সমতা, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করছেন বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। মঙ্গলবার (২৩ জুন) চীনের দালিয়ানায় এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেন।
সোমবার (২২ জুন) রাতে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে ২১ সদস্যের সংক্ষিপ্ত একটি প্রতিনিধিদল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে পৌঁছায়। এই প্রতিনিধিদলে মাহদী আমিনসহ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার আটজন রয়েছেন।
মাহদী বলেন, ‘চীন সরকারের একটি উচ্চ প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীকে সোমবার লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করে এবং মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হোটেলে নিয়ে আসে। এ সময় পুরো রাস্তা জুড়েই ছিল রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও পুলিশি প্রহরা ছিল।’
চীনে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয় বিষয়ে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত সফল মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী মাত্র কয়েক কর্মঘণ্টা পেলেও তার মাঝেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, রাজাসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় চীনে এসে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে বর্তমানে বহপক্ষীয় বিষয় নিয়ে উপস্থিত বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ইতোমধ্যে শুরু করেছেন।’
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত সামার দাভোস ২০২৬ বর্তমানে চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ‘Innovating at Scale’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই বৈশ্বিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধিদল, আমন্ত্রিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা এবং শীর্ষ ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্ভাবক, শিক্ষাবিদ ও করপোরেট নেতারা অংশগ্রহণ করেছেন।
একজন সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাংলাদেশের বাইরে এটিই প্রথম কোনো বৈশ্বিক সম্মেলনে যোগদান। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে অধিকতর বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অংশীদারির সঙ্গে আরো গভীরভাবে সংযুক্ত করা বলে মাহদী আমিন জানান।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’ বার্তার মাধ্যমে বৈশ্বিক নিয়োগকারীদের জন্য একটি আস্থাশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
মাহদী আমিন প্রেস ব্রিফিংয়ে আরো জানান, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট এবং সিইও আলোইস জুইংগি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার কিভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে, দেশের মানুষকে অগ্রযাত্রার পথে ধাবিত করতে পারবে, সেগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রশংসা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ নামক সেশনে বক্তব্য দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে নির্বাচিত সরকার কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে, প্রশংসিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি কর্মসূচিগুলো বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করেন।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী আজকের সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনঃখনন, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, সবুজ শিল্পের বিকাশে পাট শিল্প ও পরিবেশ বান্ধব ইলেক্ট্রিক ভেহিকল চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়; এটি আমাদের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের (Loss and Damage Fund) কার্যকর বাস্তবায়ন, সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং প্রশমন ও অভিযোজন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দেন। তিনি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংহতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।
মাহদী আমিন বলেন, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে একটি নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সিওক, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম-ওসোরিন উচরাল, গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু ওউরি বাহ, মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোজকো স্পাজিচ, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকটেনভের সঙ্গে অর্থাৎ সাত দেশের সরকারপ্রধানের একসঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভোজ এবং উন্মুক্ত আলাপচারিতার দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে।
তিনি জানান, বুধবার (২৪ জুন) সকালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অন্যান্য বৈশ্বিক নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক পলিসি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবেন। দুপুরবেলা দালিয়ান থেকে বেইজিং-এ একটি হাই স্পিড ট্রেনের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের উদ্দেশ্যে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এর আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফর সঙ্গীরা স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবেন।
মাহদী আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দেশেই যেমন জনগণের আস্থা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে গৃহীত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কর্মযজ্ঞের ফলে দীর্ঘদিন পর বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন একজন স্টেটসম্যান, যিনি সমতা, ন্যায্যতা ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কার্যকরভাবে ধারণ করছেন, নিশ্চিত করছেন বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, সম্মান ও দৃঢ় অবস্থান।
তিনি আরো বলেন, দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোসে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের বেস্ট প্র্যাকটিস গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সক্ষমতাকে আরো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করছে।