দেশে প্রতিবছর প্রায় ৯ হাজার নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে তাদের প্রায় অর্ধেকেরই মৃত্যু হচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) প্রতিরোধে টিকাদান, স্ক্রিনিং, গবেষণা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ১১ থেকে ২১ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই এইচপিভি টিকার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ইন্টারন্যাশনাল প্যাপিলোমাভাইরাস সোসাইটি (আইপিভিএস) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, এইচপিভি বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ যৌনবাহিত সংক্রমণগুলোর একটি। এই ভাইরাসটির ২০০টিরও বেশি ধরন রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। বিশেষ করে এইচপিভি-১৬ ও এইচপিভি-১৮ জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। এ ছাড়া এই ভাইরাস পায়ুপথ, মুখগহ্বর, যোনিপথ ও পুরুষাঙ্গের ক্যান্সারের সঙ্গেও জড়িত।
তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, বাংলাদেশে সাধারণ নারীদের মধ্যে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভির প্রাদুর্ভাব ৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে উপকূলীয় এলাকায় এ হার ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংক্রমণ পাওয়া গেছে।
জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে সরকারের বর্তমান উদ্যোগের প্রশংসা করে ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, বর্তমানে স্কুলের পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং কমিউনিটির ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের এক ডোজ এইচপিভি টিকা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচির আওতায় ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রাভুক্ত কিশোরীকে আনা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি দেশে বর্তমানে ৬০১টি ভিআইএ (ভিজ্যুয়াল ইনস্পেকশন উইথ অ্যাসিটিক অ্যাসিড) কেন্দ্র এবং ৫২টি কল্পোস্কোপি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্ক্রিনিং সেবা দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য এইচপিভি-সম্পর্কিত রোগমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এ জন্য টিকাদান, স্ক্রিনিং, গবেষণা, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বয়ে কাজ করা হবে।
বাংলাদেশ গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি সোসাইটির (জিওএসবি) সভাপতি অধ্যাপক সাবেরা খাতুন বলেন, জরায়ুমুখের ক্যান্সার নির্মূলে এখন সময় এসেছে ১১ থেকে ২১ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়েদের টিকার আওতায় আনার। পাশাপাশি ডিএনএভিত্তিক এইচপিভি পরীক্ষা এবং সেলফ-টেস্টিং পদ্ধতি চালু করাও এখন জরুরি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী বলেন, বর্তমানে নির্দিষ্ট বয়সী মেয়েদের টিকা দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে ছেলে ও মেয়ে—উভয়কেই টিকার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৯০-৭০-৯০ লক্ষ্য অর্জন করা গেলে জরায়ুমুখের ক্যান্সার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. কাজী আহম্মেদ জাকী বলেন, ৯০-৭০-৯০ কৌশলের আওতায় ৯০ শতাংশ টিকাদান, ৭০ শতাংশ স্ক্রিনিং এবং ৯০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইইডিসিআর সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তবে নীতিগত পরিকল্পনার চেয়ে মাঠপর্যায়ে এর সফল বাস্তবায়নকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিএমইউর সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, নীতিগত পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো উন্নত হলেও সেবার মান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিএমইউর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, গত দুই বছরে দেশে প্রায় ৪ হাজার এইচপিভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের বয়স কম এবং অনেকে অবিবাহিত হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বক্তারা বলেন, জরায়ুমুখের ক্যান্সার এমন একটি রোগ, যা সঠিক সময়ে টিকাদান, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই এইচপিভি প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি গবেষণা, জনসচেতনতা এবং টিকাদান কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।





