্রনায়ক পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবেন। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জ। আমরা কি আগামী নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা করব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্য? এ প্রশ্নের উত্তরই আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।

৪. সীমারেখার দর্শন

আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন, কারও কাছাকাছি থাকা মানেই প্রভাবশালী হওয়া। কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রের আশপাশে ঘোরাফেরা করছেন, ছবি তুলছেন, নাম ব্যবহার করছেন-তাহলেই যেন তিনি ক্ষমতাবান। বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। প্রভাব আর প্রবেশাধিকার এক জিনিস নয়। প্রকৃত প্রভাব আসে বিশ্বাস থেকে। অনধিকার প্রবেশ থেকে নয়। আমাদের সময়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অনেকেই সমালোচনাকে পেশা বানিয়ে ফেলেছেন। তারা পরিবর্তন চান না, তারা মনোযোগ চান। বিশৃঙ্খলা তাদের জ্বালানি। প্রতিক্রিয়া তাদের অক্সিজেন। আর মনোযোগ তাদের মুদ্রা। এ কারণেই সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচক সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন। অনেক সময় তারা কেবল নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার ভয় পান।

একটি পুরোনো প্রবাদ আছে- ‘Never wrestle with a pig. You both get dirty, and the pig likes it.’ রাজনীতি, সমাজ, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও কথাটি প্রযোজ্য। যারা বিশৃঙ্খলার প্রতি আসক্ত, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র বিতর্ক নয়। সীমারেখা। কারণ কোনো পরিবার সীমারেখা ছাড়া টেকে না। কোনো প্রতিষ্ঠান সীমারেখা ছাড়া টেকে না। কোনো রাষ্ট্র সীমারেখা ছাড়া টেকে না। এমনকি গণতন্ত্রও সীমারেখার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আইনের সীমা ছাড়া স্বাধীনতা অরাজকতায় পরিণত হয়। ক্ষমতার সীমা ছাড়া নেতৃত্ব কর্তৃত্ববাদে পরিণত হয়। সম্পর্কের সীমা ছাড়া ভালোবাসা নির্ভরতায় পরিণত হয়। সীমারেখা নিষ্ঠুরতা নয়। সীমারেখা হলো শাসন।

শেষ কথা

এ সপ্তাহের চারটি ঘটনা-বাজেট, সীমান্ত, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা-একই গল্পের চারটি সংস্করণ। বাজেট আমাদের শিখিয়েছে সম্পদের সীমা আছে। সীমান্ত আমাদের শিখিয়েছে ভূখণ্ডের সীমা আছে। রাজনীতি আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমতার সীমা আছে। আর জীবন আমাদের শিখিয়েছে মানুষেরও সীমা আছে। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র নিজেদের সীমা ভুলে যায়। আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শক্তি অর্থ নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতাও নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ।

যে রাষ্ট্র নিজের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সমৃদ্ধ হয়। যে দেশ নিজের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে নিরাপদ থাকে। যে নেতা নিজের ক্ষমতার সীমা বোঝেন, তিনি দীর্ঘস্থায়ী হন। আর যে মানুষ নিজের জীবনের সীমারেখা আঁকতে পারেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই শান্তিতে থাকেন। কারণ সভ্যতার ইতিহাস মূলত একটিই গল্প বলে, স্বাধীনতা কখনো সীমারেখার বিপরীতে দাঁড়ায় না; স্বাধীনতা টিকে থাকে সীমারেখার ভিতরেই।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

সাহসী হোন—আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বার্ধক্য বরণ করুন

হাসান আলী
সাহসী হোন—আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বার্ধক্য বরণ করুন
সংগৃহীত ছবি

প্রতি বছর ১৫ জুন বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—বার্ধক্য কোনো দুর্বলতা নয়, জীবনের একটি স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়। অথচ বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেক প্রবীণ অবহেলা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হন। এই বাস্তবতা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি এটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তুলে ধরে—প্রবীণদের জন্য এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে তারা নিরাপদ, সম্মানিত এবং আত্মবিশ্বাসী জীবনযাপন করতে পারেন।

আমরা সবাই জানি, জন্মের পর শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে একদিন বার্ধক্য আসে। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু আমাদের সমাজে বার্ধক্যকে অনেক সময় ভয়, নির্ভরশীলতা কিংবা অসহায়ত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে অনেক মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। বাস্তবে বার্ধক্যকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; প্রয়োজন শুধু প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং আত্মবিশ্বাস।

বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে আগামী বছরগুলোতে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে। এই পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ আজ যারা তরুণ, তারাই আগামী দিনের প্রবীণ।
দুঃখজনকভাবে অনেক প্রবীণ আজ শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে বেশি ভোগেন মানসিক অবহেলা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায়। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামত উপেক্ষা করা হয়, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, কখনও কখনও তাঁদের বোঝা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। অনেক প্রবীণ একাকীত্ব, হতাশা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ এবং সামাজিক সম্পর্কের সংকোচন তাঁদের জীবনকে আরো কঠিন করে তোলে।

তবে এই চিত্রের পরিবর্তন সম্ভব। পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রবীণদের করুণা নয়, মর্যাদা দিতে হবে। তাঁদের দুর্বল নয়, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব প্রবীণদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে প্রবীণদেরও নিজেদের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। শারীরিক সুস্থতা রক্ষা, আর্থিক পরিকল্পনা, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা একটি সুন্দর বার্ধক্যের ভিত্তি। অবসরের পর জীবন থেমে যায় না; বরং এটি হতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন সম্পর্ক এবং নতুন অবদানের সময়। সমাজসেবা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা পরিবারের নতুন প্রজন্মকে পথ দেখানোর মাধ্যমে প্রবীণরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের শুধু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখায় না; এটি আমাদের শেখায় প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে। নির্যাতনমুক্ত বার্ধক্য নিশ্চিত করতে হলে পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতি ও সেবার সমন্বয় প্রয়োজন। প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ আজ সময়ের দাবি।

সবচেয়ে বড় কথা, বার্ধক্যকে ভয় নয়, গ্রহণ করতে শিখতে হবে। জীবনের প্রতিটি বয়সের যেমন সৌন্দর্য আছে, তেমনি বার্ধক্যেরও রয়েছে নিজস্ব মর্যাদা, প্রজ্ঞা এবং গভীরতা। বয়স বাড়া মানেই জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ।

এই বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবসে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি—প্রবীণদের প্রতি সম্মান দেখাব, তাঁদের অধিকার রক্ষা করব এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করব। একই সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুত হব। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার প্রবীণদের প্রতি আচরণে প্রতিফলিত হয়।

তাই আসুন, আমরা সবাই বলি—সাহসী হোন, আত্মবিশ্বাসের সাথে বার্ধক্য বরণ করুন। বার্ধক্য জীবনের শেষ অধ্যায় নয়; এটি প্রজ্ঞা, মর্যাদা এবং মানবিকতার এক অনন্য সময়।

লেখক : প্রবীণ বিষয়ক লেখক-সংগঠক

সম্পর্কের উত্থান-পতনেও বাংলাদেশের শক্ত উন্নয়ন অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
সম্পর্কের উত্থান-পতনেও বাংলাদেশের শক্ত উন্নয়ন অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাস স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পরবর্তী বছরগুলোতে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী ও মানবিক সহায়তাদাতা দেশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশকে সর্বাধিক উন্নয়ন সহায়তা (বিদেশি অনুদান ও ঋণ) প্রদানকারী দেশগুলোর তালিকা, পরিসংখ্যান ও সময়সীমার ওপর কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বিবেচনা করলে বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় স্থানটি দখল করে রেখেছে। আর প্রথম ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে, যথাক্রমে জাপান ও যুক্তরাজ্য। এখানে উল্লেখ্য, যদি দেশ নয়, বরং সব ধরনের দাতা সংস্থা (যেমন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে তালিকা ভিন্ন হবে এবং বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক শীর্ষ সহায়তাদাতাদের মধ্যে অন্যতম থাকবে। তবে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো এই যে এ দুটি ব্যাংকের সর্বাধিক তহবিলের জোগানদার আবারও সেই যুক্তরাষ্ট্র।

গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সহযোগিতা প্রদান করেছে। পরিসংখ্যান যাচাই করে দেখা যায়, ১৯৭১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন সরকার ১০ বিলিয়ন ডলারের অধিক সাহায্য বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন এবং সামাজিক খাতে প্রদান করেছে। এর মধ্যে ইউএসএইড একাই বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে খরচ করেছে ৮ বিলিয়ন ডলার আর ২ বিলিয়নের অধিক ডলার প্রদান করা হয়েছে অন্যান্য সহযোগিতা খাতে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খাদ্য সহায়তা, ত্রাণ, শরণার্থী পুনর্বাসন এবং বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগে জরুরি সহায়তা। মার্কিন সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এই সহায়তা গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উপযোগী অবদান রেখেছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দখলদার বাহিনী গণহত্যা, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে এক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন প্রশাসন ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণে পাকিস্তানের প্রতি সহায়তা বজায় রাখে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কূটনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং কংগ্রেসমেন বাঙালি শরণার্থীদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এ কারণে তৎকালীন মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রায় নব্বই থেকে একশত মিলয়ন ডলার মানবিক ত্রাণ সহায়তা ১৯৭১ সালে ভারতে অবস্থিত বাঙালি শরণার্থীদের জন্য প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল খাদ্যশস্য ও খাদ্য সহায়তা, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী, তাঁবু ও আশ্রয়সামগ্রী, শিশু পুষ্টি কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ। মূল্যস্ফীতি হিসাব করলে, ১৯৭১ সালের এই নব্বই থেকে একশত মিলয়ন ডলার সহায়তার বর্তমান মূল্যমান কয়েক শ মিলিয়ন ডলারের সমতুল্য।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে দেশকে পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এই সময় অবকাঠামো ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত এবং লাখ লাখ মানুষ ছিল বাস্তুচ্যুত। অবস্থা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন বাংলাদেশকে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করা শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে মার্কিন সরকার খাদ্য-শস্য, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী এবং জরুরি অন্যান্য ত্রাণ সহায়তা পাঠায়। এসব সহায়তা যুদ্ধ পরবর্তী দুর্ভোগ লাঘব এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে সমন্নয় করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ত্রাণ এবং অর্থনৈতিক সমর্থন বাংলাদেশের জুন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার বন্ধুপ্রতিম দেশ কিউবাকে সে দেশের ওপর মার্কিন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পাট জাতীয় পণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ খোদ মার্কিন সরকারকে নাখোশ করে আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পিএল ৪৮০-এর আওতায় বাংলাদেশকে বিনা মূল্যে গম সরবরাহ করার স্কিমটি যুক্তরাষ্ট্র বন্ধ করে দেয় হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মূল কারণগুলোর মধ্যে মার্কিন এই পদক্ষেপটি অন্যতম। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার এই ঘটনার জন্য দেশের অর্থমন্ত্রীকে বলির পাঁঠা বানিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে এবং বাংলাদেশ আমেরিকার রোষানল থেকে মুক্তি পায়। সেই ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয়, সে সময়ে মার্কিন সাহায্য বাংলাদেশের জন্য কতটা অপরিহার্য ছিল।
বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতির সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য সহায়তা এবং কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে সমর্থন করে। ইউএসএইডের মাধ্যমে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, উচ্চ ফলনশীল বীজ, সেচ ব্যবস্তা এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব উদ্যোগের ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। কৃষি, গবেষণা, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এই খাতগুলোতে গত পাঁচ দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুই থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের আর্থিক অনুদান ও কমডিটি সাহায্য এসেছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে মার্কিন সরকারের দীর্ঘদিনের ইতিবাচক সমর্থন এ খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ, পরিবার পরিকল্পনা এবং সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মসূচি সার্থক ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ ছাড়া যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে মার্কিন সহায়তায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়েও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিল। এই খাতে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার অনুদান পেয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন, শিক্ষার মান বৃদ্ধি, নারীর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে মার্কিন সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। বিভিন্ন বৃত্তি, একাডেমিক বিনিয়োগ কর্মসূচি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগের মাধ্যমে বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষক যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এখাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে গত পাঁচ দশকে ৫০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদান করেছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা প্রদান করে আসছে। দুর্যোগ পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের ভালো অবদান আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজন প্রকল্প, টেকসই কৃষি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচিতেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা প্রদান করছে। এসব উদ্যোগ জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সয়াহক হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সয়াহক দাতা দেশ নয়, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশিদারও বটে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটা বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে আসে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পোন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই সম্পর্ক ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা এবং বেসরকারি খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং আশ্রয়ব্যবস্তার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং এনজিওগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য অর্থ সহায়তা প্রদান করে চলেছে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, শান্তি রক্ষা কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা শক্তিশালী করতে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তাও প্রদান করা হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয়েছে।

দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিনিদের সরকারি নীতিকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগীতে পরিণত হয়েছে। মানবিক সহায়তা, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যস্থাপনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলাসহ বিভিন্ন অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমরা দেখতে পাই, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং এই অগ্রগতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আশা করা যায় ভবিষ্যতেও পারস্পরিক স্বার্থ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারি আরো অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

বাজেট : গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রত্যাশা

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
বাজেট : গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রত্যাশা

বিএনপি সরকার তাদের প্রথম প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯.৩৮ লাখ কোটি ডলারের ব্যয় বরাদ্দসংবলিত বিশাল এক বাজেট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। এই বিপুল অর্থের মধ্যে কর রাজস্ব থেকে ৬.০৪ ট্রিলিয়ন টাকা, ৯১ ট্রিলিয়ন টাকা আসবে করবহির্ভূত রাজস্ব থেকে। বাজেটের অবশিষ্ট ২.৪৩ ট্রিলিয়ন টাকার মধ্যে ১.৫৬ ট্রিলিয়ন টাকার উৎস বৈদেশিক ঋণ এবং ১.২৭ ট্রিলিয়ন টাকা আসবে বিভিন্ন দেশীয় উৎস থেকে। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩.১৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা পূর্ববর্তী উন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি।

যেকোনো সরকারের ঘোষিত বাজেট জনগণকে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রূপরেখা। নতুন রাজনৈতিক সরকারের ঘোষিত বাজেটেও তা প্রতিফলনের চেষ্টায় তারা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার তাদের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে : ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে অগ্রযাত্রা।’ জনগণের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য যা যা প্রয়োজন সবই বাজেটে রয়েছে। কোন সরকারের বাজেটে তা থাকে না? স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৫৫ বছর যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা দেশ গড়তে, জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন করতে একই ধরনের অর্থনৈতিক রূপরেখা দিয়েছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল অর্জিত হয়নি। এরশাদের স্বৈরশাসনমুক্ত বাংলাদেশ্বে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাংকের ওই সময়ের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডাইরেক্টর বাংলাদেশ্বের উন্নয়ন স্থবিরতার কারণ ব্যাখ্যা করে এক নিবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন, ‘উন্নয়ন কি চুইয়ে পড়ে?’ কথাটি তিনি রূপক অর্থে বললেও বাংলাদেশ্বের মন্থর উন্নয়নের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন আরেক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ভিয়েতনামের গতিশীল উন্নয়নের। ভিয়েতনাম বাংলাদেশ্বের স্বাধীনতা লাভের চার বছর পর নিজেদের দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে মুক্ত হয়ে দুই দশকের মধ্যে যেভাবে দেশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছিল, বাংলাদেশ তার ধারেকাছেও ছিল না। এখনো নেই। ভিয়েতনামের উন্নয়ন চুইয়ে পড়েনি। তারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পেছন ফিরে তাকায়নি।

উন্নয়ন আসলেও চুইয়ে পড়ে না। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যেতে যত আগ্রহী, ক্ষমতায় গিয়ে তারা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা অধিক জটিল। প্রতিশ্রুতি পূরণের চেয়ে তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে যেকোনোভাবে পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করা অথবা দুঃশাসনের মাধ্যমে ক্ষমতাকে দীর্ঘ বা স্থায়ী করার ফন্দিফিকির করা। দুঃশাসন যত প্রচণ্ড হয়, মানুষের ক্ষোভ তত বাড়ে। সরকার মানুষের ধূমায়মান ক্ষোভ প্রশমন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনের উপায় হিসেবে প্রয়োগ করে রাষ্ট্রীয় শক্তি। কিন্তু তাতে দেশ্বে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে না। বাংলাদেশ তার ৫৫ বছর সময়ের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে প্রতিটি শাসকের এমন আচরণ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ। অব্যাহত রাজনৈতিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণের দেশ্বে বিনিয়োগচিত্র হতাশাজনক হবে-এটাই স্বাভাবিক। দুঃশাসন অথবা দুর্বল শাসন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কাঠামোগত বাধার কারণে বাংলাদেশ্বে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ দুটোই নিরুৎসাহিত হয়েছে। বাংলাদেশ্বের উন্নয়নচিত্র সম্পর্কে তিন দশক আগে যে মন্তব্য করেছিলেন, এখনো বাংলাদেশ্বের উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) বাংলাদেশ ভিয়েতনামের কত পেছনে, তা উন্নয়নের বুলিতে মুখে ফেনা তোলা রাজনীতিবিদদের জানা উচিত। নীতিনির্ধারকদেরও জানা উচিত। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সাকল্যে ১.৫ বিলিয়ন ডলার এফডিআই আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল, যা ছিল জিডিপির মাত্র ০.৩৩ শতাংশ; অন্যদিকে ভিয়েতনাম এনেছিল এফডিআই ২০.২ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল তাদের জিডিপির ৪.২ শতাংশ। ২০২৪-এর পূর্ববর্তী ২৪ বছরে বাংলাদেশ্বে এফডিআই বৃদ্ধির পরিমাণ যেখানে ৫.৪ গুণ ছিল, ওই সময়ে ভিয়েতনামের বৃদ্ধি ছিল ১৫.৬ গুণ। ফেলে আসা এই ২৪ বছরের মধ্যে ১৮ বছরই ক্ষমতায় ছিল দেশ্বের স্বাধীনতার একচেটিয়া অধিকারী হওয়ার দাবিদার, মুক্তিযুদ্ধের সব কৃতিত্বের মালিক-মোক্তার ভারতে আশ্রিত শ্বেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থিত ১/১১-এর সরকার।

আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ এফডিআই দেশ্বে এসেছিল ২.৮৩ বিলিয়ন ডলার। আবারও যদি ভিয়েতনামের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, কেবল দুই বছরে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ভিয়েতনামে মোট ৩৮.৬৭ ডলার এফডিআই এসেছিল। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি বিনিয়োগকারী রবিন খুদা ভারতের ডেটা সেন্টার প্রকল্পের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির বিভিন্ন স্থানে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোষ্ঠিনামা বের করে তার সম্পর্কে কথাবার্তা বলা শুরু হয়েছে। কোনো ব্যক্তি তার জন্মভূমিতে হোক, অথবা অন্য কোনো দেশ্বে হোক, তিনি তো তার বিনিয়োগ থেকে নিরাপদে-নির্বিঘ্নে মুনাফা অর্জনের দিকটি আগে দেখবেন, দুনিয়ার কোথায় কোন ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী আছেন, যিনি এমন একটি দেশ্বে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন, যে দেশ্বে বিনিয়োগ করলে মুনাফা আহরণ তো দূরের কথা, রাজনৈতিক দলের নেতাদের মাসোহারা দিতে হয়, গুন্ডা-মাস্তানদের চা-পানির খরচ দিতে হয়, বিদ্যুৎ থাকে না, যখনতখন ধর্মঘটের কারণে বন্দরে যথাসময়ে উৎপাদিত পণ্য পৌঁছানো যায় না, এমনকি নিরাপত্তাবলয়ে ঘেরা গুলশান আবাসিক এলাকার হলি আর্টিজানের মতো অভিজাত রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে বেঘোরে বিদেশিদের প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটে? 

রবিন সাহেব যেহেতু বাংলাদেশ্বে জন্মগ্রহণ করেছেন, মাটির প্রতি তার টান থাকবে। দেশ্বে নিশ্চয়ই তার আত্মীয়স্বজনও আছেন এবং যেহেতু দেশ্বের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবও আছেন, এটাই স্বাভাবিক। তিনি বিদেশ্বে গিয়ে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি ও পরিশ্রমে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। বিভিন্ন দেশ্বে তার বিনিয়োগ থাকলেও এবং তিনি বাংলাদেশ্বে কোনো বিনিয়োগ না করে কেন ভারতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, এ ঘটনা দেখেও যদি বাংলাদেশ্বের বিনিয়োগ পরিস্থিতির ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের কোনো হুঁশ না হয়, তাহলে কার কি বলার থাকতে পারে? দেশপ্রেমে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি,’ অথবা ‘ও আমার দেশ্বের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ গাওয়া যায়, জীবনও দেওয়া যায়। কিন্তু নিজের অর্থ, এমনকি পিতার অর্থও অন্যের দ্বারা লুণ্ঠিত দেখতে চায় না। মানুষের এই চরিত্র সম্পর্কে হিব্রু বাইবেলে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কেউ তার পিতার ঘাতককে ক্ষমা করতে পারে, পিতার অর্থ আত্মসাৎকারীকে ক্ষমা করতে পারে না।’ অতএব রবিন খুদা যদি তার বিনিয়োগ নিরাপদ রাখতে চান, তা দোষণীয় বা নিন্দনীয় হতে পারে না। 

রবিন খুদা একমাত্র দৃষ্টান্ত নন। বিপুল বিত্তের মালিক বাংলাদেশি-আমেরিকান ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরীর বিনিয়োগ আছে ভারতসহ বহু দেশ্বে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তার ‘কেপিসি গ্রুপ’-এর বিনিয়োগের ক্ষেত্র পাওয়ার প্ল্যান্ট, বায়োটেকনোলজি, শিক্ষা, হাসপাতাল, হোটেল, রিয়েল এস্টেট, চা-বাগানসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃত। জন্মভূমি বাংলাদেশ্বেও বিনিয়োগ করতে গিয়েছিলেন এখন থেকে দশ বছর আগে, ‘সোনার বাংলা’ গড়ার কারিগরদের সরকারের আমলে। পূর্বাচলে ৬০ একর জমির ওপর ১৪২ তলাবিশিষ্ট ‘আইকনিক টাওয়ার’ এবং স্পোর্টস কমপ্লেক্সসহ আরও কিছু স্থাপনায় ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেশপ্রেমিক কালী বাবুর আশা পূরণ হয়নি। তিনি এক বুক হতাশা নিয়ে তার ‘ধনধান্য পুষ্পেভরা’ দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে বলেছেন, ‘দেশ্বে কিছু করতে চাই, তাই “আইকনিক টাওয়ার” করার ইচ্ছা। এই চেষ্টা করতে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক হয়রানির শিকার হয়েছি। বহুবার দেশ্বে গেছি, দেশ থেকে ফিরে এসেছি। জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি (তৎকালীন) ড. মোমেন, অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর আমি আশাবাদী যে আমার স্বপ্নের টাওয়ার বাংলাদেশ্বে নির্মিত হবে।’ বাংলাদেশকেন্দ্র্রিক আরও কিছু পরিকল্পনা ছিল ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরীর। কে জানে এখন তার পরিকল্পনাগুলো কী অবস্থায় আছে।

বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা পরিবেশ মূল্যায়ন ‘বি-রেডি (বিজনেস রেডি) সূচক ২০২৪’ অনুযায়ী ৫০টি দেশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ্বের স্থান ২৯তম এবং ‘বি-রেডি সূচক’-এর পূর্বসূরি বিশ্বব্যাংকের ‘ব্যবসা সহজীকরণ’ রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী ১৯০টি দেশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ্বের অবস্থান ১৬৮তম। যে দিকগুলো বিশ্লেষণ করে এই সূচকগুলো নির্ধারণ করা হয়, সেগুলো বাংলাদেশ্বে সুশাসনের অভাব, জনসেবার অনুপস্থিতি, নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামোর দুর্বলতা, বিনিয়োগের প্রতিকূল পরিবেশ্বেই সামনে আনে।

বিনিয়োগ পরিস্থিতির এই চিত্র থেকেও আমরা যদি আমাদের দেশ্বের অর্থনীতির চালচিত্র সম্পর্কে ধারণা না করতে পারি এবং পদ্মা সেতু, সুড়ঙ্গপথ, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ের মতো ব্যয়বহুল স্থাপনা দেখিয়ে জনগণকে বুঁদ করে রাখার চেষ্টা করি, তাতে ভালো কিছু হবে না। তা যে হয়নি, তা এসব মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী সরকারের দম্ভের ওপর নির্মিত কাচের প্রাসাদ অল্প আঘাতেই খান খান হয়ে যাওয়াই প্রমাণ। অতএব বাজেটে বর্তমান ব্যয় বরাদ্দের কয়েক গুণ বেশি বরাদ্দ করা হলেও দেশ অর্থনৈতিক দুরবস্থার যে খাদে পড়ে আছে, তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

এ পরিস্থিতি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। বিংশ শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর কবল থেকে এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। কিন্তু স্বাধীনতা কি সুখ নিশ্চিত করে? উন্নয়নের গ্যারান্টি দেয়? স্বাধীনতা একটি নীতি, নিজস্ব শাসনের অধিকার, মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা, আইনের শাসন লাভের অধিকার। কোনো স্বাধীন দেশ্বের প্রাথমিক দিনগুলোতে সব ক্ষেত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা কাটিয়ে ওঠা অনেক দেশ্বের জন্যই সহজ ছিল না। কারণ যারা সদ্য স্বাধীন দেশ্বের ক্ষমতায় আসীন হন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা থাকে না। স্বাধীন দেশ্বের সরকারের কাছে জনগণ যে পর্বতপ্রমাণ আশা করে, তারা তা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কার্যকর কাঠামোর অনুপস্থিতিতে সর্বস্তরে দুর্নীতি ও লুণ্ঠন নিত্যদিনের কর্মসূচিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশ্বের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। বিধ্বস্ত দেশ গড়তে, ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ এবং গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর ছাউনির ব্যবস্থা করতে সারা বিশ্ব থেকে যা আসছিল, তা হাওয়া হয়ে যাচ্ছিল। চুরিচামারি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অভিধা দিয়েছিলেন।  ওই সময় থেকে বাংলাদেশ পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো ভিন্ন আদলে তলাবিহীন ঝুড়িই রয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে যারাই যখন ক্ষমতায় এসেছে, তাদের একটি অংশ এবং তাদের আশ্রয়প্রশ্রয়ে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যাংকের অর্থ লুট, জাতীয় সম্পদ বিদেশ্বে পাচার করার মাধ্যমে দেশকে ফতুর করে ফেলেছে। এই প্রবণতা বন্ধ না করতে পারলে বছর বছর স্ফীত ব্যয় বরাদ্দসংবলিত বাজেট উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে? উন্নয়নের আবশ্যিক শর্ত হলো : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। এসব নিশ্চিত করার ওপরই দেশ পরিচালনার সাফল্য নির্ভর করে।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক