• ই-পেপার

জুমার দিন যে ১৫ আমলে মনোযোগী হওয়া উচিত

আত্মশুদ্ধি দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি

মাওলানা আদনান জহির
আত্মশুদ্ধি দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে। পৃথিবীর সকল উন্নতি, জ্ঞান, সম্পদ ও ক্ষমতা তখনই কল্যাণকর হয় যখন তা একটি পরিশুদ্ধ আত্মা ও নির্মল হৃদয়ের অধিকারী মানুষের হাতে থাকে। এজন্যই মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়েতের জন্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন, কিতাব নাজিল করেছেন এবং আত্মশুদ্ধিকে সফলতার প্রধান উপায় হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

বর্তমান যুগে মানুষ বাহ্যিক উন্নতির শিখরে পৌঁছালেও আত্মিক অবক্ষয়, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ, অহংকার, গীবত, পরনিন্দা ও নানা নৈতিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাই আজ আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধি শুধু একটি ইবাদত নয়; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের মৌলিক ভিত্তি।

আত্মশুদ্ধি কী?
আরবি ‘তাজকিয়াহ’ শব্দের অর্থ হলো উন্নতি, পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধি। ইসলামী পরিভাষায় আত্মশুদ্ধি বলতে মানুষের অন্তরকে শিরক, কুফর, অহংকার, হিংসা, রিয়া, লোভ ও সকল নৈতিক ব্যাধি থেকে মুক্ত করে ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতির মতো মহৎ গুণে অলংকৃত করাকে বোঝায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি পরিশুদ্ধ হয়, সে তো নিজের কল্যাণের জন্যই পরিশুদ্ধ হয়। আর আল্লাহর কাছেই সকলের প্রত্যাবর্তন।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ১৮)

আত্মশুদ্ধির জন্যই নবী-রাসুলদের আগমন
আল্লাহ তাআলা মানবজাতির কল্যাণের জন্য নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন এবং তাঁদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৪)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে তাদেরই একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।’ (সুরা : জুমুআহ, আয়াত : ২)

আত্মশুদ্ধি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
১. আত্মশুদ্ধি সফলতার একমাত্র পথ

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে একের পর এক এগারোটি শপথ করে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৯-১০)
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে মানুষের প্রকৃত সফলতা সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা খ্যাতিতে নয়; বরং আত্মশুদ্ধির মধ্যেই নিহিত।

২. অন্তরই মানুষের প্রকৃত সম্পদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের অন্তরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘জেনে রাখ! শরীরের মধ্যে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে; তা ঠিক থাকলে পুরো শরীর ঠিক থাকে, আর তা নষ্ট হয়ে গেলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখ! সেটি হলো অন্তর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৯)
সুতরাং আত্মশুদ্ধি মূলত অন্তরের সংশোধনের নাম।

৩. আখিরাতে মুক্তির জন্য বিশুদ্ধ অন্তর অপরিহার্য
কিয়ামতের দিন ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা কিংবা পার্থিব ক্ষমতা কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; তবে যে আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হবে, সে-ই সফল হবে।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮৮-৮৯)
অতএব, আখিরাতের মুক্তির জন্য আত্মশুদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।

৪. আত্মশুদ্ধি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ
আত্মশুদ্ধির তাওফিক আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। মানুষ নিজ প্রচেষ্টায় চেষ্টা করে, কিন্তু প্রকৃত পরিশুদ্ধি দান করেন আল্লাহ তাআলাই। তিনি বলেন, ‘বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পরিশুদ্ধ করেন।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২১)

৫. আত্মশুদ্ধি অন্তরের ব্যাধির একমাত্র চিকিৎসা
বর্তমান যুগে মানুষের অন্তর নানা রোগে আক্রান্ত— হিংসা, অহংকার, কৃপণতা, লোভ, গীবত, পরনিন্দা, রিয়া, বিদ্বেষ ও দুনিয়ার মোহ- এসব রোগের প্রকৃত চিকিৎসা হলো আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর স্মরণ এবং নিয়মিত আত্মসমালোচনা।

আত্মশুদ্ধির কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায়
১. কোরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থ অনুধাবন করা।
২. নিয়মিত সালাত আদায় করা।
৩. আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফার করা।
৪. গুনাহ থেকে তওবা করা।
৫. সৎ ও নেককার মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা।
৬. আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তোলা।
৭. রিয়া, অহংকার ও হিংসা থেকে বেঁচে থাকা।
৮. মৃত্যু ও আখিরাতের কথা বেশি স্মরণ করা।
৯. দান-সদকা ও মানুষের উপকার করা।
১০. আল্লাহর কাছে সর্বদা আত্মশুদ্ধির জন্য দোয়া করা।

আত্মশুদ্ধি ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা এবং একজন মুমিনের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। যে ব্যক্তি তার অন্তরকে ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির আলোয় আলোকিত করতে পারে, সে দুনিয়াতেও শান্তি লাভ করে এবং আখিরাতেও সফলতা অর্জন করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার আত্মাকে গুনাহ, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে নিমজ্জিত রাখে, সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আজ যখন সমাজ নানাবিধ নৈতিক সংকট ও আত্মিক রোগে আক্রান্ত, তখন প্রত্যেক মুমিনের উচিত নিজের অন্তরের দিকে ফিরে তাকানো, আত্মসমালোচনা করা এবং আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়া। কারণ কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা বংশগৌরব; বরং গ্রহণযোগ্য হবে সেই হৃদয়, যা আল্লাহর স্মরণে পবিত্র, তাকওয়ায় পরিপূর্ণ এবং গুনাহের কালিমা থেকে মুক্ত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আত্মশুদ্ধি, অন্তর সংশোধন এবং বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আশুরার দিনে শুক্রবারই কি কিয়ামত সংঘটিত হবে?

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
আশুরার দিনে শুক্রবারই কি কিয়ামত সংঘটিত হবে?
সংগৃহীত ছবি

কিয়ামত ইসলামের মৌলিক আকিদাসমূহের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি এমন এক অবশ্যম্ভাবী সত্য, যার মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি ঘটবে এবং আখিরাতের অনন্ত জীবনের সূচনা হবে।

কিয়ামত হলো সেই মহাদিবস, যেদিন মহান আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টিজগৎ ধ্বংস করে পুনরায় জীবিত করবেন এবং মানুষের দুনিয়ার সব কাজের হিসাব-নিকাশ গ্রহণ করবেন। কিয়ামতের দিনে সব মানুষ পুনরুত্থিত হবে এবং তাদের আমল অনুযায়ী বিচার করা হবে। নেককাররা জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং পাপীরা তাদের কর্মফল ভোগ করবে। এক কথায় কিয়ামত পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সমাপ্তি এবং পরকালের বিচার দিবস।

এটি ইসলামের মৌলিক আকিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ বলেন, ‘মহাবিপর্যয়! মহাবিপর্যয় কী? তুমি কি জানো মহাবিপর্যয় কী? সেদিন মানুষ হবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পতঙ্গের মতো। আর পাহাড়গুলো হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো।’ (সুরা : কারিয়া, আয়াত : ১-৫)

কিয়ামতের দিনক্ষণ : কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে তার সুনির্দিষ্ট সময় একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। কোনো মানুষ, ফেরেশতা বা নবী-রাসুলও এর নির্দিষ্ট সময় জানেন না। তবে কোরআন ও হাদিসে কিয়ামতের অনেক আলামত (নিদর্শন) বর্ণিত হয়েছে। এসব আলামতের কিছু প্রকাশ পেয়েছে, কিছু ভবিষ্যতে প্রকাশ পাবে। কিয়ামত-আখিরাতের ভাবনা দিয়ে মানুষকে ঈমান ও সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্য না হলে মহান আল্লাহ কিয়ামত আসবে—এ কথাও প্রকাশ করতেন না।

কোরআনে কিয়ামত ও মৃত্যুর সময়-তারিখ গোপন রাখার রহস্য বর্ণিত হয়েছে। তা হলো—মানুষ কর্মপ্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকুক এবং ব্যক্তিগত কিয়ামত তথা মৃত্যু আর বিশ্বজনীন কিয়ামত তথা হাশরের দিনকে দূরে মনে করে গাফেল না হোক। আল্লাহ বলেন, ‘তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে যে, তা কখন সংঘটিত হবে। বল, এর জ্ঞান তো একমাত্র আমার প্রতিপালকের কাছেই আছে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৮৭)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কিয়ামত তো অবশ্যম্ভাবী, আমি এটা গোপন রাখতে চাই, যাতে প্রত্যেককে নিজ কাজ অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া যায়।’ (সুরা : ত্ব-হা, আয়াত : ১৫)

জুমার দিনে কিয়ামত : কিয়ামত অবশ্যই হবে, কিন্তু কবে হবে—এর সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে। তবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে কিয়ামত জুমার দিন সংঘটিত হবে। তবে কোন জুমার দিন, কোন মাস বা কোন বছরে হবে তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। আবু লুবাবা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন সপ্তাহের সব দিনের সর্দার এবং আল্লাহর কাছে অতি মর্যাদাসম্পন্ন। দিনটি আল্লাহর কাছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এই দিনে পাঁচটি বিষয় রয়েছে। (১) এই দিনে আল্লাহ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন, (২) এই দিনেই আল্লাহ তাঁকে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নামিয়ে দিয়েছেন, (৩) এই দিনেই আল্লাহ তাঁকে মৃত্যুদান করেছেন, (৪) এই দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যদি কোনো বান্দা সে সময় আল্লাহর কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করে আল্লাহ তাকে অবশ্যই তা দান করেন যদি না তা অমূলক হয় আর (৫) এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। প্রত্যেক সম্মানিত ফেরেশতা, আকাশ, জমিন, বাতাস, পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্র—সব কিছুই জুমার দিন কিয়ামতের আশঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত থাকে।’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ১০৮৪)

আশুরা জুমাবার হলে কিয়ামত প্রসঙ্গ : আশুরার দিন (১০ মহররম) জুমাবারে পড়লে কিয়ামত সংঘটিত হবে—সমাজে এ ধরনের ধারণা প্রচলিত থাকলেও এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ইসলামী দলিল পাওয়া যায় না। কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, তবে এর সুনির্দিষ্ট সময়, দিন, মাস বা বছর একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। এ ছাড়া হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে কিয়ামত জুমার দিনে সংঘটিত হবে; কিন্তু কোনো হাদিসে বলা হয়নি যে তা আশুরার দিনই হবে। ইতিহাসে বহুবার ১০ মহররম জুমাবারে এসেছে, কিন্তু কিয়ামত সংঘটিত হয়নি। সুতরাং আশুরা ও জুমা একই দিনে হওয়াকে কিয়ামতের নিশ্চিত আলামত বা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে মনে করা সঠিক নয়। যে বর্ণনায় আশুরার দিন কিয়ামত হওয়ার কথা এসেছে তা হাদিস বিশারদদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভিত্তিহীন। আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযি ওই বর্ণনাকে মাওযু বলেছেন। আল্লামা সুয়ুতি ও ইবনুল আররাক (রহ.) ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছেন। (কিতাবুল মাওজুআত ২/২০২; আল-লাআলিল মাসনুআ ২/১০৯; তানযিহুশ শরিআতিল মারফুআ ২/১৪৯)

কিয়ামতের প্রস্তুতি : কিয়ামত কবে হবে তা জানা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তাই আল্লাহ তাআলা তা জানাননি। আল্লাহ তাআলা যে বিষয়ে জানাননি, তার পেছনে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিয়ামত কবে হবে তা জানার কোনো ফায়দাও নেই। প্রয়োজন হলো—কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কেননা কিয়ামতের পর সবাইকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। সেদিন প্রত্যেককে তার কর্মের প্রতিদান দেওয়া হবে। কর্ম ভালো হলে ভালো প্রতিদান পাওয়া যাবে, মন্দ হলে মন্দ প্রতিদান। তাই কর্ম ভালো করা ও বেশি বেশি নেক আমলে যত্নবান থাকাই আসল কাজ। সেটাই উপকারে আসবে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে? তিনি বলেন, তুমি কিয়ামতের জন্য কি পাথেয় সঞ্চয় করেছ? সে বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই তুমি তার সঙ্গে উঠবে যাকে তুমি ভালোবাস। আনাস (রা.) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পরে কোনো কিছুতে আমরা এত বেশি খুশি হইনি যতটা নবী (সা.) এর বাণী, ‘তুমি তার সঙ্গেই (থাকবে) যাকে তুমি ভালোবাস’—দ্বারা আনন্দ লাভ করেছি। আনাস (রা.) বলেন, আমি আল্লাহ, তাঁর রাসুল, আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-কে ভালোবাসি। সুতরাং আমি আশা করি যে কিয়ামত দিবসে আমি তাঁদের সঙ্গে থাকব, যদিও আমি তাঁদের মতো আমল করতে পারিনি। (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৭২)

পরিশেষে বলা যায়, কিয়ামত একটি অনিবার্য সত্য, যা একদিন অবশ্যই সংঘটিত হবে। এর সঠিক সময় ও দিনক্ষণ একমাত্র আল্লাহ তাআলার জানা। যদিও হাদিসে কিয়ামত জুমার দিনে সংঘটিত হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে, তথাপি আশুরার দিন জুমাবারে পড়লেই কিয়ামত হবে—এমন ধারণার কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। একজন মুমিনের জন্য কিয়ামতের সময় জানার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান, নবী করিম (সা.)-এর অনুসরণ, নেক আমল, তাওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই আখিরাতের সফলতা অর্জন সম্ভব। আর এটাই হওয়া উচিত প্রত্যেক মুসলমানের জীবনের প্রধান লক্ষ্য।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

জুমার দিনে যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিনে যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মুসলমানদের জন্য জুমার দিন হচ্ছে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদিসে জুমার দিনে করণীয় বেশকিছু আমলের কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ আমল হলো আল্লাহ তাআলার কাছে একাগ্রচিত্তে দোয়া করা। কারণ এটি দোয়া কবুলের দিন। এই দিনের দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়।  আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুল (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন’। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০০)

তবে কোনো হাদিসে এসেছে, ‘সেই সময়টি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)
বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। (জাদুল মাআদ, ২/৩৯৪)

তাই জুমার দিন বিশেষ করে আসর নামাজের পর দোয়া করা উচিত। যেকোনো দোয়াই করা যায়। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া তুলে ধরা হলো।

১. দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ লাভের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।’
অর্থ : ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০১‍)


২. উত্তম জীবন যাপনের দোয়া

اَللَّهُمَّ اِنِّى أَسْألُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গেনা।’
অর্থ : ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হেদায়াত কামনা করি এবং আপনার ভয় তথা তাকওয়া কামনা করি এবং আপনার কাছে নৈতিক পবিত্রতা কামনা করি এবং সম্পদ তথা সামর্থ্য ও সচ্ছলতা কামনা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২১,  তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৮৯)

৩. মা-বাবাসহ সকল মুমিনের জন্য দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

উচ্চারণ : ‘রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে সেইদিন ক্ষমা করে দিবেন; যেইদিন হিসাব কায়েম করা হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উল্লেখিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার তাওফিক দান করুন। বিশেষ করে দোয়া কবুলের সময়গুলোতে বেশি বেশি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

একাধিক হাদিস দ্বারা মহররম মাসের মর্যাদা প্রমাণিত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
একাধিক হাদিস দ্বারা মহররম মাসের মর্যাদা প্রমাণিত
সংগৃহীত ছবি

হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। মহররম শব্দের অর্থ সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ। মহররমুল হারাম সেই চার মাসের একটি, যেগুলোর সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টির সময় থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস ১২টি। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)

আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আশরাফ আলী থানবি (রহ.) লিখেছেন, ‘আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী, তাঁর কাছে গণ্য মাসের সংখ্যা ১২টি চান্দ্রমাস। যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকেই এ ব্যবস্থা নির্ধারিত। এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী।’ (বয়ানুল কোরআন)
কাতাদা (রহ.) বলেছেন, ‘সম্মানিত মাসগুলোতে নেককাজের সওয়াব অনেক বেশি। তাই এ মাসগুলোতে পাপকাজের শাস্তিও অধিক কঠোর।

যদিও পাপ সব সময়ই বড় অপরাধ, তবু এসব মাসে তা আরো গুরুতর হয়ে ওঠে।’ (তাফসিরে মাজহারি)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লিখেছেন, ‘সব নবী-রাসুলের শরিয়ত এই বিষয়ে একমত যে এই চার মাসে ইবাদতের সওয়াব বৃদ্ধি করা হয় এবং কেউ যদি এ সময়ে গুনাহ করে, তবে তার পরিণতি ও শাস্তিও অধিক কঠোর হয়।’ (মাআরিফুল কোরআন)

মহররমের প্রথম দশক ও তার আমল
আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) বলেছেন, পূর্বসূরি মনীষীরা তিনটি দশকের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব ও সম্মান প্রদর্শন করতেন। তা হলো—১. রমজান মাসের শেষ দশক, ২. জিলহজ মাসের প্রথম দশক, ৩. মহররম মাসের প্রথম দশক।

একাধিক হাদিস দ্বারা মহররম মাসের মর্যাদা প্রমাণিত 
আবুজর গিফারি (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাতের কোন অংশ সবচেয়ে উত্তম এবং কোন মাস সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ? তিনি উত্তরে বললেন, ‘রাতের মধ্যভাগ সবচেয়ে উত্তম। আর মাসগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হলো আল্লাহর মাস, যাকে তোমরা মহররম বলে ডাক।’ (খুসুসিয়াতে মাহে মহররমুল হারাম)

এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে রমজান মাসের পর মহররম মাসের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে এ মাসকে ইবাদত, আত্মশুদ্ধি, নেক আমল এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহররম শুধু ইসলামী বছরের সূচনাই নয়, বরং এটি মুসলমানদের জন্য আত্মসমালোচনা, তাকওয়া বৃদ্ধি এবং আল্লাহর প্রতি নতুন অঙ্গীকারেরও এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

মহররম মাসে নফল রোজার বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। কারণ এ মাসটি আল্লাহর সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত বলে গণ্য হয়েছে। আল্লাহর দিকে এই মাসের এই বিশেষ সম্বন্ধই এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় বহন করে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রমজানের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (মিশকাত, হাদিস : ২০৪৮)

ফকিহরা বলেছেন, চারটি সম্মানিত মাস (আশহুরে হুরুম)-এর মধ্যে বিশেষভাবে মহররম মাসে সামর্থ্য ও সুযোগ অনুযায়ী বেশি বেশি নফল রোজা রাখাকে মুস্তাহাব বলেছেন।

মহররমের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো, আশুরার রোজা। এর গুরুত্ব সম্পর্কে আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)

মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখেন, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে। কারণ এ দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন নবী (সা.) বলেন, ‘মুসার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৬৮০)

 মহররম মাসের কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে মহররম মাস বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। যেমন—
ক. সপ্তম হিজরিতে এই মাসেই সংঘটিত হয় খায়বারের বিখ্যাত যুদ্ধ।

খ. ১৪ হিজরিতে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক কাদিসিয়ার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) এবং পারস্য বাহিনীর সেনাপতি ছিল বিখ্যাত রুস্তম। টানা তিন দিন কঠোর যুদ্ধের পর চতুর্থ দিনে মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেন।

গ. ১৮ হিজরিতে সিরিয়া ও ইরাক অঞ্চলে ‘তাউন-ই-আমওয়াস’ নামে ভয়াবহ মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। এই মহামারিতেই ইন্তেকাল করেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.), যিনি সে সময় মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। একই বছরে ভাই ইয়াজিদ (রা.) ইন্তেকাল করলে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মুয়াবিয়া (রা.) দামেশকের গভর্নর নিযুক্ত হন।

ঘ. ২৪ হিজরিতে আমর ইবনুল আস (রা.) বিজয়ীর বেশে মিসরে প্রবেশ করেন। আর এ বছরেই উসমান (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ঙ. ৬১ হিজরির মহররম মাসে নবীজি (সা.)-এর দৌহিত্র হুসাইন বিন আলী (রা.) তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে শাহাদাতের অমৃত পান করেন।

চ. ৭৪ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)। (মাহে মহররমুল হারাম কি ফজিলত আওয়ার আহকাম)

এ ছাড়া সৃষ্টির প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল বলে ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়।

মহররম ও আশুরার করণীয়
প্রাজ্ঞ আলেমরা এই মাসে কিছু কাজ করার কথা বলেন। তা হলো—
১. আশুরার রোজা রাখা।
২. পরিবারের সদস্যদের জন্য ব্যয়ে কিছুটা উদারতা প্রদর্শন করা।
৩. ফরজ ইবাদতের প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া এবং নফল ইবাদত বেশি বেশি করা।
৪. গুনাহ ও অসৎ কাজ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা।
৫. সুন্নতের অনুসরণ ও অনুকরণের প্রতি যত্নশীল থাকা।
৬. ধর্মের অংশ নয় এমন মনগড়া ও ভিত্তিহীন নানা সামাজিক বা ধর্মীয় রীতিনীতি পরিহার করা।

আল্লাহ সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।