যুক্তরাষ্ট্রে মেয়ে ও নারীদের খেলাধুলায় ট্রান্স নারীদের (রূপান্তরিত নারী) অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, মঙ্গলবার আদালত ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও আইডাহোর সেই আইন বহাল রেখেছেন। যেখানে ট্রান্স ছাত্রীদের নারী ক্রীড়া দলে খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের সেই রায়গুলো বাতিল করেছে। যেখানে ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলা হয়েছিল, এই আইনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও ফেডারেল বৈষম্যবিরোধী আইন লঙ্ঘন করে।
আইডাহো ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার আইনে সরকারি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া দলগুলোকে ‘জৈবিক লিঙ্গ বা বায়োলজিকাল সেক্স’ অনুযায়ী ভাগ করার কথা বলা হয়েছে এবং ‘পুরুষ লিঙ্গের’ শিক্ষার্থীদের নারী দলে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে আরও ২৫টি অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের আইন কার্যকর রয়েছে।
আদালতের ৯ বিচারপতি সর্বসম্মতিক্রমে (৯-০) রায় দেন যে এসব আইন শিক্ষা ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধকারী ফেডারেল ‘টাইটেল নাইন’ আইন লঙ্ঘন করে না। তবে সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর ‘সমান আইনি সুরক্ষা’ বিষয়ক প্রশ্নে বিচারপতিরা আদর্শগতভাবে বিভক্ত ছিলেন।
তবে ৬ জন রক্ষণশীল বিচারপতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মত দেন যে আইনগুলো সংবিধানও লঙ্ঘন করে না। অপরদিকে ৩ জন উদারপন্থী বিচারপতি ভিন্নমত জানিয়ে বলেন, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মামলায় কিছু বাস্তবিক বিষয় নিয়ে বিরোধ থাকায় এ পর্যায়ে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত ছিল না।
রায়টি লিখেছেন রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ। তিনি বলেন, ‘টাইটেল নাইন’ ও সংবিধানের ‘সমান আইনি সুরক্ষা’ ধারা অনুযায়ী অঙ্গরাজ্যগুলো জৈবিক নারীদের জন্য নারী ও কন্যাদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সংরক্ষণ করতে পারে এবং জৈবিক লিঙ্গের ভিত্তিতে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণ করতে পারে। কারণ সংবিধান বা টাইটেল নাইন—কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নারী ক্রীড়া ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন মামলায় সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোর পক্ষ সমর্থন করে। রায়ের পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘বড় জয়। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট নারীদের খেলায় পুরুষদের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এতে এই হাস্যকর বিষয়টির অবসান হলো।’
আইডাহো ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার দাবি, এই আইন নারী ও কন্যাদের জন্য ক্রীড়ায় ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর অধিকার সীমিত করার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ।
এদিকে মামলার বাদীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, এসব আইন ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক। তাই সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী ও ‘টাইটেল নাইন’ লঙ্ঘন করে।
রায়ে ক্যাভানফ বলেন, কর্মসংস্থান বা সাধারণ শিক্ষার সুযোগের তুলনায় খেলাধুলার ক্ষেত্র ভিন্ন, কারণ নারী ও পুরুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত শারীরিক পার্থক্যের কারণে পৃথক ক্রীড়া দল রাখা বৈধ। আইনে ব্যবহৃত ‘সেক্স’ শব্দটির অর্থ কেবল ‘জৈবিক লিঙ্গ’ হিসেবেই ব্যাখ্যা করা যৌক্তিক।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৭২ সালে প্রণীত ‘টাইটেল নাইন’ নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং গত পাঁচ দশকে নারী ক্রীড়ার ব্যাপক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রসঙ্গত, এটি ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়ে সাম্প্রতিক সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রায়। এর আগে আদালত টেনেসির একটি মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লিঙ্গ-পরিবর্তনসংক্রান্ত চিকিৎসা (হরমোন থেরাপি ও বয়ঃসন্ধি বিলম্বকারী ওষুধ) নিষিদ্ধ করার অঙ্গরাজ্যগুলোর অধিকার বহাল রেখেছিল।
২০২৫ সালে দায়ের হওয়া ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মামলাটি করেছিলেন হাইস্কুল শিক্ষার্থী বেকি পেপার-জ্যাকসন ও তার মা। অন্যদিকে আইডাহোর মামলাটি করেছিলেন বোইসি স্টেট ইউনিভার্সিটির ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থী লিন্ডসে হেকক্স। পরে হয়রানির আশঙ্কা ও ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতার কারণে তিনি খেলাধুলা ছেড়ে দেন এবং মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন জানান।
গত জানুয়ারিতে এ বিষয়ে শুনানি হয়েছিল। তখন রক্ষণশীল বিচারপতিরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, বয়ঃসন্ধি বিলম্বকারী ওষুধ বা হরমোন থেরাপি পুরুষদের শারীরিক সুবিধা পুরোপুরি দূর করতে পারে কি না—এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক মতভেদ থাকা অবস্থায় পুরো দেশের জন্য একক নীতি নির্ধারণ কতটা যুক্তিসঙ্গত।




