নতুন সরকারের প্রথম বাজেট কেবল একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয় বরং এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। তাই জনগণ এমন বাজেটকে কেবল সংখ্যার অঙ্কে বিচার করে না; বরং এটি মানুষের জীবন কতটা সহজ করবে, অর্থনীতিতে কতটা আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং রাষ্ট্রকে কতটা সুশাসনের পথে এগিয়ে নেবে তা-ও মূল্যায়ন করে।
বাজেট ঘোষণার পরপরই এ বিষয়ে আমি একটি মতামত লিখেছিলাম। তখনই বলেছিলাম, আমি অর্থনীতিবিদ নই। বাজেটের জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে একজন সচেতন নাগরিক, দীর্ঘদিনের সংবাদকর্মী এবং রাষ্ট্র-সমাজের নিবিড় পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার বাস্তব প্রভাব দিয়ে, অর্থনৈতিক পরিভাষা দিয়ে নয়।
মঙ্গলবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর সেই মূল্যায়নের সুযোগ আরো বিস্তৃত হয়েছে। কারণ এখন আমাদের সামনে কেবল একটি প্রস্তাব নয়, আলোচনা, সমালোচনা ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা পাওয়া একটি চূড়ান্ত বাজেট রয়েছে। আমার কাছে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় শক্তি এর আর্থিক আকার নয়; বরং জনমতের প্রতি সরকারের শ্রদ্ধা এবং যুক্তিসংগত সমালোচনাকে গ্রহণ করে নীতিগত সিদ্ধান্ত সংশোধনের রাজনৈতিক পরিপক্বতা।
বাজেট ঘোষণার পর অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে নানা মতামত উঠে এসেছে। একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্রে এটিই প্রত্যাশিত। আরও আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, সরকার সেই মতামতকে অগ্রাহ্য না করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করেছে।
জনগণের কথা শুনে নীতি সংশোধনের এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি শুভ লক্ষণ।
আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সম্পূর্ণ বাতিল করা। বহু বছর ধরে এই নীতি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে দুর্বল করেছে এবং সৎ করদাতাদের প্রতি এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। সেই বিতর্কিত অধ্যায়ের অবসান শুধু একটি করনীতির পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানেরও ঘোষণা। সুশাসন ও জবাবদিহিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের পথে এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ।
একইভাবে ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার বাস্তবতার প্রতিফলন। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই যুগে এমন বাধ্যবাধকতা সাধারণ মানুষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারত। সরকার সেই আশঙ্কা উপলব্ধি করেছে বলেই সিদ্ধান্তটি সংশোধন করেছে।
ক্ষুদ্র মুদি ব্যবসায়ীদের ওপর প্রস্তাবিত ভ্যাট প্রত্যাহারও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ত ভোক্তার জীবনযাত্রায়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ায় বাজারে অযথা চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা কমেছে।
করদাতাদের জন্যও এসেছে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি।
করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে এবং করের প্রথম ধাপের হার প্রত্যাহার করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এই সিদ্ধান্ত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের হাতে কিছু অতিরিক্ত অর্থ রাখবে, যা তাদের জীবনযাত্রার চাপ কমানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ও সচল রাখতে সহায়তা করতে পারে।
কর প্রশাসনেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সারা বছর অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ করদাতাদের ভোগান্তি কমাবে এবং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করবে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ডিজিটাল কর প্রশাসন শুধু সুবিধাই নয়, সুশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্কের সীমা চার লাখ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এতে ছোট সঞ্চয়কারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে নেওয়া উদ্যোগগুলোও বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা সহায়তা বৃদ্ধি, কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামে করছাড় প্রমাণ করে যে এই বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানবিক উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মাদক ও মদজাতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ শুধু রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঘোষিত নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।
তবে বাস্তবতাও মনে রাখতে হবে। কোনো বাজেট কেবল ঘোষণার মাধ্যমে সফল হয় না; এর সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করে কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। অতীতে আমরা অনেক উচ্চাভিলাষী বাজেট দেখেছি, কিন্তু দুর্বল বাস্তবায়ন, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে সেগুলোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে এই বাজেটেরও প্রকৃত মূল্যায়ন হবে আগামী এক বছরে—মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে, বিনিয়োগ কতটা বাড়ে, কর্মসংস্থান কতটা সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সহজ হয়।
সব দিক বিবেচনায় একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার মূল্যায়ন হলো, সাম্প্রতিক সময়ের বাজেটগুলোর মধ্যে এটি নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের স্বার্থকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে বিতর্কিত কয়েকটি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার মধ্য দিয়ে সরকার একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছে।
দেশ আজ নতুন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাজেট যদি সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহির সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি কেবল একটি অর্থবছরের আর্থিক পরিকল্পনা হয়ে থাকবে না; বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান, ন্যায়ভিত্তিক সুযোগ, কর্মসংস্থান এবং সুশাসনের বিস্তারে প্রতিফলিত হয়।
আমার বিশ্বাস, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কঠোর বাস্তবায়ন। কারণ বাজেটের প্রকৃত সাফল্য সংসদের করতালিতে নয়; নির্ধারিত হবে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্যে, শ্রমিকের কর্মসংস্থানে, উদ্যোক্তার বিনিয়োগের আস্থায় এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বস্তির নিঃশ্বাসে। সুতরাং সেই পরীক্ষায় সফল হতে পারলেই এই বাজেট ভবিষ্যতের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অভিযাত্রায় একটি স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল : [email protected]





