ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) খরচ কমানো এবং মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে তাদের প্রায় ২০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। কম্পানিটি জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারভিত্তিক পুনর্গঠন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
লাকি স্ট্রাইক ও ডানহিল সিগারেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটি সোমবার জানায়, তারা প্রায় পাঁচ হাজার ৫০০ কর্মী ছাঁটাই করবে। এ ছাড়া প্রায় তিন হাজার ৫০০টি পদ অ্যাকসেঞ্চারসহ বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হবে।
অ্যাকসেঞ্চার আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন-ভিত্তিক একটি বহুজাতিক প্রযুক্তি পরামর্শক ও পেশাদার সেবা প্রদানকারী কম্পানি।
ফলে মোট প্রায় নয় হাজার কর্মী ছাঁটাই হবে। তবে কম্পানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনার বাইরে থাকবে।
বিএটি জানিয়েছে, তাদের প্রধান আয়ের উৎস প্রচলিত তামাকপণ্যের ব্যবসা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তাই প্রতিষ্ঠানটি ধূমপানের বিকল্প নতুন পণ্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে কোন দেশ বা অঞ্চলে কর্মী ছাঁটাই করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিএটি জানিয়েছে, এই পুনর্গঠন কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে বছরে অতিরিক্ত ৬০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া ২০২৭ সালের মধ্যে ৫০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। লেনদেন চলাকালে কম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে যায়, যা একই সময়ে এফটিএসই ১০০ সূচকের তুলনায় দুর্বল পারফরম্যান্স।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই বিএটি ইঙ্গিত দিয়েছিল, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে কর্মী ছাঁটাই হতে পারে। তবে ছাঁটাইয়ের পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কুইল্টার শেভিয়টের বিশ্লেষক ক্রিস বেকেট বলেন, শেয়ারের দামের পতন থেকে বোঝা যায় যে বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, মধ্যমেয়াদী ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিএটিকে ভবিষ্যতে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
বিএটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাদেউ মারোকো বলেছেন, এই পুনর্গঠন কর্মসূচি কম্পানিটিকে আরো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের অনেক সহকর্মী প্রভাবিত হবেন। আমরা তাদের প্রতি যত্ন ও সম্মান বজায় রেখে এই পরিবর্তনের সময় সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম্পানিটির বিক্রি ও মুনাফা বৃদ্ধির গতি ধীর ছিল। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বা অল্প ব্যবধানে তা অর্জন করেছে, যা কিছু বিনিয়োগকারীকে হতাশ করেছে। মাঝারি মেয়াদে প্রতি বছর ৩ থেকে ৫ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিএটি।
বিশ্লেষক ক্রিস বেকেটের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু তামাক ব্যবসার পুনর্গঠনের প্রতিফলন নয়, বরং বিএটির নতুন ধরনের ধূমপান-সংক্রান্ত পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ারও ইঙ্গিত। এর মধ্যে রয়েছে ভিউজ ই-সিগারেট (ভেপ) এবং ভেলো নিকোটিন পাউচ, যেগুলো উৎপাদনে তুলনামূলক কম শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কম্পানিটি জানিয়েছে, গত ১৮ থেকে ২৪ মাস ধরে তারা তাদের উৎপাদন কার্যক্রম আরো দক্ষ করার উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি কারখানা বন্ধ করার সিদ্ধান্তও আগেই ঘোষণা করা হয়েছে।
বিএটির ধারণা, এ বছর প্রচলিত তামাকপণ্যের বিক্রি প্রায় ২.৫ শতাংশ কমবে। এ কারণে কম্পানিটি ভিউজ ভেপ ও ভেলো নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। তবে এই বাজারে তারা এখনো প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনালের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ভেপজাতীয় পণ্যের অনুমোদন পেতে কঠোর নিয়মের কারণে বাজারে পণ্য আনতে দেরি হচ্ছে। বিএটির মতে, এর সুযোগ নিয়ে অবৈধ চীনা পণ্যের বিক্রি বেড়েছে, যা তাদের বিক্রি ও বাজার দখলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়া জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ধূমপায়ী সস্তা ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছেন।
অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বাড়তি কর, কঠোর নিয়ম এবং অবৈধ তামাক ব্যবসার কারণেও কম্পানিটি চাপে রয়েছে। বিএটি জানিয়েছে, কর্মীদের বেশিরভাগ পদ পরিবর্তনের বিষয়টি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী আলোচনা করে ঠিক করা হচ্ছে।
বিএটি জানিয়েছে, তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা পদগুলোর মধ্যে রয়েছে কোস্টারিকা, মেক্সিকো, পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও মালয়েশিয়ায় অবস্থিত তাদের গ্লোবাল সার্ভিস হাবের বিভিন্ন চাকরি। এ ছাড়া পাকিস্তানের কিছু পদ এবং পোল্যান্ড ও রোমানিয়ার কিছু ডিজিটাল ও প্রযুক্তি-সংক্রান্ত পদও অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কম্পানিটির মতে, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমানো এবং কার্যক্রম দক্ষ করা হবে।






