• ই-পেপার

জুলাই চেতনা বনাম জুলাই নিয়ে ব‍্যবসা

প্রধানমন্ত্রীর জাদুকরী সফর ও সমতার ভূরাজনীতি

মন্‌জুরুল ইসলাম
প্রধানমন্ত্রীর জাদুকরী সফর ও সমতার ভূরাজনীতি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের একটি ভিডিওতে ‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া পেজে প্রকাশিত ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে গানটি ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ এবং তাজিকিস্তানের পপশিল্পী মেহরনিগারি রুস্তম গানটির মূল কণ্ঠশিল্পী। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ওই বিশেষ ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়, যা বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের মেলবন্ধন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ভিডিওটির আবহে বাংলা গানের এই চমৎকার ফিউশনের কারণে নেটদুনিয়ায় এটি দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে। শুধু গান নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর সত্যি জাদুকরী একটি সিদ্ধান্ত। মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু করে চীন সফরের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর শেষ করেছেন। এটি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর সফর নয়, বাংলাদেশের সমতার ভূরাজনীতির প্রথম পদক্ষেপ। এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কী পেল, কেন তিনি মালয়েশিয়া ও চীন সফরে গেলেন এসব হিসাব যারা এখনই কষছেন, তাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তিনি তাঁর ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ ঘোষণা কীভাবে বাস্তবায়ন করছেন সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বর্তমান ভূরাজনীতি অতীতের সব সময়ের চেয়ে একটু ভিন্ন, একটু কৌশলী ও অনেকটা সাহসী। কোথায় কৌশলী হতে হবে আর কোথায় সাহসী হতে হবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিশ্চয় সেটা জানেন। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর জাদুকরী সফর এবং সমতার ভূরাজনীতির সফলতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে নতুন উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকবে এমনই প্রত্যাশা।

ভূরাজনীতি বা বিশ্বব্যবস্থা এখন ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা এখন বাস্তবতা। বৈশ্বিক নতুন রাজনীতির পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বে প্রতিটি দেশকে নতুন করে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই ভারসাম্যের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এখন কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা একটি দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগেরই প্রতিফলন।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু। শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং ইসলামি বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মরত, যারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সফরের মাধ্যমে যদি শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন হবে। তবে শ্রমবাজার নিয়ে এ নতুন সুযোগে আমাদের আরও প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু অদক্ষ শ্রমিক পাঠালে হবে না, দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে হবে। এজন্য যারা মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী, তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। যেসব সেক্টরে মালয়েশিয়া শ্রমশক্তি নেবে, সেসব সেক্টরে মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারি, তাহলে দেশ থেকে যারা কাজের জন্য বিদেশে যাবেন, তারা ভালো থাকবেন এবং বেশি অঙ্কে বৈদেশিক মুদ্রাও পাঠাতে পারবেন। তা না হলে যারা ঋণ করে বিদেশ যাওয়ার টাকা জোগাড় করেন, তাদের সেই ঋণ শোধ না হতেই ফেরত আসতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও দরিদ্র হবে। এজন্য  শ্রমশক্তি বিদেশে পাঠানোর সব সিন্ডিকেট কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। শুধু শ্রমবাজার নয়, মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল শিল্পোন্নত অর্থনীতি। প্রযুক্তি, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষায় দেশটির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে যৌথ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের শিল্পায়ন আরও গতি পেতে পারে।

অন্যদিকে চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, সেতু, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এই বিদ্যমান সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের প্রতিযোগিতা মূলত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হলে বাংলাদেশে নতুন শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যদি বিদেশি বিনিয়োগের একটি উপযুক্ত স্থান, গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তাহলে রপ্তানি বহুমুখীকরণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে কারণে ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এ সফরের গুরুত্ব অনেক বেশি।

বঙ্গোপসাগর এখন ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত এলাকা। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এ অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অবিবেচনাপ্রসূত কোনো প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে, নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে সেই বাস্তববাদী কূটনীতিরই প্রতিফলন ঘটেছে, যার মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো আঞ্চলিক সংযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং যোগাযোগ সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক লজিস্টিক ও ট্রানজিট হিসেবেও নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।

 

শুধু মালয়েশিয়া বা চীন নয়, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও তারেক রহমানের সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন নিরাপদ নতুন উৎপাদনস্থান খুঁজছে। বাংলাদেশের তরুণ জনশক্তি, বড় বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয়। সফরের মাধ্যমে যদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পায়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে। এ ছাড়া শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন খাতেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতের অর্থনীতি জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। তাই এসব খাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারি বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেটা হলো বর্তমান বিশ্বের সফল কূটনীতি কোনো একটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো নয়। বরং সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। বাংলাদেশ যদি চীন, মালয়েশিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সমানভাবে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশ সে পথেই হাঁটছে বলে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে। কারণ তারেক রহমানের প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হলে কখনো কৌশলী, কখনো উদার, আবার কখনো সাহসী পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন। এ সফরকে তাই কেবল আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সফল কূটনীতির প্রকৃত মূল্যায়ন অবশ্য হবে সফর-পরবর্তী সময়ে কত বিনিয়োগ এসেছে, কতগুলো সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়েছে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের মানুষ কতটা উপকৃত হয়েছে তার ওপর।

বর্তমান ভূরাজনীতির জটিল বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগানো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর যদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে বাস্তব অগ্রগতি এনে দেয়, তবে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় এমন বাস্তববাদী, অর্থনীতিকেন্দ্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই আগামী দিনের বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করে আনা একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উল্লেখ করেছেন। জবাবে সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার জন্য। আমি যে কাজটি করার চেষ্টা করেছি আমার অবস্থান থেকে, আমার দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা এবং সেই স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।  যদি ভালো কিছু অর্জন হয় এটি বাংলাদেশের অর্জন। এ সফরে দেশের মানুষের কোনো অর্জন হলে সেটি দেশের মানুষের অর্জন।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের অর্জনকে বাংলাদেশের ও দেশের মানুষের অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বক্তব্যে তিনি তাঁর বিনয় প্রকাশ করেছেন। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা বলেছেন। এখন লক্ষ রাখতে হবে, তাঁর এ সফরের সাফল্য যেন আমরা ঘরে তুলতে পারি। কোনো বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্রে অথবা অদক্ষতায় যদি আমরা দেশের স্বার্থ, মানুষের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হই, তাহলে দুঃখ করা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]

নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের শক্তি এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

আহসান হাবিব বরুন
নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের শক্তি এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট কেবল একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয় বরং এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। তাই জনগণ এমন বাজেটকে কেবল সংখ্যার অঙ্কে বিচার করে না; বরং এটি মানুষের জীবন কতটা সহজ করবে, অর্থনীতিতে কতটা আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং রাষ্ট্রকে কতটা সুশাসনের পথে এগিয়ে নেবে তা-ও মূল্যায়ন করে।

বাজেট ঘোষণার পরপরই এ বিষয়ে আমি একটি মতামত লিখেছিলাম। তখনই বলেছিলাম, আমি অর্থনীতিবিদ নই। বাজেটের জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে একজন সচেতন নাগরিক, দীর্ঘদিনের সংবাদকর্মী এবং রাষ্ট্র-সমাজের নিবিড় পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার বাস্তব প্রভাব দিয়ে, অর্থনৈতিক পরিভাষা দিয়ে নয়।

মঙ্গলবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর সেই মূল্যায়নের সুযোগ আরো বিস্তৃত হয়েছে। কারণ এখন আমাদের সামনে কেবল একটি প্রস্তাব নয়, আলোচনা, সমালোচনা ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা পাওয়া একটি চূড়ান্ত বাজেট রয়েছে। আমার কাছে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় শক্তি এর আর্থিক আকার নয়; বরং জনমতের প্রতি সরকারের শ্রদ্ধা এবং যুক্তিসংগত সমালোচনাকে গ্রহণ করে নীতিগত সিদ্ধান্ত সংশোধনের রাজনৈতিক পরিপক্বতা।

বাজেট ঘোষণার পর অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে নানা মতামত উঠে এসেছে। একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্রে এটিই প্রত্যাশিত। আরও আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, সরকার সেই মতামতকে অগ্রাহ্য না করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করেছে।

জনগণের কথা শুনে নীতি সংশোধনের এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি শুভ লক্ষণ।
আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সম্পূর্ণ বাতিল করা। বহু বছর ধরে এই নীতি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে দুর্বল করেছে এবং সৎ করদাতাদের প্রতি এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। সেই বিতর্কিত অধ্যায়ের অবসান শুধু একটি করনীতির পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানেরও ঘোষণা। সুশাসন ও জবাবদিহিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের পথে এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ।

একইভাবে ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার বাস্তবতার প্রতিফলন। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই যুগে এমন বাধ্যবাধকতা সাধারণ মানুষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারত। সরকার সেই আশঙ্কা উপলব্ধি করেছে বলেই সিদ্ধান্তটি সংশোধন করেছে।

ক্ষুদ্র মুদি ব্যবসায়ীদের ওপর প্রস্তাবিত ভ্যাট প্রত্যাহারও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ত ভোক্তার জীবনযাত্রায়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ায় বাজারে অযথা চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা কমেছে।
করদাতাদের জন্যও এসেছে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি।

করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে এবং করের প্রথম ধাপের হার প্রত্যাহার করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এই সিদ্ধান্ত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের হাতে কিছু অতিরিক্ত অর্থ রাখবে, যা তাদের জীবনযাত্রার চাপ কমানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ও সচল রাখতে সহায়তা করতে পারে।

কর প্রশাসনেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সারা বছর অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ করদাতাদের ভোগান্তি কমাবে এবং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করবে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ডিজিটাল কর প্রশাসন শুধু সুবিধাই নয়, সুশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্কের সীমা চার লাখ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এতে ছোট সঞ্চয়কারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে নেওয়া উদ্যোগগুলোও বিশেষভাবে প্রশংসার দাবিদার। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা সহায়তা বৃদ্ধি, কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামে করছাড় প্রমাণ করে যে এই বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানবিক উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে মাদক ও মদজাতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ শুধু রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঘোষিত নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে। 

তবে বাস্তবতাও মনে রাখতে হবে। কোনো বাজেট কেবল ঘোষণার মাধ্যমে সফল হয় না; এর সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করে কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। অতীতে আমরা অনেক উচ্চাভিলাষী বাজেট দেখেছি, কিন্তু দুর্বল বাস্তবায়ন, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে সেগুলোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে এই বাজেটেরও প্রকৃত মূল্যায়ন হবে আগামী এক বছরে—মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে, বিনিয়োগ কতটা বাড়ে, কর্মসংস্থান কতটা সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সহজ হয়।

সব দিক বিবেচনায় একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার মূল্যায়ন হলো, সাম্প্রতিক সময়ের বাজেটগুলোর মধ্যে এটি নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের স্বার্থকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে বিতর্কিত কয়েকটি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার মধ্য দিয়ে সরকার একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছে।

দেশ আজ নতুন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাজেট যদি সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহির সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি কেবল একটি অর্থবছরের আর্থিক পরিকল্পনা হয়ে থাকবে না; বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান, ন্যায়ভিত্তিক সুযোগ, কর্মসংস্থান এবং সুশাসনের বিস্তারে প্রতিফলিত হয়।

আমার বিশ্বাস, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কঠোর বাস্তবায়ন। কারণ বাজেটের প্রকৃত সাফল্য সংসদের করতালিতে নয়; নির্ধারিত হবে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্যে, শ্রমিকের কর্মসংস্থানে, উদ্যোক্তার বিনিয়োগের আস্থায় এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বস্তির নিঃশ্বাসে। সুতরাং সেই পরীক্ষায় সফল হতে পারলেই এই বাজেট ভবিষ্যতের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অভিযাত্রায় একটি স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
ই-মেইল : [email protected]

জামায়াতের রাজনৈতিক হতাশা ও অর্থনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জামায়াতের রাজনৈতিক হতাশা ও অর্থনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা
সংগৃহীত ছবি

কোনো দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য জনগণ এ সরকারকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে।

তবে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি কর্মবাজারে প্রবেশ করতে যাওয়া লাখো তরুণ-তরুণীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট সেই লক্ষ্যকেই প্রতিফলিত করে। ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে সরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়নকে উৎসাহিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত এ বাজেট টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।

বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), ফ্রিল্যান্সার, নারী উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি শুধু শিল্পায়নের ওপর নয়, বরং উদ্ভাবন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং উদ্যোক্তা বিকাশের ওপরও নির্ভরশীল।

তবে শুধু রাজস্ব বা আর্থিক নীতির ওপর নির্ভর করে এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক সূচকের ওপর নির্ভর করে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত না হওয়ার নিশ্চয়তাও বিনিয়োগকারীদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসন শেষে নতুন সরকার একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। ওই সময়ে ব্যাপক মব সহিংসতা, লাগামহীন চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ এবং প্রভাবশালী উপদেষ্টাদের অবৈধ দাবি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

শ্রমিক অসন্তোষ, তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে আরও ক্ষুণ্ন করেছে। এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি—বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াত—বর্তমানে দেশের সামনে থাকা অর্থনৈতিক সংকটের জন্য উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দায়ী বলে এ দৃষ্টিভঙ্গিতে মনে করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে একই রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রাজপথে আন্দোলনের আহ্বান নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংঘাত নয়; বরং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। তাদের যুক্তি, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা সরকারের বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।

কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কৌশলের অংশ হতে পারে। তারা ফুটবল সমর্থকদের বিরোধকে ঘিরে আইএসআইএস বা আল-কায়েদার পতাকার আদলে তৈরি ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শনের ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, এসব ঘটনার উদ্দেশ্য সমাজে বিভাজন গভীর করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো।

কিছু বিশ্লেষকের অভিযোগ, জামায়াত উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত কিছু ব্যক্তিকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কয়েকটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত করতে উৎসাহিত করেছে, যাতে দলটি সরাসরি রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যেতে পারে। তবে এসব অভিযোগ সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন এবং সেগুলোর সত্যতা অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাই হোক না কেন, একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—বাংলাদেশ আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অতিক্রম করার সামর্থ্য রাখে না। দেশের বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতা ও নীতিগত নিশ্চয়তা চান। উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন আস্থার পরিবেশ, আর তরুণদের প্রয়োজন সংঘাত নয়, কর্মসংস্থান। একইভাবে শ্রমিকরাও শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে লাভবান হন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে নয়।

স্বার্থান্বেষী মহলের প্রতিটি রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর মূল্য পরিশোধ করতে হয় সাধারণ মানুষকেই। আরো দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে আধুনিকীকরণের বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরো শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এসব উদ্যোগ সফল হলে অনেক শ্রমিক স্বল্প-দক্ষ শ্রম থেকে অধিক উৎপাদনশীল ও দক্ষ পেশায় স্থানান্তরের সুযোগ পাবেন। এর ফলে যেমন পারিবারিক আয় বাড়বে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে।

রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বিরোধী দলগুলোর শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি নীতির সমালোচনা এবং জনমত গড়ে তোলার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনোই জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের বিনিময়ে না হয়। যেসব কর্মকাণ্ড ব্যবসায়িক আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে, বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে কিংবা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেগুলো রাজনৈতিক আনুগত্য নির্বিশেষে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সংঘাতের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগের সফল বাস্তবায়ন কেবল সরকারের অর্থনৈতিক নীতির ওপর নির্ভর করবে না; বরং দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্বশীল আচরণ, আইন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতার ওপরও নির্ভর করবে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি না করে। কারণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।

সর্বোপরি, টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আইনের শাসন এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ—এই চারটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হয় এবং জাতীয় স্বার্থকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তার ওপর।

ইউনূস, ইয়াজিদ ও হোসাইনি ব্রাহ্মণ

সুমন পালিত
ইউনূস, ইয়াজিদ ও হোসাইনি ব্রাহ্মণ

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী ছিল গত ২৮ জুন। তার আগের দিনটি ছিল ১০ মহররম। ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার লেলিয়ে দেওয়া বাহিনীর হাতে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় নাতি হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারপরিজন ও অনুসারীদের শাহাদতবরণের দিন। আহলে বায়াত বা নবী বংশ নিধন শুধু নয়, পবিত্র কাবাঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগও করে ইয়াজিদের শিষ্যরা। হজরত আলী (রা.)-এর বংশধর বা আহলে বায়াতের বিরুদ্ধে ৫৯ বছর ধরে জুমার খুতবায় অভিশাপ দেওয়ার বিধান জারি রাখে উমাইয়া শাসকরা। রসুল (সা.)-এর খেজুরবাগানও তাঁর পরিবারের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার ধৃষ্টতা দেখায় তারা।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ায় সক্রিয় সংগঠনের নাম ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। যারা বাংলাদেশকে পাঁচবার বিশ্বসেরা দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ সংগঠনের বাংলাদেশ শাখা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংক্ষেপে টিআইবি। টিআইবি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নোবেল লরিয়েট ড. ইউনূসের ৮৬তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে এক প্রতিবেদনে যে তথ্য হাজির করেছে তা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেওয়ার মতো। প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘুষের লেনদেন আগের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ইউনূসী ‘সুশাসনে’ দেশে ঘুষ লেনদেন হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা।

বলা হতো, আওয়ামী লীগ আর দুর্নীতি সমার্থক কথা। আওয়ামী আমলে দেশ দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। কিন্তু ইউনূসের মতো সাধুসজ্জনের আমলে দুর্নীতি বাড়ে কীভাবে? ঘুষের লেনদেন বছর না ঘুরতেই ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া তো কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। সবারই জানা সংস্কারের ডুগডুগি বাজিয়ে ক্ষমতায় বসে ইউনূস সরকার। অথচ পুরোটা সময় নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল তারা। আওয়ামী আমলে বছরে ঘুষের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা অন্তর্বর্তী আমলে তা বেড়ে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছে।

ইউনূসী আমলে ‘এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই’ বাংলা প্রবাদকে সর্বস্তরে নীতিবাক্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। দুনিয়াজুড়ে ইহুদিদের পরিচিতি কুসিদজীবী হিসেবে। বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে খাতাকলমে একজনও ইহুদি নেই। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কোনো আদমশুমারিতে কেউ নিজেকে ইহুদি বলে দাবি করেনি। তবে এ দেশে শত বছর আগেও ছিল অসংখ্য কুসিদজীবী। বাঙালি কৃষকের বেশির ভাগই ছিল মহাজন নামের নিষ্ঠুর শোষকদের জালে বাঁধা। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আমাদের পূর্বপুরুষদের সুদখোর নব্য ইহুদিদের হাত থেকে বাঁচাতে ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করেন। মহাজনদের গোলামি থেকে মুক্তি পায় লাখ লাখ মানুষ। যে মহান নেতার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী প্রশাসন। আপদমস্তক সুশীল সরকার। নিজেদের সততার প্রতিবিম্ব প্রমাণে তারা ছিল সর্বদাই সোচ্চার। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের মতো ইউনূসী আমলেও সুশীলদের আসল চেহারা স্পষ্ট হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে ঘুষের লেনদেন কমার বদলে হু হু করে বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সুযোগে যে সজ্জনবেশি অন্তর্বর্তী সরকার জাতির ঘাড়ে চেপে বসে তারা আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তারা মবতন্ত্রকে প্রশ্রয় দেয়। লুটপাটের মাত্রায় দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। ইতোমধ্যে টিআইবির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে। যা তদন্ত হওয়া দরকার।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও অর্থ পাচারের তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ওপর দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তের নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। বলেছেন, তদন্ত প্রতিবেদন জাতির সামনে প্রকাশ করাও উচিত।

শুধু ঘুষ লেনদেন নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টারা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির যে রেকর্ড গড়েছেন তার কোনো তুলনা নেই। ১৮ মাসে ধর্ম উপদেষ্টা ৮২ লাখ টাকা উড়িয়েছেন চিকিৎসা খাতে। উপদেষ্টাদের অনেকেই এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলেন না। প্রধান উপদেষ্টা নিজের ট্যাক্স মওকুফ ও ব্যবসা বাগানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন ১৮ মাস। যার তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

॥ দুই ॥

ইসরায়েলের আপত্তি সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে মহররম মাসে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে আমেরিকা। ইরানিদের দাবি তারা প্রমাণ করেছে ইমানের জোর থাকলে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়। প্রশ্ন উঠেছে এ চুক্তি কি ইসরায়েলের পতনের আলামত? ধর যাক মোঙ্গলদের কথা। চীনের পাশের দেশ মোঙ্গলিয়া। ইতিহাসে যে দেশের অধিবাসীদের পরিচয় মোঙ্গল নামে । একসময় মোঙ্গলরা ছিল সারা দুনিয়ার ত্রাস। চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে দুনিয়ার এক বড় অংশ তাদের পদানত হয়। এশিয়া ও ইউরোপের ২ কোটি ৮০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠে মোঙ্গল সাম্রাজ্য। চেঙ্গিস বাহিনীর পদানত হয় বিশাল চীনা সাম্রাজ্য। আব্বাসীয় খেলাফতের পতনও ঘটে মোঙ্গলদের হাতে। চেঙ্গিস খানের পৌত্র হালাকু খান আব্বাসীয়দের রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করেন। দুই মাস পর খলিফা মুস্তাসিম নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার আশ্বাসে আত্মসমর্পণে রাজি হন। হালাকু খান তার বাহিনী নিয়ে বাগদাদে প্রবেশ করেই রক্তের বন্যা বইয়ে দেন। লাখো মানুষ প্রাণ হারায় মোঙ্গলদের হাতে। রক্ষা পাননি খলিফা এবং তাঁর পরিবারপরিজনরা। হালাকু বাহিনীর হাতে বিধ্বস্ত হয় দুনিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরী বাগদাদ। মোঙ্গলদের সে দাপটও চিরস্থায়ী হয়নি। একসময় তাদের পতন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। যে চীন ছিল মোঙ্গলদের পদানত, সে মোঙ্গলরা আজ নিজেরাই অসহায়।  

আধুনিক যুগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছিল দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। বলা হতো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য ডোবে না। আমেরিকাও ছিল মাত্র আড়াই শ বছর আগে ব্রিটিশ উপনিবেশ। চীনকে তারা দাবিয়ে রেখেছিল আফিমের নেশায়। নেপাল ও আফগানিস্তান বাদে পুরো দক্ষিণ এশিয়া ছিল ব্রিটিশদের অধীনে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধের পর পরাশক্তি হিসেবে ব্রিটিশদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে এখন তারা অনেক সাবেক উপনিবেশের চেয়েও পিছিয়ে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে জার্মানি ও জাপান। হিটলারের জার্মানির দখলে চলে যায় ইউরোপের একের পর এক দেশ। ফ্রান্সসহ ইউরোপের এক বড় অংশ দখল করে তারা পা বাড়ায় রাশিয়ার দিকে। বিশাল রাশিয়ার বড় অংশও তারা দখল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু জার্মানির শেষ রক্ষা হয়নি। রাশিয়ার শীতের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় জার্মান বাহিনী। তাদের পতনও নিশ্চিত হয়।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপান হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য শক্তি। চীন, কোরিয়া, মিয়ানমার দখল করে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকেও হাত বাড়ায়। আমেরিকাও তটস্থ ছিল জাপানিদের ভয়ে। কিন্তু একদিকে জার্মানির পতন, অন্যদিকে হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরী আমেরিকার আণবিক বোমার আঘাতে ভস্মীভূত হওয়ার পর জাপান আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

ইতিহাস প্রমাণ করে কোনো সাম্রাজ্য বা কোনো দেশের দাপট চিরস্থায়ী নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলোর মদতে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আরব দেশগুলো তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সে যুদ্ধে পরাজিত হয় আরব দেশগুলো। পরবর্তী সময়ে আরও তিনটি যুদ্ধে ইসরায়েল জয়ী হয়। একমাত্র ইরানের কাছেই তারা এ যাবৎ সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে হামলা চালিয়েও তারা ইরানকে পরাস্ত করতে পারেনি। এটি ইসরায়েলের ইহুদিবাদী শাসকদের জন্য দুঃসংবাদ বলেও বিবেচিত হচ্ছে। ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইলান পাপ্পে দাবি করেছেন, ইহুদিবাদী মতাদর্শ এখন তার অস্তিত্বের সংকটময় এক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এটি পতনের ঠিক আগে শেষ ধাপে অবস্থান করছে। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইহুদিবাদ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এবং বৈশ্বিক জনমতের পরিবর্তন এসব বিষয় ইহুদিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। ইলান পাপ্পে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলন ও সংহতি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইহুদিবাদী প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় কমছে বলে তিনি মনে করেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পরিবর্তন ইহুদিবাদের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তাই তিনি বিশ্বাস করেন, মতাদর্শটি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শেষ পর্যন্ত এর পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

পাদটীকা : কারবালায় নবী বংশের ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল যারা, তারাও নিজেদের মুসলমান বলেই দাবি করত। ইয়াজিদ বাহিনীর ভয়ে সেদিন নবী দৌহিত্র হোসাইন (রা.)-এর পাশে কুফা বা ধারেকাছের কেউ দাঁড়ায়নি। তবে হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গে যোগ দিতে ছুটে গিয়েছিল একদল ব্রাহ্মণ। প্রচলিত এক কাহিনি অনুযায়ী বেলুচিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলে রাহিব দত্ত নামের এক ব্রাহ্মণ সেনানায়ক ছিলেন। তিনি হোসাইন (রা.)-এর পক্ষে লড়াইয়ের জন্য নিজের সাত সন্তানকে নিয়ে ছুটে যান। পুত্ররা সবাই ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নিহত হন। রাহিব দত্ত বেঁচে ফিরে আসেন ভাগ্যগুণে। পরাজিত হোসাইন পরিবারের সঙ্গে যখন দেখা হয় রাহিব দত্তের, তখন হোসাইন (রা.)-এর বোন এই অমুসলিমের আত্মত্যাগে আপ্লুত হয়ে তাঁকে ‘হোসাইনি ব্রাহ্মণ’ বলে অভিহিত করেন। দ্বিতীয় কাহিনিতে বলা হয়, কারবালার যুদ্ধের সময় বাগদাদের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় তখনো বেশ কিছু ব্রাহ্মণ বসবাস করতেন। রাহিব দত্ত তাঁদেরই একজন। ইমাম হোসাইন (রা.) কারবালার অসম যুদ্ধে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো করে যাঁকে পেয়েছেন দূত পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছেন। রাহিব দত্ত সেই ডাকে সাড়া দেন। এই কাহিনির বাস্তবতা কিছুটা মেনে নেওয়া যায়। রাহিব দত্ত বেলুচিস্তান থেকে সেই কারবালার ইমাম হোসাইনের কথা জানবেন ১৪০০ বছর আগের সেই যুগে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং বাগদাদে পৌত্তলিকদের সামান্য কিছু তখনো অবশিষ্ট ছিল সেটি মানা যায়। দ্বিতীয় প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী রাহিব দত্ত পরে বেলুচিস্তান বা পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম অংশে পালিয়ে আসেন। বর্তমান হোসাইনি ব্রাহ্মণ আসলে তাঁর বংশধর। ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরে এখনো হোসাইনি ব্রাহ্মণদের বসবাস রয়েছে। মহররমের সময় তাঁরা হোসাইনের জন্য শোকও পালন করেন। স্মর্তব্য ভারতের সাবেক মন্ত্রী খ্যাতনামা অভিনেতা সুনীল দত্ত ও তাঁর পুত্র অভিনেতা সঞ্জয় দত্ত-ও হোসাইনি ব্রাহ্মণ।

লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

ইমেইল : [email protected]