প্রায় চার মাসের যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর, এখন সব পক্ষই নিজেদের জয়-পরাজয়, লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে। মাঠের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলে অবশ্যই পিছিয়ে থাকবে ইরান। তবে যুদ্ধে টিকে থেকেই বড় এক জয়ের দেখা পেয়ে গেছে দেশটি। শুরুতে ইরানের সরকার পরিবর্তন ও তাদের হাতে থাকা ইউরেনিয়াম নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও দৃশ্যমান তেমন কোনো অর্জন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছে। ইরানের সরকার বদল তো হয়ইনি, বরং যুদ্ধ তাদের আরো ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করেছে। এই ফাঁকে ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের স্বীকৃতিও আদায় করে নিয়েছে। ইরানের সবচেয়ে বড় লাভ হলো, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলার এখন তাদের হাতে আসবে, যা তাদের বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় তেল বিক্রি করেও অনেক বেশি লাভবান হবে ইরান।
এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে আছে ইসরায়েল। মূলত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুই ফুঁসলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে টেনে এনেছিলেন। কিন্তু এখন তাকে ছাড়াই সমঝোতায় পৌছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের শুরুতে মূল ভূমিকায় থাকলেও শেষের ঘটনায় নেতানিয়াহুর কোনো ভূমিকাই নেই। বরং ট্রাম্প একাধিকবার নেতানিয়াহুর আচরণে প্রকাশ্যে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। অপাঙক্তেয় নেতানিয়াহু এখন সমঝোতা স্মারক ভণ্ডুল করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও লেবাননে হামলা চালিয়ে তিনি শান্তি প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করতে চাইছেন।
যুদ্ধে সরাসরি জড়িত না হয়েও চীন লাভের গুড়ে অনেকটাই ভাগ বসাতে পেরেছে। ভারসাম্যপূর্ণ ও কৌশলী কূটনীতি দিয়ে বিশ্বের কাছে নিজেদের দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে পরিচিত করাতে পেরেছে চীন। ইরান যুদ্ধে দারুণ উজ্জ্বল হয়েছে চীনের ভাবমূর্তি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে চীন বরাবরই নিজেদের যৌক্তিক অবস্থান ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের নিন্দা যেমন করেছে, আবার শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ভূমিকাও রেখেছে। ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ না করেও চীন খোদ ট্রাম্পের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে।
বুধবার ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্টের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি চীন ও প্রেসিডেন্ট শি-কে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলেন, একদম নিরপেক্ষ এবং আমি এটার প্রশংসা করি।’
ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অমান্য করতে চীনা নেতা তার দেশের নৌ-শক্তি ব্যবহার করেননি উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সেটি করেনি। প্রেসিডেন্ট শি আমাকে সাহায্য করেছেন। তিনি সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন এবং আমার মনে হয় এটি সমাধানে সম্ভবত তিনি সাহায্য করেছেন।’
এখানেই বেইজিংয়ের কৌশলী কূটনীতির জয় হয়েছে। নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখেই তারা বিশ্ব শক্তির ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং এই সংঘাতের মূল মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের নেতারা বেইজিং সফর করেছেন। এইসব সফরে বিশ্ব শক্তি হিসেবে চীন নিজেদের আবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পেরেছে। পুরো প্রক্রিয়ায় থেকেও কোনো পক্ষ নেয়নি চীন। শান্তি আলোচনার শুরুতে ইরান যে কোনো চুক্তিতে চীনকে গ্যারান্টার হিসেবে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু কৌশলে চীন তা এড়িয়ে গিয়ে নিজেদের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিকেই সামনে এনেছে বারবার।
যুদ্ধ শুরুর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংব দেখা দেয়। অন্যান্য দেশের তুলনায় চীন এ সংকটও মোকাবেলা করেছে দারুণ দক্ষতায়। জ্বালানি তেলের কৌশলগত বিশাল মজুদ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহারের কারণে জ্বালানি তেলের সংকটের অভিঘাত খুব একটা লাগেনি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির গায়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্রিয় ভূমিকা পালনে প্রস্তুত রয়েছে বেইজিং। এই চুক্তির পেছনে বেইজিংয়ের কোনো ভূমিকা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে লিন জিয়ান নির্দিষ্ট কোনো ভূমিকার কথা নিশ্চিত করেননি। তবে যুদ্ধ বন্ধে চীনের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করছেন। গত এপ্রিলে চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের পেশ করা চার দফা শান্তি প্রস্তাবের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন তিনি।
বুধবার চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের বিষয়টি সঠিকভাবে সামলানোর আহ্বান জানান। ওয়াং বলেন, ‘শান্তির আলো দেখা দিয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপের মূল চাবিকাঠি হলো সব পক্ষের নিজেদের প্রতিশ্রুতিগুলো সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন করা এবং সব দিক থেকে আসা হস্তক্ষেপ দূর করা।’
চীনের এসব ভূমিকা বিশ্বে বার্তা দিয়েছে—অন্যরা যখন যুদ্ধ ছড়াচ্ছে, তখন চীন একটি দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শক্তি এবং প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। এই যুদ্ধ প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অন্ধের মতো যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চীন বিশ্বের পরাশক্তি হয়ে উঠবে কিনা, এমন আলোচনাও সামনে আসছে। কিন্তু চীনের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, বেইজিং কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ধাঁচের কোনো পরাশক্তি হতে চায় না।
বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’র ফেলো সান চেংহাও বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত পক্ষ হিসেবে রয়ে গেছে। যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হলো, সেখানে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে এখন অনেক বেশি রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং সম্মানহানির মূল্য দিতে হচ্ছে।’
চীন বরাবরই সব দেশের সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, রাজনৈতিক সমাধান এবং উন্নয়নভিত্তিক নিরাপত্তার ওপর জোর দেয়। এবারের যুদ্ধে তাদের সেই দর্শনই আবার সামনে এসেছে এবং প্রশংসিত হয়েছে।






