• ই-পেপার

জগৎজুড়ে মনুষ্যত্বের সংকট

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণ কী?

আহসান হাবিব বরুন
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণ কী?
সংগৃহীত ছবি

উত্তরবঙ্গের এক কৃষক ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আকাশের দিকে তাকান। বৃষ্টি হবে কি হবে না—এই প্রশ্নই যেন তার ভাগ্য নির্ধারণ করে। অথচ তার গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে তিস্তা নদী। বর্ষাকালে যে নদী উন্মত্ত হয়ে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সেই নদীই শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় সরু জলধারায়। নদী আছে, কিন্তু পানি নেই, সেচের জমি আছে, কিন্তু ফসল নেই, মানুষের শ্রম আছে, কিন্তু উৎপাদনের নিশ্চয়তা নেই। তিস্তার এই বৈপরীত্য আজ শুধু একটি নদীর সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ, কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের প্রকাশ্য সমর্থন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বেইজিং স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি এটি কেবল একটি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প হয়, তবে ভারত কেন উদ্বিগ্ন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে তিস্তার গুরুত্ব বুঝতে হবে। তিস্তা বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তঃসীমান্ত নদী। ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একসময় এই নদী উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং জীববৈচিত্র্যের প্রাণ ছিল। কিন্তু উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। অনেক সময় তিস্তায় পানির প্রবাহ এমন পর্যায়ে নেমে আসে যে নদীর বুকে মানুষ হেঁটে পারাপার করে।

বাংলাদেশের প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তিস্তা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তিস্তার পানির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু পানির অভাবে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ ব্যাহত হয়। কৃষকের উৎপাদন কমে, আয় কমে, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং অনেক পরিবার দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে।

অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ও আকস্মিক বন্যা ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে। অর্থাৎ তিস্তা এখন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে খরা ও বন্যার নদী।

এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের ধারণা আসে। নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন—এসবই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদীভাঙন হ্রাস এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু প্রকল্পটি যখন চীনের সহযোগিতায় এগোতে শুরু করল, তখনই ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

ভারতের উদ্বেগের প্রধান কারণ কেবল পানি নয়, ভূরাজনীতি। তিস্তা অববাহিকার অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি। এই করিডর, যা "চিকেনস নেক" নামেও পরিচিত, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থল সংযোগ। মাত্র কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, যদি চীন তিস্তা প্রকল্পে বড় আকারে যুক্ত হয়, তবে তারা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলে প্রযুক্তিগত, প্রকৌশলগত কিংবা অবকাঠামোগত উপস্থিতি তৈরি করতে পারে। যদিও চীন বলছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ উন্নয়নমূলক এবং কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, তবু ভারত এটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

এই উদ্বেগ পুরোপুরি নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, বন্দর উন্নয়ন, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ ভারতের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিষয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নের জন্য যে দেশের কাছ থেকে সবচেয়ে উপযোগী সহযোগিতা পাওয়া যাবে, সেই সহযোগিতা গ্রহণ করার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতাকে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি বানানো উচিত নয়।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে যে—তিস্তার মূল সমস্যা কি অবকাঠামো, নাকি পানির ন্যায্য হিস্যা? বাস্তবতা হলো, নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প যত উন্নতই হোক না কেন, যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না আসে, তবে প্রকল্পের সুফল সীমিত হয়ে যাবে। তাই তিস্তা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি বহু বছর ধরে ঝুলে আছে। ২০১১ সালে একটি সম্ভাব্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতি আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার, অন্য রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা, তথ্য বিনিময়, পূর্বপরামর্শ, এবং সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তঃসীমান্ত জলপ্রবাহ বিষয়ক কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের বিভিন্ন নীতিমালায় এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও সব দেশ এসব চুক্তির পক্ষ নয়, তবুও নীতিগুলো আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়।

তিস্তার ক্ষেত্রেও এই নীতিগুলোর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। কারণ একটি আন্তঃসীমান্ত নদীকে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে ভাটির দেশের কৃষি, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের জীবন-জীবিকায় গভীর প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য তিস্তা কেবল পানির উৎস নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তারও একটি বড় ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে, তখন সেচনির্ভর কৃষির গুরুত্ব আরও বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে পানি সংকট দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। কৃষি থেকে আয় কমে গেলে গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরমুখী হয়। এতে শহরে কর্মসংস্থান, আবাসন এবং সামাজিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ তিস্তার পানি সংকট কেবল একটি নদীর সমস্যা নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।

চীনের অংশগ্রহণকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ তাই একদিকে যেমন নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, অন্যদিকে বাংলাদেশের উদ্বেগ জীবিকা ও উন্নয়নকেন্দ্রিক। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশেরও উচিত বিষয়টিকে আবেগ নয়, কৌশল দিয়ে পরিচালনা করা। একদিকে ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে।

একই সঙ্গে তিস্তা অববাহিকায় আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, জলাধার সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির সুষম ব্যবহার, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নদীকে শুধু প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

বস্তুতপক্ষে তিস্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—ন্যায্য পানি বণ্টন, বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং আস্থাভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতা। চীন, ভারত কিংবা অন্য যে কোনো উন্নয়ন সহযোগীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা।

বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করা। একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে গঠনমূলক সংলাপকে আরো কার্যকর করতে হবে। কারণ কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না, যদি নদীতে পর্যাপ্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না হয়।

তিস্তার পানি কোনো দেশের একক সম্পদ নয়, এটি একটি অভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ, যার ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। তাই তিস্তাকে ভূরাজনীতির দাবার গুটি হিসেবে নয়, বরং মানবকল্যাণের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। সুতরাং ভারতের উদ্বেগ এখানে মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। 
ই-মেইল: [email protected] 

তিন বাহিনীর বৈষম্যের শিকারদের নিয়ে সরকারের সময়োচিত সিদ্ধান্ত

মোস্তফা কামাল
তিন বাহিনীর বৈষম্যের শিকারদের নিয়ে সরকারের সময়োচিত সিদ্ধান্ত
সংগৃহীত ছবি

বৈষম্য, বঞ্চনা, অবিচার, প্রতিহিংসা চরিতার্থের কাণ্ডকীর্তি শুধু সিভিল প্রশাসন নয়—সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীতেও যথেচ্ছা হয়েছে। আওয়ামী লীগ জমানার সেই নিপাতনে সিদ্ধ হওয়াদের মধ্য থেকে অন্তত ১৫০ জনের বিষয়ে অবশেষে সরকার একটি পদক্ষেপ নিয়েছে।  জবরদস্তিতে  অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত (চাকরিচ্যুত) অফিসারকে পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যোগ্যতানুযায়ী তিন বাহিনীর ১৫০ জন অফিসারকে  স্বাভাবিক অবসর, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা, আর্থিক সুবিধা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনাও দেওয়া হবে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের সারসংক্ষেপ তথ্য বলছে, এ ১৫০ জনের মধ্যে সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌবাহিনীর ২১ জন এবং বিমানবাহিনীর ১৪ জন। প্রজ্ঞাপনটি জারি না হলে আওয়ামী লীগ আমলের সেই কালোকাজের কথা হয় তো জানাও হতো না। এই সরকার সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সেই সরকারের অপকাজের একটি হিল্লা করেছে। বৈষম্য-নিগৃহিতের শিকার ও তাদের পরিবারের কাছে তা স্বস্তির। আর দেশবাসীর কাছে একটি বার্তা। ভেজাল বা অন্যায় করতে নিয়ম লাগে না। সেই ভেজালের বিহিত করতে হয় নিয়ম নীতির মাধ্যমে। 
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর তিন শাখায় চাকরিতে বৈষম্য ও প্রতিহিংসার শিকার কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা করতে গিয়ে সরকারকে ঠিকই একটা পদ্ধতিতে যেতে হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিটি করেছে। তিন বাহিনীর সদর দপ্তরকেও পর্ষদ গঠন করতে হয়েছে। পরে  আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এসব প্রস্তাব ও সুপারিশ বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। সেই কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে সরকারকে সিদ্ধান্তে আসতে হয়েছে। এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সশস্ত্র বাহিনী থেকে বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসর, অকালীন অবসর ও স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া ১৪১ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসর, অকালীন অবসর ও স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা চাকরি ফিরে পাওয়ার আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। এ নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ। কমিটি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া আবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করে। কমিটি ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত পদ্ধতিগত বৈষম্য ও পেশাগত ক্ষতির অভিযোগে অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত বা বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের করা আবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেয়।

আওয়ামী লীগ বৈষম্য-নিপীড়ন,দলবাজি থেকে কেবল রাজনীতি-সমাজ-প্রশাসন নয়; বিভিন্ন বাহিনীসহ রাষ্ট্রের কোনো সেক্টরকেই রেহাই দেয়নি। সিভিল পর্যায়ে এর ছাপ এক রকম। প্রতিরক্ষায় আরেক। তিনবাহিনীতে এর শিকাররা দম-নিশ্বাস বন্ধ করে ধুকরে ধুকরে ভোগে। লাজ-লজ্জায় গোপনও রাখে। আড়ালে-আবডালে কাঁদে,গোপনে চোখ মোছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জাতীয় প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে তারা প্রস্তুত থাকে, তাই বলে অপমান-অপদস্তের জন্যও কি প্রস্তুত থাকে বা থাকতে হয়?  এমন আঘাত যে জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় নিয়োজিতদের জন্য কতো বেদনার ভুক্তভোগীরাই জানে। 

বিশেষ করে দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী সবসময় সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত। তারওপর বাড়তি কাজ হিসেবে চব্বিশের গণআন্দোলন পরবর্তীতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যে ভূমিকা রাখতে হয়ছে তা কেবল দেশে নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও জায়গা করে নিয়েছে। দলীয়পনা, বৈষম্য চালাতে গিয়ে বিগতরা ভাবেনই সেনাবাহিনীকে হেয় করার ষড়যন্ত্র জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের সেনাবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া এই বাহিনী শুধু দেশের সীমানা রক্ষা করেনি, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে জনগণের পাশে দাঁড়ানো তাদের মজ্জাগত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। সেই সেনাবাহিনীটিকেই নিশানা করতে তাদের বিবেক কাঁপেনি। 

দু:খজনকভাবে মাঝেমধ্যেই সেনাবাহিনীকে খোঁচা দেয়া, বিরক্ত-উত্তেজিত করার ক্রিয়াকর্ম এখনো রয়েছে। তাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান ও অবমাননাকর মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য দেশের ভেতরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বাইরের বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার নোংরা ষড়যন্ত্র চলছে। এরা কারা? উত্তর স্পষ্ট যারা রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চায়, যারা অবৈধ অস্ত্রের জোরে ক্ষমতার ভাগ চায়। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষও জানে, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এই বাহিনীকে নিয়ে রাজনীতি করলে বা কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করলে তা দেশের স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর উদাহরণ অনেক। যেসব দেশে সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা নষ্ট করা হয়েছে, সেসব দেশ দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। আফগানিস্তান, সোমালিয়া কিংবা সুদানের দিকে তাকালেই বোঝা যায় সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনীকে নিয়ে নানা রাজনৈতিক খেলা ও হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে ভয়াবহ পরিণতি নেমে এসেছিল। রাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে বারবার সেনাবাহিনীকে টানার এই ধরনের পরিণতি হিসেবে অতীতে সামরিক হস্তক্ষেপ, রক্তপাত, বাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। সেনাবাহিনীকে নিয়ে যারা অতি খেলেছেন তাদের হয় দেশ ছেড়ে দুনিয়া ছাড়তে হয়েছে, দুনিয়াও ছাড়তে হয়েছে।  বাংলাদেশ সেনা, বিমান, নৌ ৩টি বাহিনীর ইতিহাসই মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত। 

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তাদের গড়ে ওঠার সঙ্গে দেশ গঠনেও রেখে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা। ‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা, দেশের তরে’ এই মূলমন্ত্র হৃদয়ে ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সেবামূলক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ দক্ষ, অভিজ্ঞ, সুশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও আদর্শ একটি বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। 

অপমান-বৈষম্যের শিকার হলেও দেশ মাতৃকার বিরুদ্ধে যে কোনো অপচেষ্টা নস্যাতে তারা পিছপা হয় না। বিরত হয় না পেশাদারত্ব ও যথাযথ দায়িত্ব পালনে। সেই বিবেচনায় আওয়ামী লীগ আমলে বৈষম্য, বঞ্চনা, অবিচার, প্রতিহিংসার শিকার সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর ১৫০ জনের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপটি এ সময়ের অন্যতম একটি সেরা কাজ। বিশেষ বার্তাও। 

যে বার্তায় স্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ, সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সর্বদা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা পরিবারের স্বার্থে ব্যবহার না করে তাদেরকে দেশের সংবিধান ও জনগণের প্রতি আনুগত্য পালনে প্রণোদিত করাই আসল কথা। দেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব ও অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা ও অঙ্গীকার উঠে এসেছে: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সব ধরনের বিতর্ক ও দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার কথা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অতীতে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রাজনৈতিক স্বার্থে কখনোই সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করা হবে না এবং তারাও সরাসরি রাজনীতিতে নাক গলাবেন না। আর বর্তমান সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তো খাস কথা বলে রেখেছেন সেই কবেই। কোনো দল বা গোষ্ঠী যেন সেনাবাহিনীকে প্রতিপক্ষ না ভাবে, নিজের পক্ষেও মনে না করে সেই আহ্বানের পাশাপাশি সাফ জানিয়ে রেখেছেন, 'সেনাপ্রধান হিসেবে নিজের মেয়াদকালে আমি রাজনীতিতে নাক গলাব না। আমি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে হস্তক্ষেপ করতে দেব না। এটাই আমার স্পষ্ট অঙ্গীকার।' এরপর আর কোনো কথা থাকে?

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি

জাকির উদ্দিন আহমেদ
একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ; অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, নগদ অর্থ প্রবাহের সীমাবদ্ধতা এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার মতো বাস্তবতা ব্যবসা ও শিল্প খাতকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এমন সময়ে উৎপাদন, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী।

বিশেষ করে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। একটি বন্ধ কারখানা পুনরায় সচল হলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন কমে, বিদ্যমান সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয়, দ্রুত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয় এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের স্থবির বা খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ে, স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। তাই সম্ভাবনাময় শিল্পকারখানাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসে—এই সহায়তা কি কেবল বন্ধ শিল্পকারখানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যারা নিয়মিত উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন, তারাও সমান নীতিগত সহায়তা পাবেন? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যৎ শিল্পনীতির ভারসাম্য নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি হচ্ছে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। দেশের কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ, স্থানীয় উৎপাদন, সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম মূলত এই উদ্যোক্তাদের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক বছরে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অসংখ্য উদ্যোক্তা সীমিত মূলধন, উচ্চ সুদের ঋণ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাদের প্রতিষ্ঠান সচল রেখেছেন। তাদের এই অবদান অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাস্তবতা হলো, বর্তমানে অধিকাংশ মাঝারি উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় সংকট অর্থায়ন। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, কঠোর জামানত নীতি, কার্যকরী মূলধনের ঘাটতি এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় ব্যবসাও কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন এবং কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে শুধু নতুন বিনিয়োগ নয়, বিদ্যমান শিল্প ও ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখাও এখন জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে, প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে অর্থনৈতিক নীতির সফলতা কেবল ঘোষণার ওপর নির্ভর করে না; এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে। নীতিগত সুবিধা যদি মাঠপর্যায়ে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বৈষম্যহীনভাবে উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে প্রত্যাশিত সুফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

বন্ধ শিল্পকারখানাকে স্বল্পসুদে ঋণ বা বিশেষ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রতিষ্ঠান বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বাজার সম্ভাবনার ভিত্তিতে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে সক্ষম, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। অন্যদিকে যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ব্যবসা সচল রেখেছেন, তাদের যেন কোনোভাবেই নীতিগতভাবে বঞ্চিত হতে না হয়। অন্যথায় বাজারে ভুল বার্তা যেতে পারে যে ব্যবসা বন্ধ করলেও ভবিষ্যতে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির জন্য অনুকূল হবে না।

বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিল্প ও অর্থনৈতিক নীতি নিশ্চিত করা। স্বল্পসুদে এসএমই ঋণ সম্প্রসারণ, কার্যকরী মূলধনের সহজলভ্যতা, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার আরো সরলীকরণ, একক ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা, উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা শিল্পখাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল মার্কেটিং, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরো জোরদার করা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে নতুন বিনিয়োগ যেমন উৎসাহিত হবে, তেমনি বিদ্যমান উদ্যোক্তারাও টিকে থাকার শক্তি অর্জন করবেন। কারণ একটি নতুন শিল্প স্থাপন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা শিল্পকে টিকিয়ে রাখা। টেকসই শিল্পায়নের জন্য এই দুই ক্ষেত্রকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সমাজ এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সহজ অর্থায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং সকল স্তরের উদ্যোক্তার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে শিল্পায়ন আরো বেগবান হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতির ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতিই পারে নতুন বিনিয়োগ, বন্ধ শিল্পকারখানার পুনর্জাগরণ এবং বিদ্যমান ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে। আর সেই সমন্বয়ই হবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রধান ভিত্তি।

লেখক :  জাকির উদ্দিন আহমেদ,
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা,
জেডএম ইন্টারন্যাশনাল ও 
মহাসচিব, সেফটি অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন।

প্রধানমন্ত্রীর জাদুকরী সফর ও সমতার ভূরাজনীতি

মন্‌জুরুল ইসলাম
প্রধানমন্ত্রীর জাদুকরী সফর ও সমতার ভূরাজনীতি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের একটি ভিডিওতে ‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া পেজে প্রকাশিত ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে গানটি ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ এবং তাজিকিস্তানের পপশিল্পী মেহরনিগারি রুস্তম গানটির মূল কণ্ঠশিল্পী। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ওই বিশেষ ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়, যা বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের মেলবন্ধন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ভিডিওটির আবহে বাংলা গানের এই চমৎকার ফিউশনের কারণে নেটদুনিয়ায় এটি দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে। শুধু গান নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর সত্যি জাদুকরী একটি সিদ্ধান্ত। মালয়েশিয়া দিয়ে শুরু করে চীন সফরের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর শেষ করেছেন। এটি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর সফর নয়, বাংলাদেশের সমতার ভূরাজনীতির প্রথম পদক্ষেপ। এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কী পেল, কেন তিনি মালয়েশিয়া ও চীন সফরে গেলেন এসব হিসাব যারা এখনই কষছেন, তাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তিনি তাঁর ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ ঘোষণা কীভাবে বাস্তবায়ন করছেন সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বর্তমান ভূরাজনীতি অতীতের সব সময়ের চেয়ে একটু ভিন্ন, একটু কৌশলী ও অনেকটা সাহসী। কোথায় কৌশলী হতে হবে আর কোথায় সাহসী হতে হবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিশ্চয় সেটা জানেন। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর জাদুকরী সফর এবং সমতার ভূরাজনীতির সফলতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে নতুন উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকবে এমনই প্রত্যাশা।

ভূরাজনীতি বা বিশ্বব্যবস্থা এখন ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা এখন বাস্তবতা। বৈশ্বিক নতুন রাজনীতির পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বে প্রতিটি দেশকে নতুন করে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই ভারসাম্যের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এখন কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা একটি দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগেরই প্রতিফলন।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু। শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং ইসলামি বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মরত, যারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সফরের মাধ্যমে যদি শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন হবে। তবে শ্রমবাজার নিয়ে এ নতুন সুযোগে আমাদের আরও প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু অদক্ষ শ্রমিক পাঠালে হবে না, দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে হবে। এজন্য যারা মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী, তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। যেসব সেক্টরে মালয়েশিয়া শ্রমশক্তি নেবে, সেসব সেক্টরে মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারি, তাহলে দেশ থেকে যারা কাজের জন্য বিদেশে যাবেন, তারা ভালো থাকবেন এবং বেশি অঙ্কে বৈদেশিক মুদ্রাও পাঠাতে পারবেন। তা না হলে যারা ঋণ করে বিদেশ যাওয়ার টাকা জোগাড় করেন, তাদের সেই ঋণ শোধ না হতেই ফেরত আসতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও দরিদ্র হবে। এজন্য  শ্রমশক্তি বিদেশে পাঠানোর সব সিন্ডিকেট কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। শুধু শ্রমবাজার নয়, মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল শিল্পোন্নত অর্থনীতি। প্রযুক্তি, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষায় দেশটির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে যৌথ বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের শিল্পায়ন আরও গতি পেতে পারে।

অন্যদিকে চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, সেতু, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এই বিদ্যমান সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের প্রতিযোগিতা মূলত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হলে বাংলাদেশে নতুন শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যদি বিদেশি বিনিয়োগের একটি উপযুক্ত স্থান, গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তাহলে রপ্তানি বহুমুখীকরণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে কারণে ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এ সফরের গুরুত্ব অনেক বেশি।

বঙ্গোপসাগর এখন ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত এলাকা। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এ অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অবিবেচনাপ্রসূত কোনো প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে, নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে সেই বাস্তববাদী কূটনীতিরই প্রতিফলন ঘটেছে, যার মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো আঞ্চলিক সংযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং যোগাযোগ সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক লজিস্টিক ও ট্রানজিট হিসেবেও নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।

 

শুধু মালয়েশিয়া বা চীন নয়, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও তারেক রহমানের সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন নিরাপদ নতুন উৎপাদনস্থান খুঁজছে। বাংলাদেশের তরুণ জনশক্তি, বড় বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয়। সফরের মাধ্যমে যদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পায়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে। এ ছাড়া শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন খাতেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতের অর্থনীতি জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। তাই এসব খাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারি বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেটা হলো বর্তমান বিশ্বের সফল কূটনীতি কোনো একটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো নয়। বরং সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। বাংলাদেশ যদি চীন, মালয়েশিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সমানভাবে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশ সে পথেই হাঁটছে বলে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে। কারণ তারেক রহমানের প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হলে কখনো কৌশলী, কখনো উদার, আবার কখনো সাহসী পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন। এ সফরকে তাই কেবল আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সফল কূটনীতির প্রকৃত মূল্যায়ন অবশ্য হবে সফর-পরবর্তী সময়ে কত বিনিয়োগ এসেছে, কতগুলো সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়েছে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের মানুষ কতটা উপকৃত হয়েছে তার ওপর।

বর্তমান ভূরাজনীতির জটিল বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগানো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর যদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে বাস্তব অগ্রগতি এনে দেয়, তবে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় এমন বাস্তববাদী, অর্থনীতিকেন্দ্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই আগামী দিনের বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করে আনা একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উল্লেখ করেছেন। জবাবে সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার জন্য। আমি যে কাজটি করার চেষ্টা করেছি আমার অবস্থান থেকে, আমার দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা এবং সেই স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।  যদি ভালো কিছু অর্জন হয় এটি বাংলাদেশের অর্জন। এ সফরে দেশের মানুষের কোনো অর্জন হলে সেটি দেশের মানুষের অর্জন।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের অর্জনকে বাংলাদেশের ও দেশের মানুষের অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বক্তব্যে তিনি তাঁর বিনয় প্রকাশ করেছেন। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা বলেছেন। এখন লক্ষ রাখতে হবে, তাঁর এ সফরের সাফল্য যেন আমরা ঘরে তুলতে পারি। কোনো বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্রে অথবা অদক্ষতায় যদি আমরা দেশের স্বার্থ, মানুষের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হই, তাহলে দুঃখ করা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]