গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের উসকানিতে ইরানে হামলায় সামিল হয় যুক্তরাষ্ট্র। পরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সঙ্কট, অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও জনমতের চাপে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে মরিয়া চেষ্টা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য অভিন্ন থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা চালালে বিপাকে পড়ে ইসরায়েল। তারা বরাবরই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে মরিয়া ছিল। তাই যুদ্ধ বন্ধের যেকোনো চেষ্টা ভণ্ডুল করতে তাদের চেষ্টার কমতি ছিল না। এমনকি যুদ্ধ বন্ধে গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে শান্তি প্রচেষ্টা নস্যাতের চেষ্টা করে।
গত এপ্রিলে শান্তি আলোচনার শুরুর দিকেও ইরানের দুই শীর্ষ নেতাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিল ইসরায়েল। এ ষড়যন্ত্রের খবর গোপনে ইরানকে জানিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং হত্যার তালিকা থেকে দুই নেতার নাম বাদ দিতে ইসরায়েলকে বাধ্য করে।
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে শুরু থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্ততায় সব ধরনের শান্তি আলোচনায় সক্রিয় ও ইতিবাচক অংশগ্রহণ ছিল এ দুই নেতার। তাই ইসরাইল এ দুই নেতাকে হত্যার মাধ্যমে শান্তি আলোচনা নস্যাতের মরিয়া চেষ্টা চালায়। মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস এ খবর প্রকাশ করে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে সরকার পরিবর্তন ঘটানো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। পরে বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলের হামলায় মারা যান ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা আলি লারিজানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি। তারা দুজনেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন।
ইসরায়েল আরাঘচি এবং গালিবাফকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে, এ খবর পেয়ে শঙ্কিত হয় মার্কিন প্রশাসন। তাদের ধারণা ছিল, এ দুজন মারা গেলে শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাবে এবং যুদ্ধ প্রলম্বিত হবে। তাই তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশের মাধ্যমে ইরানকে এ ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে সতর্ক করে। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে চাপ দিয়ে তাদের হত্যার তালিকা থেকে এ দুজনের নাম বাদ দিতে বাধ্য করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘অন্তত গালিবাফকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে জানতে পারে ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে বলে।’
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর গত এপ্রিলে ইসলামাবাদে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতারা মুখোমুখি বৈঠকে বসেন। সে আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্পিকার গালিবাফ।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, তেহরান তখনই আশঙ্কা করেছিল, আলোচনা ব্যাহত করার জন্য ইসরায়েল এই সুযোগে গালিবাফ বা আরাঘচিকে হত্যা করতে পারে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায় ইরান। যাওয়ার পথে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ইরানি প্রতিনিধিদলের বিমানটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বিপদ তখনও কাটেনি। ফেরার পথেও তাদের টার্গেট করা হয়।
ইরানি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরাক সীমান্ত ঘেঁষে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে এবং গালিবাফের বিমানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন খবর পেয়ে প্রতিনিধিদলকে বহনকারী বিমানটি সরাসরি তেহরানে না গিয়ে পাকিস্তান সীমান্তের কাছে মাশহাদ বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। ঝুঁকি এড়াতে ৭০ সদস্যের ইরানি প্রতিনিধিদল দলটি সড়ক পথে তেহরানে পৌঁছায়।
তবে ঝুঁকি সত্ত্বেও ইরান শান্তি আলোচনা অব্যাহত রাখে। এপ্রিলে শুরু হওয়া আলোচনা শেষ পর্যন্ত জুনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের ওপর এর আগেও অন্তত দুইবার হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। দুইবারই পাহাড়ের নিচে একটি গোপন বাঙ্কারে আটকা পড়েন গালিবাফ এবং ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।




