সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল ১ জুলাই (বুধবার) থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় নিচের দিকের ১১-২০তম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং ১-১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল নবম জাতীয় বেতন কমিশন।
জানা গেছে, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে দুই ধাপের একটি মডেল নিয়ে কাজ করছে সরকার। ঘোষণা অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলেও প্রজ্ঞাপন জারি, বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়তি বেতন হাতে পেতে আরো কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিব কমিটির সুপারিশ শিগগির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পে-কমিশনের সুপারিশ মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত সচিব কমিটি এরই মধ্যে চার দফা বৈঠক করেছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর পৃথক তিনটি পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে কমিটি শিগগির অর্থ মন্ত্রণালয়ে তাদের চূড়ান্ত মতামত জমা দেবে।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির প্রভাব এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে কারণে দুই ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাব গুরুত্ব পাচ্ছে। এ প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম বছর পুরো মূল বেতন কার্যকর করা এবং দ্বিতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয়ের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিকল্প প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন পে স্কেলে বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস করা হবে। কিছু ভাতা কমানো বা একীভূত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। ফলে প্রজ্ঞাপন জারি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও কিছু সময় লাগবে। এ কারণে ১ জুলাই থেকে পে স্কেল কার্যকর হলেও বাড়তি বেতন পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘কয় ধাপে বাস্তবায়ন হবে, সেটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। তবে মূল্যস্ফীতি এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সচিব কমিটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়নি।’
অর্থ বিভাগের কারিগরি কর্মকর্তাদের মতে, মূল বেতন দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার আইবিএএস-এ জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই তারা একবারেই পুরো মূল বেতন কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ভাতা সমন্বয় করা হলে বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে বলে তারা মনে করছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রত্যাশা করা কঠিন।
তিনি আরো জানান, শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। পে স্কেল কার্যকর করার পূর্বশর্ত হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদবিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু নিজের নয়, পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-সম্পদের হিসাবও প্রতিবছর হালনাগাদ করতে হবে।
এদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ জানান, নবম পে স্কেলের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়ের দাবি। মূল্যস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্ধিত বেতন তাদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত করতে সহায়ক হবে।
তিনি আরো জানান, সরকারি চাকরিতে এমনও এক শ্রেণির কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের বেতনের প্রয়োজনই হয় না। তাদের বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সময় দেশে যে আর্থিক লুটপাট হয়েছে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশও জড়িত ছিলেন। তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।